October 30, 2026, 6:50 pm
শিরনাম :
কচুয়ায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উদযাপিত যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কুয়াকাটায় দোয়া ও খাবার বিতরণ পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর ঘোষণা, পুজোয় সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ ছুটি বন্ধ পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়নে পঞ্চায়েত মন্ত্রীর আশ্বাস মির্জাপুরে অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার কাঁঠালিয়ায় শর্টবার ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত ঝালকাঠিতে জামায়াতের পৌর শাখার কর্মী শিক্ষা বৈঠক অনুষ্ঠিত মির্জাপুরে সারভর্তি ট্রাক পুকুরে দামুড়হুদার সীমান্তবর্তী মাঠে রাসেল ভাইপার সাপ আটক, বন বিভাগে হস্তান্তর চুয়াডাঙ্গায় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে যুবদলের শুভেচ্ছা বিনিময়

মরণফাঁদে রূপ নিয়েছে ভাঙা সেতু: পাঁচ গ্রামের হাজারো মানুষের নিত্যদিনের যুদ্ধ

​শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রিপোর্টার

​“সেতুডা খালের মদ্যি ভাইঙে পইড়ে রইছে আজ কত বছর! আর আমরা পাশের একটা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়া ছোট ছোট পোলাপানদের স্কুলে পাঠাচ্ছি, হেঁটে বাজারে যাচ্ছি। একটু পা এদিক-ওদিক হইলেই সোজা কাদা-পানিতে আছাড় খেতে হয়। গত ছয় বছর ধইরা আমরা এই কাইদে কষ্ট করতিছি, হেনে দেখার কেউ নেই। আর কদ্দিন আমাদের এই কষ্ট সহ্য করা লাগবে?”—বুকে চেপে রাখা ক্ষোভ আর একরাশ হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন খুলনার কয়রা উপজেলার ওড়াতলা গ্রামের বাসিন্দা মইফুল খাতুন।

​খুলনার উপকূলীয় কয়রা উপজেলার ২ নম্বর কয়রা-ওড়াতলা খালের পাড়ে গেলে চোখে পড়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের দৃশ্য। খালের বুকে একাংশে কঙ্কালের মতো জেগে রয়েছে ধসে পড়া পুরনো সেতুটির ভগ্নাবশেষ, যার ৯০ শতাংশই ভেঙে তলিয়ে গেছে। আর সেই ভঙ্গুর সেতুর পাশেই হেলেদুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি সাঁকো, যা এখন পাঁচ গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা।

​স্থানীয় বাসিন্দা ও সরেজমিন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১৩-১৪/১ নম্বর পোল্ডারের অধীনে ২ নম্বর কয়রা-ওড়াতলা খালের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ২০২০ সালে এটি আচমকা ধসে পড়ার পর থমকে যায় এই জনপদের স্বাভাবিক গতি। দীর্ঘ ছয়টি বছর পার হয়ে গেলেও নতুন একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবে মুখ দেখেনি। বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা নিজেদের টাকায় বাঁশ কিনে তৈরি করেছেন এই নড়বড়ে সাঁকো। এই সাঁকো পার হয়েই প্রতিদিন চলাচল করতে হয় ২ নম্বর কয়রা, ওড়াতলা, গোবরা, হরিণখোলা ও পূর্বচকসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে।

ভীতি আর আশঙ্কায় কাটে শিশুদের স্কুলযাত্রাঃ
সাঁকোটির অবস্থা এতটাই নড়বড়ে যে প্রবীণ বা শিশুরা একাকী তা পার হতে পারে না। অনেক সময় হাত ধরে কিংবা অন্য কারও সাহায্য নিয়ে ভীতি আর শঙ্কা মাথায় রেখে শিক্ষার্থীদের সাঁকো পার হতে হয়।
​গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আঃ গফুর সানা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “পড়াশোনা করার কোমলমতি পোলাপানেরা সাঁকো পার পার হওয়ার সময় কতবার যে পিছলে পানিতে পইড়ে যায়! হাতের বই-খাতা পানিতে পইড়ে একবারে নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালের দিনে এই বিপদ আরও বেড়ে যায়। তখন ছোটদের স্কুলে পাঠাতে বুক কাঁপে। আর রাইতের বেলা যদি কোনো রোগী বা প্রসূতি মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন যে কী যন্ত্রণা হয়, তা আমরা ছাড়া কেউ বুঝবে না।” ​থমকে গেছে অর্থনীতি, চরম ভোগান্তিতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরাঃ
সেতু না থাকায় শুধু চলাচলেই ব্যাঘাত ঘটছে না, বরং পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। উৎপাদিত ফসল বা কৃষিপণ্য বাজারে নিতে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ভ্যান, ইজিবাইক বা কোনো পণ্যবাহী যানবাহন সাঁকো দিয়ে পার হতে পারে না। ফলে দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে যানবাহন চালক ও ব্যবসায়ীদের।

​জনপ্রতিনিধি ও প্রবক্তব্যঃ
এ বিষয়ে কয়রা সদরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাসুম বিল্লাহ আক্ষেপ করে বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোর কারণে স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জীবনবাজি রেখে চলাচল করতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সভায় একাধিকবার বিষয়টি তুলে ধরেও সমস্যার সমাধান মেলেনি। দ্রুততম সময়ে নতুন সেতু নির্মাণ করে অবহেলিত জনপদের মানুষকে ভোগান্তি থেকে রক্ষা করা উচিত।”

​কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান জানান, কয়েকটি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে। উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত না করে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে এখানে সেতু নির্মাণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। যোগাযোগ করা হলে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকী জানান, দীর্ঘ ছয় বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু না থাকায় পাঁচটি গ্রামের মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়ে চলাচল করছেন—এটি সত্যিই অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, “বিষয়টি সরজমিনে খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে সমন্বয় সাধন করে দ্রুতই নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শুধু মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং এলাকার মানুষের স্থায়ী ও বাস্তবসম্মত সমাধানের লক্ষ্যেই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।”

​একটি টেকসই সেতুর মুখ চেয়ে কতদিন এভাবে দিন গুজরান করবে উপকূলীয় এই এলাকার অবহেলিত মানুষ—এখন সেটাই দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ