October 30, 2026, 8:53 pm
শিরনাম :
কচুয়ায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উদযাপিত যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কুয়াকাটায় দোয়া ও খাবার বিতরণ পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর ঘোষণা, পুজোয় সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ ছুটি বন্ধ পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়নে পঞ্চায়েত মন্ত্রীর আশ্বাস মির্জাপুরে অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার কাঁঠালিয়ায় শর্টবার ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত ঝালকাঠিতে জামায়াতের পৌর শাখার কর্মী শিক্ষা বৈঠক অনুষ্ঠিত মির্জাপুরে সারভর্তি ট্রাক পুকুরে দামুড়হুদার সীমান্তবর্তী মাঠে রাসেল ভাইপার সাপ আটক, বন বিভাগে হস্তান্তর চুয়াডাঙ্গায় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে যুবদলের শুভেচ্ছা বিনিময়

কয়রায় ৫৭ মণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, প্রতিমায় ফুটছে শিল্পীর নিপুণ হাত

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

কয়রায় ৫৭ মণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, প্রতিমায় ফুটছে শিল্পীর নিপুণ হাত, নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও নির্বিঘ্নে পূজা উদ্‌যাপনের প্রত্যাশা; মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে উৎসবের আমেজ। দেবী দুর্গার আগমনী বার্তায় মুখর হয়ে উঠছে খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা। কোথাও প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে, কোথাও শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা, আবার কোথাও মণ্ডপকে বর্ণিল করে তুলতে ব্যস্ত আয়োজকেরা। শিল্পীর নিপুণ হাতে মাটির প্রতিমা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য দেবদেবীর অবয়বে। আর সেই প্রতিমায় রং, অলংকার ও সাজসজ্জার শেষ ছোঁয়া দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরেরা।

এবার কয়রা উপজেলায় ৫৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। দুর্গোৎসবকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বইছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। পূজাকে নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন মণ্ডপের আয়োজকেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করবেন সব বয়সী মানুষ। দুর্গোৎসব হয়ে উঠবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক ভালোবাসার মিলনমেলা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) কয়রা সদরের ৬নম্বর কয়রা সার্বজনীন শ্রী শ্রী দূর্গা মন্দির, শ্রী শ্রী গোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দির, ৬ নম্বর কয়রা পূর্বপাড়া সার্বজনীন দূর্গা মন্দির, মঠবাড়ী খড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, দশহালিয়া দুর্গা মন্দির ও আমাদী বাজার দুর্গা মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপ সাজানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কোথাও প্রতিমার রং করার কাজ চলছে, কোথাও সাজানো হচ্ছে পূজার বেদি। মণ্ডপের প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকা সাজিয়ে তোলার প্রস্তুতিও চলছে। পূজার দিন যত এগিয়ে আসছে, আয়োজকদের ব্যস্ততাও তত বাড়ছে।

কয়রার উপকূলীয় জনপদে দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও উপলক্ষ। বছরের এই সময়ে পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমাগম ঘটে। শিশু-কিশোরদের কাছে প্রতিমা দেখা ও মণ্ডপ ঘুরে বেড়ানো যেমন আনন্দের, তেমনি বড়দের কাছে এটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এক বিশেষ আয়োজন।শিল্পীর তুলিতে প্রাণ পাচ্ছে প্রতিমা

পূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা। খড়, বাঁশ, মাটি ও রঙের সমন্বয়ে তৈরি প্রতিমায় শিল্পীরা ফুটিয়ে তোলেন দেবী দুর্গার প্রতীকী রূপ। দেবী দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের প্রতিমাও সাজানো হচ্ছে। কোথাও প্রতিমার অলংকার পরানোর কাজ চলছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা।

একটি পূজামণ্ডপে দেখা যায়, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করছেন। দুই পাশে অন্য দেবদেবীর প্রতিমা, সামনে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি এবং পেছনে নকশা করা বর্ণিল পটভূমি। পুরো আয়োজনকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে শিল্পীরা কাজ করছেন যত্ন নিয়ে। প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের কাছে এই সময়টি যেমন কর্মব্যস্ততার, তেমনি সৃজনশীলতা প্রকাশেরও। প্রতিটি প্রতিমার মুখাবয়ব, হাতের ভঙ্গি, পোশাক ও অলংকারে নিখুঁত কাজ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা থাকে তাঁদের। কারণ, পূজার সময় দর্শনার্থীদের কাছে প্রতিমার সৌন্দর্যই হয়ে ওঠে অন্যতম আকর্ষণ।

প্রতিমাশিল্পী নিশিকান্ত গাইন বলেন, ছোটবেলা থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। মাটির কাজ শেষ হওয়ার পর রঙ-তুলির কাজের মাধ্যমে প্রতিমা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। বিশেষ করে চোখ-মুখের অভিব্যক্তি ও অলংকারের কাজে অনেক সময় ও যত্ন লাগে। পূজা যত ঘনিয়ে আসে, আমাদের ব্যস্ততাও তত বেড়ে যায়।

শুধু কারিগররাই নন, পূজামণ্ডপ ঘিরে ব্যস্ততা বেড়েছে আয়োজকদেরও। মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পূজার অন্যান্য প্রস্তুতি শেষ করতে দিন-রাত কাজ করছেন তারা।

আয়োজকদের প্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ উৎসব

দুর্গাপূজাকে ঘিরে মণ্ডপ কমিটির সদস্যদের মধ্যে চলছে প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের কাজ। পূজার আয়োজন, ভক্তদের সুবিধা, মণ্ডপের পরিচ্ছন্নতা এবং শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

কয়রার একটি ৬ নং কয়রা পশ্চিম পাড়া দূর্গা পূজামণ্ডপের আয়োজক হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, “দুর্গাপূজা আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর একটি। সারা বছর এই দিনগুলোর জন্য অপেক্ষা করি। আমরা চাই, সবাই মিলে আনন্দের সঙ্গে পূজা উদ্‌যাপন করতে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই যেন উৎসব শেষ হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”

দশালিয়া পূজামণ্ডপের আয়োজক স্বপন কুমার মিস্ত্রি বলেন, “পূজার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেক কাজ করতে হয়। প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আয়োজন সবকিছুই সময়মতো শেষ করতে হচ্ছে। এলাকার মানুষের সহযোগিতা পেলে আয়োজন আরও সুন্দর হবে। আমরা চাই, সব ধর্মের মানুষ একে অন্যের উৎসবে পাশে থাকুক।”সম্প্রীতির বন্ধনে মিলুক সব মানুষ

কয়রা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আগমন, প্রার্থনা, অঞ্জলি ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দুর্গোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে পুরো জনপদে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ পরস্পরের পাশে দাঁড়াবেন। উৎসবের দিনগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ বজায় থাকলে শিশু, নারী, প্রবীণ ও দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে মণ্ডপ পরিদর্শন করতে পারবেন।

স্থানীয় বাসিন্দা উত্তম কুমার বলেন, “পূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আনন্দ সবার। আমরা চাই, কয়রায় সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে থাকুক। পূজার দিনগুলোতে সবাই যেন নিরাপদে ঘুরতে পারেন এবং আনন্দ করতে পারেন।”

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রত্যাশা

পূজামণ্ডপগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের সুযোগ, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং দর্শনার্থীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার ব্যবস্থা থাকলে উৎসব পরিচালনা সহজ হবে। একই সঙ্গে গুজব ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন মহল।

কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ রাশেদুল আলম বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে । উপজেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপে পুলিশের পাশাপাশি আনসার ও ভিডিপির সদস্যদের দায়িত্ব পালন করবেন । যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ-আল বাকী বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। শারদীয় দুর্গাপূজা যাতে সবাই শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করতে পারে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকবে

উৎসব ঘিরে শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা

প্রতিমা নির্মাণ থেকে মণ্ডপ সাজানো—সব প্রস্তুতি ঘিরেই এখন আয়োজকদের ব্যস্ততা। প্রতিটি মণ্ডপে চেষ্টা চলছে নিজস্ব আয়োজনকে সুন্দর করে তোলার। কারও কাছে পূজা ভক্তি ও প্রার্থনার, কারও কাছে এটি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা, আবার কারও কাছে প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উপলক্ষ।

৫৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের আয়োজন ঘিরে কয়রায় তৈরি হচ্ছে উৎসবের আবহ। এখন আয়োজকদের প্রত্যাশা, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদ্‌যাপন করা। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসব সবার জন্য আনন্দময় হয়ে উঠুক—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় মানুষের।

কয়রা উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অম্বিকা চরন শাহা বলেন, এবার কয়রা উপজেলায় ৫৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে । এখন মণ্ডপের সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতি চলছে। আশা করছি, সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন করতে পারব।

প্রতিমার রঙ ও শেষ সময়ের সাজসজ্জার কাজ দেখতে মণ্ডপে আসছেন দর্শনার্থীরাও। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের আগ্রহ। উৎসবকে ঘিরে নতুন পোশাক, কেনাকাটা ও নানা প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ