October 30, 2026, 8:58 pm
শিরনাম :
কচুয়ায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উদযাপিত যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কুয়াকাটায় দোয়া ও খাবার বিতরণ পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর ঘোষণা, পুজোয় সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ ছুটি বন্ধ পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়নে পঞ্চায়েত মন্ত্রীর আশ্বাস মির্জাপুরে অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার কাঁঠালিয়ায় শর্টবার ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত ঝালকাঠিতে জামায়াতের পৌর শাখার কর্মী শিক্ষা বৈঠক অনুষ্ঠিত মির্জাপুরে সারভর্তি ট্রাক পুকুরে দামুড়হুদার সীমান্তবর্তী মাঠে রাসেল ভাইপার সাপ আটক, বন বিভাগে হস্তান্তর চুয়াডাঙ্গায় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে যুবদলের শুভেচ্ছা বিনিময়

‘পাটি বোনার হাত আছে, শেখার মানুষ নেই’

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

‘পাটি বোনার হাত আছে, শেখার মানুষ নেই’ শাশুড়ির কাছ থেকে শিখেছি, বউরা আর শেখে না’। খেজুরপাতার পাটিতে বোনা হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প।

সকালের আলো তখনো পুরোপুরি তেজি হয়ে ওঠেনি। পথের এক পাশে বাড়িঘর, অন্য পাশে গাছপালা আর খাল। গ্রামের ইট বিছানো সরু পথের পাশে বসে আপন মনে পাটি বুনছিলেন এক নারী। সামনে মেলে রাখা খেজুরপাতার তৈরি পাটি। দুই হাতে পাতার সরু ফালি ধরে নিপুণভাবে বুনে চলেছেন তিনি। পাশে রাখা কয়েকটি শুকনো খেজুরপাতা। হাতের কাজ থামেনি, থামেনি বছরের পর বছর চলে আসা এক গ্রামীণ ঐতিহ্যও।
কিছুক্ষণ পরপর পাটির দিকে তাকিয়ে আবার হাত চালাচ্ছিলেন তিনি। আশপাশে বাড়িঘর, গাছপালা আর গ্রামের চেনা নীরবতা। দৃশ্যটি যেন কয়েক দশক আগের কোনো গ্রামের ছবি। অথচ সময় বদলেছে। বদলে গেছে মানুষের ব্যবহারও। প্লাস্টিক, নাইলন ও বিভিন্ন ধরনের তৈরি পণ্যের ভিড়ে খেজুরপাতার পাটির ব্যবহার এখন অনেকটাই কমে গেছে।

সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন সুফিয়া খাতুন (৬০)। খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের এই নারী প্রায় ৩০ বছর ধরে খেজুরপাতার পাটি বুনছেন। দাদি-শাশুড়ি ও শাশুড়ির কাছ থেকে শিখেছেন। শাশুড়ি, ননদ, জা-সবাই মিলে একসময় দুই-তিন দিনে একটি পাটি বুনতেন। এখন তিনি একাই বোনেন। সংসারের কাজের ফাঁকে সকাল-বিকেলে বসে একটি পাটি শেষ করতে লাগে ৮ থেকে ১০ দিন।

কিন্তু শুধু পাটি বোনার সময়ই বদলায়নি, বদলে গেছে পাটির কদরও। যে পাটি একসময় ছিল গ্রামের ঘরের অপরিহার্য জিনিস-ঘুমানো, মেহমান বসানো, নামাজ পড়া, ধান শুকানো, এমনকি কুমড়োর বড়ি দেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হতো-এখন তার ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। শ্রীরামপুরে এখন মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এই কাজ ধরে রেখেছে। আনোয়ারা, মোমেনা, মাজেদা, আমেনাসহ প্রায় ১০টি পরিবার পাটি বোনে। তবে শ্রীরামপুর গ্রামে এখন সবচেয়ে বেশি পাটি বোনে বিক্রি করে আয় করেন সবার কাছে বোনাই হিসেবে পরিচিত আবুজার বোনাই এর স্ত্রী মজিদা খাতুন। প্রায়ই তার কাছে অর্ডার থাকে। মহারাজপুরের আরও কয়েকটি পরিবারেও এই কাজ চলে। যেমন আমেনা, রোকেয়া ও ভদি বিবি।

কথা হয় মজিদা খাতুনের বাড়িতে তার আশঙ্কা, এ প্রজন্মের পর হয়তো আর কেউ এই কাজ ধরে রাখবে না। তাঁর কথায়, “আস্তে আস্তে নতুন প্রজন্ম আসলে এগুলো বন্ধ হইয়া যাবে’ সময় আমি যখন থাকব না, তখন পাতার পাটির হ্যও থাকবে না।”দুই-তিন দিনে এক পাটি, এখন লাগে ৮-১০ দিন
মজিদা খাতুন বলেন, তাঁর পাটি বোনার বয়স প্রায় তিন দশক। দাদি-শাশুড়ি ও শাশুড়ির কাছ থেকে হাতে-কলমে কাজ শিখেছেন। তখন একা নয়, পরিবারের নারীরা দল বেঁধে পাটি বুনতেন। “দাদি শাশুড়ি, শাশুড়ি, ননদ, জা-সবাই মিলে পাটি বুনতাম। দুই-তিন দিনে একটা পাটি বুইনা ফেলতাম। চাঁদনি রাতে উঠানে বইস্যা শাশুড়ি-জা-ননীরা মিলে অনেক রাত পর্যন্ত বুনতাম। একরকম প্রতিযোগিতা হইত-কে আগে শেষ করতে পারে,” বলেন তিনি।

কিন্তু সেই দলবদ্ধ কাজ এখন নেই :
“এখন তো একাই বুনি। ছেলের বউরা এসব বোনে না, শেখেও না। একটানা বোনা হয় না, সংসারের কাম করতে হয়। তাই একটা পাটি বানাইতে ৮ থেকে ১০ দিন লাইগ্যা যায়,” বলেন সুফিয়া।
খেজুরপাতার তৈরি পাটিরও রয়েছে আলাদা নাম ও ব্যবহার:
১. সাদা পাটি : কোনো নকশা ছাড়া সাধারণ পাটি; প্রতিদিন বসা ও শোয়ার কাজে
২. ডোরাকাটা পাটি : লম্বালম্বি বা আড়াআড়ি দাগের নকশা
৩. রঙিন পাটি : খেজুরপাতার সঙ্গে রঙিন উপকরণ ব্যবহার করে নকশা
৪. নকশি পাটি : কারিগরের দক্ষতায় নানা ধরনের জটিল নকশা
৫. আসন পাটি : ছোট আকারের; অতিথি বা বিশেষ ব্যক্তির বসার জন্য
৬. নামাজের পাটি; ছোট আকারে, বিশেষ নকশায় তৈরি
৭. কুলিজো পাটি:
৮. কুলোর জো পাটি; যেটা ধান রোদে দেওয়ার কাজে বেশি ব্যবহার হয়।

বেশিরভাগ পাটি বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। তবে কুলি জো পাটি বিক্রি হয় প্রায় ৩০০ টাকায়। কুলোর জো পাটির দাম প্রায় ৪০০ টাকা। আর নামাজ পড়ার জন্য তৈরি করা হয় ছোট আড়ে জো, যার দাম প্রায় ১৫০ টাকা। কুলি জো ও কুলোর জো এখন মূলত ধান শুকানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে কুলোর জো তুলনামূলক জাবদা বা শক্ত হওয়ায় শোয়ার কাজেও ব্যবহার করা যায়।

কার্তিক মাসেই শুরু হয় পাতার প্রস্তুতি:
পাটি তৈরির মূল উপকরণ খেজুরপাতা। কার্তিক মাসে গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য গাছ পরিষ্কার ও কাটাছেঁড়া শুরু করলে তখনই পাটি বোনার নারীরা পাতার ডাল সংগ্রহ করেন। একসময় এসব পাতা বিনা টাকায় পাওয়া যেত। এখন খেজুরগাছের ডাল ও পাতা কিনতে হয়।মজিদার ভাষায়,

“কার্তিক মাসে গাছিরা রসের লাইগা খেজুরগাছ কাটে। গাছের ডালপালা কাটার সময় আমরা ওই পাতা নিয়ে রাখি। আগে মানুষ এমনি দিত, এখন কিনে নিতে হয়। একটা গাছের পাতা প্রায় ৫০ টাকা পড়ে।” ডাল থেকে পাতা ছাড়িয়ে নেওয়ার পর শুরু হয় শুকানোর কাজ। উঠানে রোদে দিয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন ভালোভাবে শুকানো হয়। এরপর ছোট ছোট আঁটি বেঁধে বস্তায় ভরে রাখা হয়। সেই পাতা দিয়ে সারা বছর পাটি বোনা হয়। “পাতা ভালো কইরা শুকাইয়া ছোট ছোট আটি বানাই, পরে বস্তায় ভইরা রাখি। কেউ অর্ডার দিলে বস্তা থেইকা পাতা বাইর কইরা তখন পাটি বুনি,” বলেন মজিদা।
আগে পাটিতে ঘুমাত, এখন ধান শুকায়
খেজুরপাতার পাটির সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের যে সম্পর্ক ছিল, তা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সুফিয়ার স্মৃতিতে, আগে গরমের দিনে পাটিতে শুলে শরীরে আরাম লাগত। পাটিতে গরম কম লাগত, শরীর ঠান্ডা থাকত। মেহমান এলে পাটি পেতে বসতে দেওয়া হতো। নামাজের জন্যও পাটি ব্যবহার করা হতো। এমনকি ধান শুকানো ও কুমড়োর বড়ি দেওয়ার কাজেও পাটির ব্যবহার ছিল।
“আগে শোয়া, ঘুমানো, মেহমান বসতে দেওয়া, নামাজ পড়া, ধান রোদে দেওয়া-সব কামেই পাটি লাগত। কুমড়োর বড়িও দিতম পাটির ওপর। পাটিতে শুইলে গরম কম লাগত, ঠান্ডা থাকত। এহন মানুষ আর ওই মর্ম বোঝে না,” বলেন তিনি।এখন পাটির প্রধান ব্যবহার ধান শুকানো।

পলিথিন-ত্রিপলের কাছে হারছে পাটি
পাটির চাহিদা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সস্তা বিকল্প পণ্যের কথা বলছেন গ্রামের নারীরা। পলিথিন ও ত্রিপল তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। প্রয়োজন শেষে সহজে গুটিয়ে এক জায়গায় রাখা যায়। অন্যদিকে পাটি তৈরিতে সময় লাগে, পাতা কিনতে হয় এবং ঘরে রেখে দিলে ইঁদুরে কেটে নষ্ট করার আশঙ্কা থাকে।

সুফিয়া বলেন, “আগে পলিথিনের ব্যবহার কম আছিল। এখন পলিথিনের দাম কম, যেখানে-সেখানে রাইখা দেওয়া যায়। ত্রিপলও কম দামে পাওয়া যায়। পাটির দাম বেশি। আবার পাটি বুইনা উঠাইয়া রাখতে হয়, তাতে ইঁদুরে কাইটা দেয়। তাই মানুষ আর পাটি কিনতে চায় না।”

বছরে ১০-১৫ হাজার টাকা সহযোগিতা:
পাটি বোনা এখন আর আগের মতো নিয়মিত আয়ের কাজ নয়। তবু সংসারের ফাঁকে এই কাজ করে বছরে কিছু বাড়তি আয় করেন সুফিয়া ও মজিদা খাতুন। তার হিসাবে, “এই কাম কইরা বছরে ১০-১৫ হাজার টাকার মতো সংসারে সহযোগিতা করতে পারি। বেশি না, তয় নিজের হাতে কাম কইরা কিছু টাকা পাই-এইডাও ভালো লাগে,” বলেন তিনি। তবে তাঁর কাছে অর্থের চেয়ে কাজটির অন্য একটি মূল্যও আছে।
“অবসর সময়ে বইস্যা না থাইকা, গল্প করতে করতে পাটি বোনার মতো হাতের কাম আমার খুব ভালো লাগে। সময় পাইলে পাটি ন্যিা বই। এহন মাইয়া-বউরা সময় পাই না” বলেন সুফিয়া। বাইল নিয়া বইস্যা

‘মা-চাচিরা শেখাতেন, এখন কেউ শেখে না’:
পাটি বোনার দক্ষতা একসময় পরিবারেই শেখানো হতো। শাশুড়ি পুত্রবধূকে শেখাতেন, মা মেয়েকে শেখাতেন। চাচি, জা, ননদের কাছ থেকেও শেখার সুযোগ ছিল। সুফিয়া বলেন, “আমার শাশুড়ি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ শেখাইছে। আমরা শিখছি। মা-চাচিরাও শেখাইত। কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়ে, বউ-ঝিরা এই কাম করতে চায় না। এত সময় ধইরা বইস্যা বোনার সময় কই?” তাঁর চোখে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নতুন প্রজন্মের জীবনযাপনে। “আগে চাঁদনি রাতে উঠানে বইস্যা কত রাত পর্যন্ত পাটি বুনছি। এখন কারও সময় নাই। সময় পাইলে মোবাইল নিয়া বইস্যা থাকে,” বলেন তিনি।

‘পাটির মর্ম বোঝে না এখনকার ছেলেমেয়েরা’:
শ্রীরামপুরে এখনো আনোয়ারা, মোমেনা, মাজেদা, আমেনাসহ প্রায় ১০টি পরিবার পাটি বোনে। কিন্তু এই সংখ্যা ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ নতুন প্রজন্ম কাজটি শিখতে আগ্রহী নয়। বাজারে চাহিদা কম, পাটির দাম তুলনামূলক বেশি এবং তৈরি করতে সময় লাগে অনেক।

মজিদা খাতুনের কণ্ঠে তাই শুধু একজন পাটি কারিগরের আক্ষেপ নয়, একটি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যের আশঙ্কাও শোনা যায়। “এখনকার ছেলে-মেয়েরা পাটির মর্ম বোঝে না। এইডা যে কত আরামদায়ক, তারা জানে না। আস্তে আস্তে নতুন প্রজন্ম আসলে এই কাম বন্ধ হইয়া যাবে। আমি যখন থাকব না, তখন পাতার পাটির ঐতিহ্যও হয়তো আর থাকব না,” বলেন তিনি।

ইট বিছানো পথের পাশে তখনো তাঁর হাত চলছে। একের পর এক খেজুরপাতা জুড়ে তৈরি হচ্ছে পাটি। একসময় যে পাটি ছিল গ্রামের ঘুম, অতিথি আপ্যায়ন আর সংসারজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটিই এখন অপেক্ষা করে কোনো কৃষকের ধান শুকানোর জন্য।

এক সপ্তাহ, কখনো ১০ দিনের শ্রমে তৈরি হয় একটি পাটি। দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। কিন্তু সেই পাটির সঙ্গে যে স্মৃতি, দক্ষতা আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতের কাজ জড়িয়ে আছে-তার মূল্য কি শুধু টাকায় মাপা যায়?তবু গ্রামের কিছু নারীর হাতে এখনো বেঁচে আছে সেই পুরোনো কারুশিল্প
একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কমবেশি পাটি বোনার দৃশ্য দেখা যেত। বিশেষ করে নারীরা সংসারের কাজের ফাঁকে বসে পাটি বুনতেন। কারও জন্য এটি ছিল অবসর কাটানোর কাজ, কারও জন্য সংসারে বাড়তি আয়ের উপায়। আবার অনেক পরিবারের কাছে পাটি ছিল নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সহজ ও স্বল্পমূল্যের উপকরণ।এখন সেই দৃশ্য আর আগের মতো নেই।
মহারাজপুনের ভদি খাতুন বললেন, “ছোটবেলা থেইক্যাই মায়ের কাছে বইস্যা পাটি বুনতে শিখছি। আগে তো প্রায় ঘরেই পাটি বোনা হইত। এহন আর আগের মতো মানুষ পাটি বানায় না।”
আরেক নারী বললেন, “সংসারের কামকাজ শেষ কইরা অবসর সময়ে পাটি বুনি। পাতা জোগাড় করতে পারলে ঘরে বইস্যাই বানানো যায়। হাতে কাম থাকে, মনটাও ভালো থাকে।”
আগের মতো কদর নেই

পাটি বুননের সঙ্গে জড়িত নারীদের কথায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি
আগে গ্রামের বাড়িতে পাটি ছিল নিত্যব্যবহারের জিনিস। ঘরের মেঝেতে বসা, অতিথি আপ্যায়ন, নামাজ পড়া কিংবা উঠানে বসার জন্য পাটি ব্যবহার করা হতো। এখন অনেক বাড়িতে প্লাস্টিকের মাদুরসহ নানা ধরনের তৈরি পণ্য জায়গা করে নিয়েছে।

এক নারী আক্ষেপ করে বলেন, “আগে মানুষ পাটি চাইত, এখন বাজার থেইক্যাই নানা রকম জিনিস কিন্যা আনে। আমরা কষ্ট কইরা বানাই, কিন্তু আগের মতো দাম পাই না।”
আরেকজনের ভাষায়, “আমাগো মায়েরা যেভাবে পাটি বানাইছে, আমরা তো সেইভাবেই শিখছি। কিন্তু পোলাপান আর শিখতে চায় না। তারা কয়, এই কাম কইরা কী লাভ?”

হারিয়ে যাচ্ছে একটি গ্রামীণ ঐতিহ্য
পাটি বোনা শুধু একটি ঘরোয়া কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ নারীদের দক্ষতা, অবসর, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতি।
গ্রামের প্রবীণ নারীরা বলেন, আগে শীতের সময় কিংবা অবসর মৌসুমে অনেক বাড়িতে পাটি বোনার কাজ চলত। কয়েকজন নারী একসঙ্গে বসে পাতা প্রস্তুত করতেন, কেউ বুনতেন, কেউ আবার তৈরি পাটি গুছিয়ে রাখতেন। কাজের ফাঁকে চলত গল্প-আড্ডাও।

এখন সেই সম্মিলিত দৃশ্যও অনেকটাই হারিয়ে গেছে
এক প্রবীণ নারী বলেন, “আগে তো বিকেল হইলেই কয়েকজন মাইয়া-বউ একজায়গায় বইস্যা পাটি বুনত। কামও হইত, গল্পও হইত। এহন ওইসব কই? সবাই ব্যস্ত, আর পাটিরও তেমন কদর নাই।”

নারীর হাতে বাড়তি আয়
একজন নারী বলেন, “ঘরে বইস্যা বানাইতে পারি, তাই সংসারের কামেও সমস্যা হয় না। দুই-একটা বিক্রি হইলে যা টাকা পাই, ওইডা সংসারের কাজে লাগে।”
তবে তাঁদের অভিযোগ, শ্রমের তুলনায় পাটির দাম অনেক সময় কম থাকে। ফলে নতুন প্রজন্ম এই কাজের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।

সংরক্ষণ করা দরকার ঐতিহ্যটি
গ্রামের নারীদের হাতে তৈরি খেজুরপাতার পাটি পরিবেশবান্ধব একটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য। স্থানীয়ভাবে এর ব্যবহার ও বাজার তৈরি করা গেলে এটি আবারও নারীদের আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

পাটিকে শুধু গ্রামের ঘরের ব্যবহারের জিনিস হিসেবে না দেখে স্থানীয় কারুশিল্প হিসেবে বাজারজাত করা গেলে এর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অনলাইন বাজার, স্থানীয় মেলা, পর্যটনকেন্দ্রিক বিক্রয়কেন্দ্র কিংবা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এসব পণ্য শহরের মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

কারণ একটি পাটি শুধু খেজুরপাতার বুনন নয়। এর প্রতিটি ফাঁকে ফাঁকে মিশে আছে গ্রামের নারীদের শ্রম, সময় আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা দক্ষতা।
কারণ তাঁর কাছে এটি শুধু পাটি নয়—এটি মায়ের কাছ থেকে শেখা একটি কাজ, গ্রামের পুরোনো দিনের স্মৃতি এবং হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ