দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে ধর্মীয় ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালনা করছে ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’। এর আওতায় রয়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও সহজ কুরআন শিক্ষা। কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে হতাশাজনক চিত্র।
মোহনগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ মক্তবেই নিয়মিত পাঠদান হয় না। অধিকাংশ কেন্দ্রেই শিক্ষার্থী নামমাত্র। খাতায় শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে ক্লাসে কেউ আসে না।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনে আসার খবর পেলে শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে এনে সাময়িকভাবে দেখান। পরিদর্শন শেষ হলেই আবার কেন্দ্র ফাঁকা হয়ে যায়। উপজেলার একাধিক মক্তবের সাইনবোর্ডে পাঠদানের সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে ৯টা উল্লেখ থাকলেও নির্ধারিত সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কারও দেখা মেলে না।
সরেজমিন গত ৬ সেপ্টেম্ব ২০২৬ তারিখ সকাল ৭টা ৮টা পর্যন্ত মোহনগঞ্জ উপজেলর একাধিক সহজ কোরআন শিক্ষা ও প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বোর্ডে সময় লেখা থাকলেও কেন্দ্রসমুহ বন্ধ এবং সেখানে কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিত নেই।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোনো কোনো শিক্ষকের বাসস্থান এক ইউনিয়নে, অথচ তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত মক্তব অন্য ইউনিয়নে। তাঁরা সপ্তাহে একদিন শুক্রবার মক্তবে যান। এ অবস্থায় পাঠদান কখন হয়, এমন প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
একাধিক শিক্ষক আছেন যারা জাল সনদে চাকুরী করছেন। কোথাও বা শিক্ষককের স্বজন দিয়ে চলছে দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম। নিকাহ রেজিস্ট্রারসহ নানান পেশার সাথে জড়িত অনেক শিক্ষক।
এ ব্যাপারে মোহনগঞ্জ উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার মো. হাফিজুর বলেন, উপজেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে বর্তমানে সহজ কুরআন শিক্ষা কেন্দ্র ৬০টি এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র ৩৪টিসহ সর্বমোট ৯৪টি কেন্দ্রের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচারিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী সহজ কুরআন শিক্ষা কেন্দ্র সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পরিচালনার কথা। তবে তিনি স্বীকার করেন, অনেক কেন্দ্রে আশানুরূপ শিক্ষার্থী নেই। এমনকি কোনো কোনো কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে ১০-১২ জন শিক্ষার্থীও পাওয়া যায় না। এর পেছনে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আধিক্যকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষকদের অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, “কোনো কেন্দ্র বন্ধ বা খোলার ক্ষমতা আমার নেই। আমাদের কাছে অভিযোগ আছে, অনেক শিক্ষক সময়মতো পাঠদান করেন না। তাঁরা এক এলাকায় বসবাস করেন, কিন্তু দায়িত্ব পালন করেন অন্য এলাকায়।” প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার নিয়ম সম্পর্কে তিনি জানান, এই কেন্দ্রের কোনো শিক্ষার্থী একইসাথে অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না। তবে সহজ কুরআন শিক্ষার শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি এখানেও শিখতে পারে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এসব কেন্দ্রের শিক্ষকরা প্রতি মাসে ৬৩০০টাকা সম্মানী ভাতা এবং দুই ঈদে বোনাসসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত ক্লাস না করিয়েও অনেকে মাস শেষে সেই সম্মানী ও বোনাস তুলে নিচ্ছেন। প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রে ৩০ জন এবং সহজ কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রে ৩৫ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কেন্দ্রই শিক্ষক-শিক্ষার্থী শূন্য। তদারকির অভাবে বাড়ছে অনিয়ম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, মাঠপর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও দায়সারা পরিদর্শন করেন। ফলে অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারের কোটি টাকার এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম যাতে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে সব কেন্দ্রে সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।