পার্বত্য জেলার বান্দরবানের রুমা, আলীকদম ও লামা উপজেলার দুর্গম ম্রো অধ্যুষিত এলাকায় হামের উপসর্গ ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একাধিক শিশুসহ অন্তত ২৯ জনের মৃত্যুর দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ম্রো সম্প্রদায়ের সংগঠনের নেতারা। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের নথিতে হামের উপসর্গে এসব মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড নেই।
সোমবার (২৭ জুলাই) রুমা উপজেলার দুর্গম লেতং খুমী পাড়ার চার বছর বয়সী ফ্রেএং খুমী বান্দরবান সদর হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। এর দুই দিন আগে একই উপসর্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মারা যায় তার বড় ভাই প্রেটংএং খুমী (৭)। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে রুমা উপজেলায় হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা আটজনে পৌঁছেছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) পর্যন্ত একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন এবং বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালে ৩৬ জনসহ মোট ৪১ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পাড়াবাসীর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে রুমা সদর ইউনিয়নে সাতজন এবং গ্যালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের অংলাই ম্রো পাড়ায় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী কুপাও ম্রো (১৩)সহ মোট আটজনের মৃত্যু হয়েছে। গ্যালেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো কুপাও ম্রোর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, Mro Youth Organization-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে আলীকদম ও লামা উপজেলার দুর্গম এলাকায় হামের উপসর্গ ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মোট ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আলীকদমে ১৭ জন এবং লামায় চারজন মারা গেছেন।
সংগঠনটির ২৯ মে প্রকাশিত ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করা হয়, প্রথমে ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হলেও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পরে আরও চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২১ জনে দাঁড়ায়।সে হিসাবে স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত রুমা, আলীকদম ও লামার দুর্গম এলাকায় হামের উপসর্গ ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মোট ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অধিকাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে নিজ বাড়িতে, হাসপাতালে নেওয়ার পথে অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বান্দরবান সদর হাসপাতাল, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফারের পর যাতায়াতের সময়। ফলে এসব মৃত্যুর অনেকগুলোই হাসপাতাল ভিত্তিক সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

এ বিষয়ে বান্দরবানের সিভিল সার্জন এবং রুমা ও আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের নথিতে হামের উপসর্গে মৃত্যুর কোনো রেকর্ড নেই। তবে দুর্গম এলাকায় হামের উপসর্গে অসুস্থ শিশুর সংখ্যা বেড়েছে এবং চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।
আলীকদম Mro Youth Organization-এর সভাপতি সেথং ম্রো বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে আলীকদম উপজেলার চারটি দুর্গম ইউনিয়নে হামের উপসর্গ ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সংগৃহীত তথ্যে আলীকদমে ১৭ জন এবং লামায় চারজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে মৃতদের মধ্যে কতজন শিশু এবং কতজন প্রাপ্তবয়স্ক—সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে পৌঁছাতে পারেন না। পাশাপাশি ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যেও টিকা গ্রহণে অনাগ্রহ রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্গম এলাকার শিশুদের টিকাদানে উদ্বুদ্ধ করতে Mro Youth Organization সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত দুর্গম এলাকায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানান তিনি।