July 25, 2026, 2:23 pm
শিরনাম :
মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার শ্যামনগরে বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কালীগঞ্জে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

কয়রায় ইউসুফের চোখে এখন ৫ বিঘার সবুজ স্বপ্ন

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

কয়রা উপজেলা সদর থেকে গিলবাড়ী অভিমুখে ছুটে চলা প্রধান সড়ক। সেই পিচঢালা পথ ধরে কিছুটা এগোতেই বাম পাশে নেমে গেছে একটি গ্রামীণ পাকা রাস্তা। সেই পথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ চোখ আটকে যায় ঐতিহাসিক গণকবরের পাশে বিশাল এক সবুজ প্রান্তর। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক নান্দনিক সবজি খেত। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন কোনো নিপুণ শিল্পী মাটির ক্যানভাসে সযতনে সবুজ রঙের মায়া ছড়িয়ে দিয়েছেন।

শনিবার (১৮ জুলাই) তীব্র রোদের দুপুরে সেই মাঠের সৌন্দর্য দেখতে আর তৃষ্ণা মেটাতে দু-একটি কাঁচা শসা খাওয়ার আশায় খেতে পা বাড়াতেই দেখা মিলল এক অদ্ভুত দৃশ্যের।

রোদের তীব্রতা থেকে মাথা বাঁচাতে বাঁশের চ্যাচারি দিয়ে তৈরি এক বিশাল ডালা আকৃতির মাথাল (টুপি) মাথায় দিয়ে কাজ করছেন এক যুবক। তপ্ত রোদে ঘামে ভিজে গেছে শরীর। পরম যত্নে শ্রমিকদের সাথে নিয়ে বেগুন গাছের হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা ছিঁড়ছেন, নিড়ানি দিয়ে পরিষ্কার করছেন আগাছা, আর পোকার আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে দিচ্ছেন বালাইনাশক।

কাছে গিয়ে নাম জানতে চাইতেই চিলতে হাসি হেসে ডালা-টুপিটি কপাল থেকে একটু ওপরে তুললেন তিনি। এই যুবকই ইউসুফ আলী (৩২)। কয়রার বাগালী ইউনিয়নের ঘুগরাকাটি মিরেপাড়া গ্রামের জাহান আলীর ছেলে। বাবা পেশায় একজন ইন্জিন মিস্ত্রী, থাকেন গ্রামের বাড়িতে। আর ইউসুফ যেন এক আধুনিক ”যাযাবর” কৃষক, যার জীবনের গল্পটা সিনেমার চেয়েও নাটকীয় ও বেদনাবিধুর।

নেই নিজের জমি, ঝুপড়ি ঘরে যাযাবর জীবনঃ
আজ ৫ বিঘা জমিতে যার স্বপ্নের সবুজ চারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তার নিজের বলতে কোনো ফসলি জমি নেই। নেই মাথার ওপর স্থায়ী কোনো ছাদ। প্রতি বছর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে উপজেলার কোথাও না কোথাও চড়া দামে জমি লিজ নেন তিনি। আর জমি লিজ নেওয়ার সাথে সাথেই বদলে যায় তার ঠিকানাও।

ফসল আগলে রাখতে এবং যাতায়াত খরচ বাঁচাতে খেতের এক কোণেই বাঁশের খুঁটি পুঁতে, ওপরে ত্রিপল (পলিথিন) টানিয়ে তৈরি করেন একফালি ঝুপড়ি ঘর। রোদ-ঝড়-বৃষ্টির সাথে লড়াই করে সেই ঝুপড়িতেই স্ত্রী আর দুধের সন্তানকে নিয়ে কাটছে তার যাযাবর জীবন।

খেতের এক কোণে যখন ইউসুফ, তার বাবা আর শ্রমিকেরা মাটি আকড়ে কাজ করেন, তখন সেই ঝুপড়ির পাশে মাটির চুলায় কাঠের ধোঁয়ায় চোখ মুছতে মুছতে রান্না চড়ান তার স্ত্রী। রোদ-গরমে মাটির চুলা চললেও বর্ষার দিনগুলোতে কষ্টের সীমা থাকে না। চাল চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচতে তখন ঝুপড়ির ভেতর ছোট্ট গ্যাসের চুলাই ভরসা। সেখানে কোনোমতে রান্না সেরে ভেজা কাপড়ে চলে আহার ও রাত যাপন।

সাপের ভয় ও ঋণের বোঝা: জীবন বাজি রেখে লড়াইঃ
খোলা মাঠের এই ঝুপড়ি ঘরে থাকাটা মোটেও নিরাপদ নয়। সেখানে নেই কোন বিদ্যুৎ সংযোগ। ছোট্র একটি সৌর শক্তির পুটপুটে আলো তাও আবার রোদ না বের হলে তো চার্জ হয় না। উপকূলীয় এই অঞ্চলে রাতের আঁধারে যেকোনো সময় ঘরে ঢুকে পড়তে পারে বিষধর সাপ কিংবা বিষাক্ত পোকামাকড়। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর পোকার ডাক—এমন আতঙ্কের মধ্যেও প্রতি রাতে সন্তানকে বুকে নিয়ে ঘুমাতে যান এই দম্পতি।

কেন এই আত্মঘাতী লড়াই? জানতে চাইলে ইউসুফের চোখ ছলছল করে ওঠে। বুক চিরে বেরিয়ে আসে এক দীর্ঘশ্বাস,
“ভাই, পেটের দায় আর মাথার ওপর থাকা ঋণের বোঝা মানুষকে সব ভয় ভুলিয়ে দেয়। গত ৪-৫ বছর সবজি চাষ করে লাখ লাখ টাকা হারিয়েছি। দেনায় জর্জরিত গা-গতর। টানা চার থেকে পাঁচ বছর ধরে সবজি চাষে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে উল্টো পকেট খালি হয়েছে। লোকসান গুনতে গুনতে একসময় পুঁজি হারিয়েছেন, শেষ করেছেন লাখ লাখ টাকা। বারবার লোকসানের ধাক্কায় যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, ঠিক তখনই জীবনের সবচেয়ে বড় বাজিটা ধরেন যুবক ইউসুফ আলী। ২০২৬ সালের শুরুতে এসে বগা জামে মসজিদের মালিকানাধীন ৫ বিঘা জমি চড়া দামে ডাক দিয়ে প্রতি বছরে ৫৩ হাজার টাকা করে ৩ বছরের জন্য লিজ নেন। নতুন উদ্যমে শুরু করেন শসা, বেগুন আর কাঁচা মরিচের (ঝাল) সমন্বিত চাষ।

ইউসুফের সেই বুকভরা আশা এবার আর নিরাশ করছে না। মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। খেতের মাচায় ঝুলছে কচি শসা, বেগুনের গাছে এসেছে বেগুনি ফুল, আর কাঁচা মরিচের চারাগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। চার বছরের খরা কাটিয়ে এবার লক্ষাধিক টাকা লাভের স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা।

চোখে ঝলঝল পানি খুব কষ্টের সাথে বলেন, এবার বগা জামে মসজিদের এই ৫ বিঘা জমি চড়া দামে লিজ নিয়ে জীবনের শেষ বাজিটা ধরেছি। নিজের সবটুকু দিয়ে, বউ-বাচ্চাকে কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে দিন-রাত এক করে খাটছি।”

খরচের খতিয়ান ও লাভের সমীকরণঃ
ইউসুফের এই ৫ বিঘার খেতে এখন রয়েছে ১,৫০০টি শসা, ২,০০০টি বেগুন ও ১,৮০০টি কাঁচা মরিচের চারা। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার আর দিনমজুরের মজুরি মিলিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ২ লক্ষ টাকা ঋণ করে খরচ করেছেন তিনি। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিকূল আবহাওয়ায় এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে ইউসুফের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাঠের ফসল এখন তরতাজা।

চাষি ইউসুফ আলীর সাথে কথা বলে জানা গেল এক দারুণ আশার গল্প। তিনি জানান, খেত থেকে মাত্র শসা ওঠা শুরু হয়েছে। শুরুর প্রথম এক-দুই দিন শসার ফলন কিছুটা কম হলেও দিন দিন তা বাড়ছে। ইউসুফের আশা—

“আর মাত্র সপ্তাহখানেক পর থেকে প্রতিবারে (এক এক হাটে) অন্তত ৮ থেকে ১০ মণ করে শসা তুলতে পারব। বাজারে এখন পাইকারি ১৮০০ টাকা মন বিক্রি করছি। বর্তমান বাজারদর বজায় থাকলে শুধু শসা বিক্রি করেই আমার মোট খরচের অর্ধেক টাকা উঠে আসবে।”

সবচেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করছে বেগুনের খেতে। গাছগুলোতে প্রচুর ফুল এসেছে, আর বড়জোড় এক মাস পর থেকে পুরোদমে বেগুন তোলা যাবে। ইউসুফ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “বেগুন ধরা শুরু করার পর মাত্র ৩ দিনের হাটে যে বেগুন বিক্রি হবে, তাতেই আমার চাষের পুরো ২,৫৩,০০০ ( দুই লক্ষ তেপ্পান্ন হাজার টাকার খরচ উঠে আসবে। এরপর যা বিক্রি হবে, তার পুরোটাই লাভ।”

আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হাসিমুখে ইউসুফ বলেন, “এবার যদি লোকসান হতো, তবে হয়তো আমার সংসারটাই ভেসে যেত, আর কোনোদিন সবজি চাষ করতে পারতাম না। কিন্তু এবার ফসল দেখে আগেভাগেই আশার বুক বাঁধছি। আল্লাহ দিলে এবার সব ঋণ শোধ করে লাভের মুখ দেখবই ইনশাআল্লাহ।”

সংকটে পাশে নেই কৃষি অফিস, ক্ষোভ কৃষকেরঃ
ইউসুফের এই একক প্রচেষ্টায় যখন সাফল্যের সুবাতাস বইছে, তখন তার মনে রয়ে গেছে এক বুক অভিমান। সরকারি কোনো দপ্তর বা স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের পরামর্শ বা সহযোগিতা পাননি তিনি।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তরুণ এই কৃষক বলেন,
“সরকারিভাবে কৃষি অফিস থেকে যদি একটু কারিগরি বা সার-বীজের সহযোগিতা পেতাম, তাহলে আমার খরচের বোঝা কমতো এবং লাভের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের মতো প্রান্তিক চাষিদের খোঁজ তারা নেয় না। কোনো সহযোগিতাই আমরা পাই না।”

তিনি আরও জানান, এবার যদি কোনো কারণে লোকসান হতো, তবে সবজি চাষ চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে যেত। কারণ আর ঘুরে দাঁড়ানোর মতো কোনো সম্বল তার ছিল না।

ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন বার্তাঃ
সবজি চাষে বারবার লোকসান খেয়ে যেখানে অনেক তরুণ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, সেখানে কয়রার যুবক ইউসুফের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প স্থানীয় অন্য বেকার যুবকদের অনুপ্রাণিত করছে। সরকারি তদারকি ও সঠিক সময়ে কৃষি অফিসের সহযোগিতা পেলে ইউসুফদের মতো উদ্যোক্তারা দেশের সবজি উৎপাদনে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন—এমনটাই মনে করছেন এলাকার সচেতন মহল।

আপাতত সব হতাশা ভুলে প্রতিদিন ভোরে কুয়াশাভেজা ফসলের মাঠে চলে যান ইউসুফ। নিজের হাতে বোনা স্বপ্নের ফসল তোলার আনন্দই এখন তার দিনবদলের হাতিয়ার। ঝুপড়ি ঘরের অন্ধকার ভেদ করে যাযাবর ইউসুফের চোখ এখন কেবলই আলোর খোঁজে।

কৃষক ইউসুফের এই অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় কয়রা উপজেলার স্থানীয় ব্লকের উপসহকারী মাহফুজুর রহমানের সাথে সাথে। প্রান্তিক কৃষকদের নিয়মিত খোঁজ না নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, “উপকূলীয় এই অঞ্চলের লোনা আবহাওয়ায় ইউসুফ যেভাবে ৫ বিঘা জমিতে সমন্বিত সবজি চাষ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। হয়তো কোনো কারণে ইউসুফের সাথে যোগাযোগে কিছুটা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল।”

তিনি আরও আশ্বাস দিয়ে বলেন-
“আমরা দ্রুতই ইউসুফের এই সবজি খেত পরিদর্শনে যাব। মাঠপর্যায়ে তার ফসলের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হবে। এছাড়া পরবর্তীতে সরকারি কোনো কৃষি প্রণোদনা, সার কিংবা বীজ সহায়তার তালিকা তৈরি হলে আমরা অবশ্যই এই পরিশ্রমী তরুণের নামটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করব।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ