July 25, 2026, 3:21 pm
শিরনাম :
মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার শ্যামনগরে বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কালীগঞ্জে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

নদীভাঙনে সব হারিয়েও হার মানেননি হিরা

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

কপোতাক্ষ নদের চিরচেনা গর্জন এখন আর তাঁকে ভয় দেখায় না, বরং মনে করিয়ে দেয় শূন্য থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাশির হাটখোলায় কপোতাক্ষের পাড় ঘেঁষেই হিরা মণ্ডলের (৩০) ছোট্ট মিষ্টির দোকান। কাচের বাক্সে থরে থরে সাজানো রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম আর গজা। একপাশে গরম পেঁয়াজু ও শিঙাড়ার সুবাস। দোকানের এক কোণে খেলছে তাঁর তিন সন্তান, আর পরম মমতায় মিষ্টির পাত্রগুলো গুছিয়ে রাখছেন হিরা।

​কপোতাক্ষের সর্বগ্রাসী রূপ যাঁর ঘর-সংসার কেড়ে নিয়েছিল, সেই নদের তীরেই এখন মিষ্টির রসে নতুন করে জীবনের স্বপ্ন বুনছেন এই লড়াকু নারী।

​আম্পানের সেই কালরাত ও সব হারানোর বেদনাঃ
​একসময় নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল কাশির হাটখোলা। প্রতি মঙ্গলবার বসত জমজমাট হাট। এই হাটের নদী ঘেঁষা অংশেই ছিল হিরা মণ্ডল ও তাঁর স্বামী বিশ্বজিৎ মণ্ডলের বসতভিটা ও একটি সাধারণ মিষ্টির দোকান। ডাল-ভাত আর সাধারণ মিষ্টি বিক্রি করে ভালোই চলছিল দিন। স্বপ্ন ছিল দোকানটি একদিন বড় করবেন। কিন্তু ২০২০ সালের ২০ মে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও কপোতাক্ষ নদের তীব্র ভাঙন ওলটপালট করে দেয় সবকিছু।

সেই ভয়াবহ স্মৃতি হাতড়ে হিরা বলেন, “চোখের সামনে সব শেষ হইয়ে গেল। কিছুই বাঁচাতি পারিনি। মেয়েডারে নিয়ে শুধু প্রাণটা নিয়ে পালাইছিলাম।”
​ভিটেমাটি হারিয়ে তৎকালীন পাঁচ বছরের মেয়ে পূজাকে নিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন কাশির হাটখোলা বেড়িবাঁধের ওপর। তাঁবু খাটিয়ে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শুরু হয় এক অনিশ্চিত ও যাযাবর জীবন।

​নোনা জলের সংগ্রাম থেকে মিষ্টির কারিগরঃ
​দীর্ঘদিন বাঁধে কাটানোর পর বাধ্য হয়ে বাঁধসংলগ্ন খাসজমিতে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করেন তাঁরা। কিন্তু জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। সংসার চালাতে হিরা নেমে পড়েন কপোতাক্ষের নোনাপানিতে, জাল দিয়ে ধরতেন বাগদার পোনা। স্বামী বিশ্বজিৎ চালাতেন ভ্যান।

তবে হিরার চোখ জুড়ে ছিল পুরোনো সেই মিষ্টির দোকানের স্বপ্ন। এবার তিনি শুধু সাধারণ মিষ্টি নয়, ছানার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাধা ছিল একটাই—তিনি ছানার মিষ্টি বানাতে জানতেন না। অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে ছুটে যান পাশের এলাকার এক প্রবীণ মিষ্টি কারিগরের কাছে। হিরার ভাষায়, “আমি যাইয়ে বললাম, দাদু, আমি একটু মিষ্টি বানানি শেখপো। উনি বললেন, টাকা কিন্তু দিতি পারব না। আমি বললাম, আমার টাকা লাগবি না, শুধু কাজ শিখাই দেন।” বিনা পারিশ্রমিকেই প্রবীণ কারিগরের কাছ থেকে রপ্ত করেন রসগোল্লা, চমচম ও কালোজাম তৈরির জাদু।

ঋণের বোঝা ও অসুস্থতার নতুন চ্যালেঞ্জঃ
​গত বছর একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে আবার দোকানটি দাঁড় করিয়েছেন হিরা ও বিশ্বজিৎ দম্পতি। প্রতি মাসে গুনতে হয় ৩ হাজার টাকার কিস্তি। হিরা জানান, “স্বামী-স্ত্রী মিলি দোকান চালাতিছি। যেদিন বিক্রি কম হয়, সেদিন আবার গাঙে নামতি হয়। স্বামীও মাঝেমধ্যি দিনমজুরি করে। বসে থাকলি চলে না।”

​সংসারের এই টানাপোড়েনের মাঝেই হিরার শরীরে হানা দিয়েছে নতুন ব্যাধি। তাঁর বুকে টিউমার ধরা পড়েছে। খুলনায় চিকিৎসা করালেও ইদানীং আবার ব্যথা শুরু হয়েছে। টাকার অভাবে বন্ধ রয়েছে ডাক্তার দেখানো ও ওষুধ কেনা। এর ওপর মাথার ওপর ঝুলছে উচ্ছেদের তরবারি। দোকান ও ঘরটি সরকারি খাসজমিতে হওয়ায় যেকোনো সময় তা হারিয়ে ফেলার এক চাপা আতঙ্ক সবসময় তাড়া করে বেড়ায় এই পরিবারকে।

​সন্তানদের ঘিরেই আগামীর স্বপ্নঃ
​শত প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তার মাঝেও হিরাকে বাঁচিয়ে রেখেছে তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ। নিজে নোনা জল আর আগুনের আঁচে পুড়লেও সন্তানদের আলোয় ফেরাতে চান তিনি। দৃঢ় কণ্ঠে হিরা বলেন, “আমার একটাই স্বপ্ন, ছেলেমেয়েগুলারে লেখাপড়া শিখাইতে চাই। ওরা যেন আমাগের মতো কষ্ট না করে।”

এই দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে এলাকার মানুষের ভালোবাসাই হিরার সবচেয়ে বড় পুঁজি। মেয়ের জন্মের সময় সিজারিয়ানের খরচের জন্য হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে গোটা এলাকার মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল, তা আজও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন তিনি।

​বেদকাশী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক মিহির কান্তি মণ্ডল এই লড়াকু নারীকে নিয়ে বলেন, “কপোতাক্ষ হিরা মণ্ডলের সব কেড়ে নিলেও তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। কাশির হাটখোলার এই ছোট্ট মিষ্টির দোকানটি এখন আর কেবল এক টুকরো জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি দুর্যোগ ও নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়েও এক নারীর ফিনিক্স পাখির মতো মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক অনন্য প্রতীক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ