July 25, 2026, 3:17 pm
শিরনাম :
মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার শ্যামনগরে বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কালীগঞ্জে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

তাইওয়ান পিংক পেয়ারা চাষের উপযুক্ত সময় এখন, আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের

ফারুক হোসেন রাজ, স্টাফ রিপোর্টার

বড় আকৃতির ফল, আকর্ষণীয় গোলাপি শাঁস, মিষ্টি স্বাদ এবং বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তাইওয়ান পিংক জাতের পেয়ারা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিকভাবে এ জাতের পেয়ারা চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। অধিক ফলন, আকর্ষণীয় রঙ এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনায় অনেক কৃষক নতুন করে এ জাতের পেয়ারা বাগান গড়ে তুলছেন।

নার্সারি উদ্যোক্তারা জানান, তাইওয়ান পিংক জাতের পেয়ারাটি মূলত ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে। কুমিল্লার নার্সারি পরিচালক মাহমুদ হাসান বলেন, এ জাতের পেয়ারার মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশে এখনো সফলভাবে কলম উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আমদানিকৃত মাতৃগাছ থেকে উৎপাদিত চারা সংগ্রহ করে কৃষকদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তার নার্সারি থেকে প্রতি পিস তাইওয়ান পিংক পেয়ারার চারা ৬০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষক ও ফলচাষিদের কাছে নিয়মিত এসব চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। নতুন ও আকর্ষণীয় এ জাতের পেয়ারার প্রতি আগ্রহও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তাইওয়ান পিংক পেয়ারা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মাটির অম্লতা বা পিএইচ ৫.৫ থেকে ৭.৫ হলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে জমিতে পানি জমে থাকলে গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। এজন্য উঁচু জমি নির্বাচন ও সঠিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।

সাধারণত জুন থেকে আগস্ট মাস চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সেচের সুবিধা থাকলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর কিংবা বছরের অন্যান্য সময়েও চারা রোপণ করা যায়। রোপণের আগে জমি আগাছামুক্ত করে দুই ফুট দৈর্ঘ্য, দুই ফুট প্রস্থ ও দুই ফুট গভীর গর্ত তৈরি করতে হয়। এরপর পচা গোবর, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান মিশিয়ে গর্ত প্রস্তুত করে চারা রোপণ করা হয়।

চারা রোপণের ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। বছরে সাধারণত দুই থেকে তিনবার ফুল ও ফল ধারণ করতে পারে। তবে ভালো ফলনের জন্য ফুল ও ফলের সময় বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ডালে অতিরিক্ত ফুল বা ফল রাখা উচিত নয়। একটি সুস্থ ও সবল ডালে সাধারণত ১ থেকে ২টি ফল রাখা উত্তম। কোনো ডালে ৪ থেকে ৫টি ফল একসঙ্গে আসলে ছোট ও দুর্বল ফলগুলো অপসারণ করে দিতে হয়। এই পদ্ধতিকে ফল পাতলা করা বা থিনিং বলা হয়। এতে গাছের পুষ্টি কম সংখ্যক ফলে পৌঁছায় এবং ফল বড়, সুন্দর ও বাজারযোগ্য হয়।

ফুল আসার সময় নিয়মিত সেচ ও সুষম সার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করলে অনেক সময় ফুল ঝরে যেতে পারে। ফলে গাছে ফুল আসার পর পটাশ ও জৈব সারের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। একই সঙ্গে গাছের ভেতরের অতিরিক্ত ডালপালা ছেঁটে দিলে আলো ও বাতাস চলাচল বৃদ্ধি পায় এবং রোগবালাই কমে। ফলের গুণগত মান উন্নত করতে বর্তমানে অনেক কৃষক ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। ফল ছোট অবস্থায় কাগজ বা বিশেষ ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দিলে ফলমাছির আক্রমণ কমে, ফলের ত্বক মসৃণ হয় এবং রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।

তাইওয়ান পিংক পেয়ারায় কয়েক ধরনের রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে ফলমাছি অন্যতম ক্ষতিকর পোকা। এ পোকার আক্রমণে ফলের ভেতরে পচন ধরে এবং ফল বাজারজাত করার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এছাড়া পাতায় দাগ রোগ, অ্যানথ্রাকনোজ, পাতাঝরা রোগ এবং ছত্রাকজনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, আক্রান্ত পাতা ও ফল দ্রুত অপসারণ করতে হবে। বাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, নিয়মিত ডাল ছাঁটাই করা এবং ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করলে ফলমাছির আক্রমণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একটি পূর্ণবয়স্ক তাইওয়ান পিংক পেয়ারা গাছ থেকে বছরে ৪০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত ফল উৎপাদন সম্ভব। উন্নত পরিচর্যা ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় এর চেয়েও বেশি ফলন পাওয়া যেতে পারে। বাজারে মৌসুম ও মানভেদে প্রতি কেজি ফল ৬০ থেকে ১৫০ টাকা কিংবা তারও বেশি দামে বিক্রি হয়। বড় আকার ও আকর্ষণীয় রঙের কারণে এ জাতের পেয়ারার বাজার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা জিয়াউল হক বলেন, আকর্ষণীয় জাতের পিংক কালারের তাইওয়ান পেয়ারা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি ফল। তবে যে অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা হবে, সেখানে মাটির গুণাগুণ, পরিবেশ ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কারণ সব জাতের ফল সব অঞ্চলে সমানভাবে সফল হয় না। তাই বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, অনেক সময় নতুন কোনো জাত দেখে কৃষকরা বড় পরিসরে চাষ শুরু করে দেন। কিন্তু স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির ধরন এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা না করলে ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। তাই প্রথমে সীমিত আকারে চাষ করে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা ভালো।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত চারা, সঠিক মাটি নির্বাচন, নিয়মিত পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক ফল উৎপাদন প্রযুক্তি অনুসরণ করা গেলে তাইওয়ান পিংক পেয়ারা দেশের ফলখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের ফল উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই আকর্ষণীয় গোলাপি শাঁসের পেয়ারা।

ছবিতে: ফুল ও কুঁড়িতে ভরা তাইওয়ান পিংক পেয়ারার চারা। নতুন এ জাতের পেয়ারা নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে আগ্রহ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ