গোপালগঞ্জ ফেরত কয়রার ধানকাটা শ্রমিকদের মুখে হাসি ফুটল ধানের সাথে, “২০ দিন পরবাসী গায়ের ঘামেই কেনা সুখ ছয় মাসের ভাতের নিশ্চিন্তি-
গরমের তীব্র রোদ, হঠাৎ বৃষ্টি, অচেনা মাঠ—সব মিলায়ে ২০ দিনের এক কঠিন লড়াই। গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপরে। কয়রা-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের পিচ বেয়ে যেন আগুনের হলকা উঠছে। ঠিক তখনই ধুলো উড়িয়ে মোড় ঘুরল ধানের বস্তায় ঠাসা একটি বড় ট্রাক। দূর থেকে দেখলে মনে হবে শুধু ফসলের পাহাড়, কিন্তু কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল অন্য দৃশ্য। তীব্র ঝাঁকুনি আর তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে সেই বস্তাগুলোর ওপরই বসে আছেন একদল ক্লান্ত, তামাটে চামড়ার মানুষ। চিবুক বেয়ে ঝরছে ঘাম, কিন্তু চোখে-মুখে ক্লান্তির বদলে এক অদ্ভুত তৃপ্তির ঝিলিক। দীর্ঘ ২০ দিনের ‘পরবাস’ জীবন শেষে নিজেদের ভাগের বোরো ধান নিয়ে কয়রার মহারাজপুর এলাকায় ফিরছেন এই ২৫ জন কৃষি শ্রমিক।
আজ তাঁদের আনন্দের দিন। “২১ দিন পরবাসি হইলেও অন্তত ছয় মাস আর পেটের চিন্তা থাকেনা”—কথাটা কইতে কইতেই হাসি ফুটে ওঠে কয়রার শ্রমিক করিম গাইনের মুখে। খুলনার কয়রা উপজেলা থেকে প্রতি বছরই একদল দিনমজুর ধান কাটতে যায় গোপালগঞ্জ। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কষ্ট, ঘাম আর পরবাসের কষ্ট সহ্য করে সোনার ধান কেটে ঘরে ফিরেই এখন তাদের মুখে স্বস্তির ছাপ। বাস্তবে সেই লড়াই শেষে যখন সোনালি ধান উঠানে ছড়ায়, তখন কয়রার গ্রামগুলোতে বইতে থাকে স্বস্তির হাওয়া। শ্রমিকদের মুখে তখন একটাই কথা— “কষ্ট হইলেও শান্তি আছে, অন্তত ভাতের চিন্তা নাই।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চৈত্র-বৈশাখ এলেই কয়রা উপজেলার ইউনিয়ন—মহারাজপুর, কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশি, আমাদি, বাগালী, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম এলাকা থেকে শত শত শ্রমিক দল বেঁধে গোপালগঞ্জে যায়। সেখানে ২০-২২ দিন অবস্থান করে ধান কাটে, মাড়াই করে, তারপর ভাগ হিসেবে ধান নিয়ে বাড়ি ফেরে।

আজ শনিবার দুপুরে দলটির সঙ্গে দেখা হয় খুলনার কয়রা সড়কে উপজেলার গ্রাজুয়েটস হাইস্কুলের সামনে। শ্রমিকেরা জানান, জীবিকার সন্ধানে বোরো ধান কাটতে তাঁরা গোপালগঞ্জে গিয়েছিলেন। সেখানে তীব্র গরমে দিনরাত খাটুনির পর মজুরি হিসেবে ভাগে পাওয়া সোনার ধান নিয়ে তাঁরা আবার এলাকায় পরিবারের কাছে ফিরেছেন।
সড়কের পাশে ট্রাক থেকে ধানের বস্তাগুলো নামিয়ে স্তূপ করে রাখছিলেন শ্রমিকেরা। এ সুযোগে কোমরে বাঁধা গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিলেন আলমগীর নামের এক শ্রমিক। তিনি বললেন,
“২০ দিন আগে ধান কাটার শ্রমিক হিসেবে বাড়ি ছাইড়ে পরবাসী হইছিলাম। আজ সবাই ভাগের ধান নিয়ে ট্রাকে করে ফিইরা আইছি। আমার নিজের ভাগে হইছে ১৮ মণ ধান। প্রতিবছর এই রকম ২০ দিন পরবাসী হলি অন্তত ছয় মাস নিশ্চিন্তে ভাত খাতি পারি।
মৃত্যুর ভয় তাড়া করলেও ভরসা সেই ট্রাকঃ
গত বছর এই ধান কেটেই বাড়ি ফেরার পথে ঘটেছিল এক বড় বিপর্যয়। ভাগের ধান নিয়ে ট্রাকে করে কয়রা-খুলনা সড়ক দিয়ে ফেরার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় একটি গাড়ি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মহারাজপুর এলাকার দুই শ্রমিক. সেই ট্র্যাজেডির কথা মনে করে কয়রার ফরহাদ হোসেনের মতো অনেকেই এবার ভয়ে গোপালগঞ্জে ধান কাটতেই যাননি।
কিন্তু পেটের ক্ষিধের কাছে সেই ভয় হার মেনেছে অনেকের কাছেই। এবার যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশ নৌপথের ধীরগতির ঝুকি এড়াতে এবং দ্রুত ঘরে ফিরতে আবারও ট্রাকের ওপরই ভরসা করেছেন।
২২ জনের একটি দল নিয়ে গতকাল গ্রামে ফিরেছেন আঃ সালাম তিনি জানান, “গত বছর ট্রাকে করে ধান নিয়ে ফেরার সময় দুর্ঘটনা ঘটেছিল, মনডার মধ্যে এবারও ভয় ছিল। কিন্তু নৌকার চেয়ে ট্রাকে তাড়াতাড়ি আসা যায় আর খরচও কিছুটা সাশ্রয় হয়। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী এলাকায় টানা ১৬ দিন ধান কেটে একেকজন ১৬ মণ করে ধান পেয়েছি। গরমে কষ্ট হলেও এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত।”
কপোতাক্ষ নদীতীরবর্তী লোকা গ্রামের আঃ মজিদ বলেন, “ভাই, গরমের মইধ্যে রোদ্দুরে কাম করতি গা জ্বইলা যায়। আবার রাতি ঘুমাওনোর ঠিক ঠাঁই নাই। তয় কি করমু, পেট তো চালাইতে হইবো। এই ২০ দিন কষ্ট কইরা যা পাই, তাতেই ছয় মাস চালাইতে পারি।, এবার তাঁদের দলে ১২ জন লোক ছিল। টানা ১৭ দিন মাঠে ধান কেটে একেকজন ১৬ মণ ধান ভাগে পেয়েছেন। সবাই মিলে ধান নিয়ে ট্রাকে করে এলাকা পর্যন্ত আসতে ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ঝুঁকি থাকলেও ঘরের কোণে ধানের বস্তা দেখে এখন তাঁদের মনটা বড্ড খুশি।
একই গ্রামের হালিমা বেগম জানান, তার স্বামী প্রতিবছরই ধান কাটতে যান-
“ওরা গেলে মনটা খারাপ থাহে, কিন্তু ফিরা আইলে যখন ধান আনতে পারে, তখন বুকডা ভইরা যায়। এখন আর চিন্তা নাই, ঘরে ভাত আছে।”
ধান কেটে আনা শ্রমিকরা জানান, অনেক সময় জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে কাজ করতে হয়। ধান কাটার বিনিময়ে তারা নগদ টাকা না নিয়ে ধানের ভাগ নেয়। এতে করে একসাথে অনেক ধান ঘরে তোলা যায়, যা দীর্ঘদিনের খাদ্য নিশ্চয়তা দেয়।
শ্রমিক জব্বার সানা বলেন,
“টাকা লইলে খরচ হইয়া যায়, কিন্তু ধান আনলে ঘরে থাকে। তাই কষ্ট কইরা ধানই আনি। এইডাই আমাগো ভরসা।”
তবে এই শ্রমযাত্রা সহজ নয়। পথে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার কষ্ট, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা অসুস্থতার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। তারপরও দারিদ্র্যের চাপে প্রতি বছরই এই পরবাসের পথে পা বাড়ান তারা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এসব শ্রমিকদের জন্য সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে তাদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। তবে এসব হিসাব-নিকাশের বাইরে, আপাতত কয়রার গ্রামগুলোতে বইছে স্বস্তির হাওয়া। উঠোনে শুকাচ্ছে নতুন আনা ধান, গোলা ভরার প্রস্তুতি—আর শ্রমিকদের মুখে একটাই কথা,
“কষ্ট হইলেও শান্তি আছে, অন্তত ভাতের চিন্তা নাই।”“গায়ের ঘামেই ভাতের নিশ্চিন্তি—২১ দিনের লড়াইয়ে ছয় মাসের ভরসা”
কেন এই ‘পরবাসী’ জীবন?
কয়রা উপজেলার লবণাক্ত এ জনপদে বছরের অন্য সময়ে তেমন কোনো কাজ থাকে না। অধিকাংশ এলাকায় লোনাপানির চিংড়ির ঘের হওয়ায় ধান বা অন্য ফসল খুব একটা হয় না। মাছের ঘেরেও খুব কম মানুষের কর্মসংস্থান হয়। তাই বাধ্য হয়েই আয়রোজগারের জন্য এলাকা ছেড়ে দূরদূরান্তে ছুটে যান এই মানুষ।
কয়রার পরবাসী শ্রমিকদের খতিয়ান-
১।কয়রা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, প্রতি বছর শুধু ধান কাটার মৌসুমেই এলাকা ছাড়েন হাজার হাজার মানুষ।
২।বার্ষিক অস্থায়ী অভিবাসী শ্রমিক: প্রায় ৩,০০০ জন (কৃষি বিভাগের তালিকাভুক্ত)।
৩।প্রধান গন্তব্য: গোপালগঞ্জ, কাশিয়ানী, মাদারীপুরের টেকেরহাট, কোটালীপাড়া।
৪।মজুরি কাঠামো: সাধারণত নগদ টাকার বদলে উৎপাদিত ধানের একটা নির্দিষ্ট অংশ (ভাগের ধান)।
৫।এ বছরের গড় আয়: জনপ্রতি ১৮থেকে ২০ মণ ধান (১৭ থেকে ২১ দিনের পরিশ্রমে)।
কয়রা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গুরুদাস কুমার জানান: করোনাকালে এই ভ্রাম্যমাণ কৃষি শ্রমিকদের একটি সরকারি তালিকাও তৈরি করা হয়েছিল।
স্থানীয়রা জানান, শুধু ধান কাটার মৌসুমই নয়, বছরের বিভিন্ন সময়ে কয়রার একের পর এক গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। কোনো দল চলে যায় বুক কাঁপানো সাগরে মাছ ধরতে, আবার কেউ কেউ দাদনের টাকা অগ্রিম নিয়ে পাড়ি জমান দূর শহরের ইটভাটায়।
স্থায়ী কর্মসংস্থান দাবিঃ
উপকূলের এই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রার অবসান চান স্থানীয় উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। উন্নয়ণ সংগ্রাম কমিটির সভাপতি প্রভাষক বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন,
“প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর চিংড়ি চাষের কারণে এই অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততা জেঁকে বসেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ। পেটের দায়ে এই মানুষদের ট্রাকে করে কিংবা নানা ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে অস্থায়ী অভিবাসী হতে হচ্ছে। উপকূলীয় জনপদে যদি কর্মসংস্থানের বিকল্প ও স্থায়ী সুযোগ তৈরি করা না যায়, তবে এই শ্রমজীবী মানুষের জীবনের সংকট ও ঝুঁকি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে.” দুর্ঘটনার শঙ্কা, তীব্র তাপদাহ আর ঘরের মানুষদের উদগ্রীব প্রতীক্ষা—সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কয়রার ঘরে ঘরে এখন নতুন চালের ঘ্রাণ।
এই সোনাঝরা ধানটুকুই আগামী কয়েক মাস বাঁচিয়ে রাখবে উপকূলের এই লড়াকু মানুষদের।