July 25, 2026, 6:44 pm
শিরনাম :
আগের সরকারের দুর্নীতির তদন্ত করে পরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু যশোরের বাঘারপাড়ায় এনসিপির পথসভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ তালায় টিআরএম বিলের বকেয়া আদায় ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন প্রান্তিক ভূমিহীন ও মৎস্যজীবীদের কেন্দ্রীয় ভূমি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত পবিপ্রবিতে চাকসু প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় জুলাই অভূত্থান স্মরণে ছাত্রশিবিরের আয়োজনে স্বর্ণপদক প্রদান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রাজশাহী ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন ভূমিমন্ত্রী মেদনী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মাঠে রফিকুল ইসলাম খান কালীগঞ্জে বাল্য বিয়ের অপরাধে কনের পিতাকে ছয় মাসের কারাদন্ড

ডান হাত উঁচু করে শপথ ‘বাল্যবিবাহ করবো না’ চম্পক লতার সংগ্রামের গল্প

ফারুক হোসেন রাজ, স্টাফ রিপোর্টার

একটি ছবি – মাঝখানে দৃঢ়চোখে দাঁড়িয়ে চম্পক লতা, দু’পাশে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। সবার ডান হাত উঁচু, কণ্ঠে উচ্চারিত একটাই অঙ্গীকার – “বাল্যবিবাহ করবো না, বাল্যবিবাহ হতে দেবো না।”

ছবিটি তোলা হয়েছে কলারোয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণপুর সৈয়দ কামাল বখত মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। একটি স্থিরচিত্র হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম, দায়বদ্ধতা আর স্বপ্নবোনা এক তরুণীর দীর্ঘ পথচলার গল্প।

চম্পক লতা বর্তমানে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ-এর অর্থনীতি বিভাগের সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। কিন্তু তার শিক্ষাজীবনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না।

২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। টিফিনের পাঁচ টাকা জমিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করতেন। অল্প বয়সেই জীবন তাকে শিখিয়ে দেয় দায়িত্ব কাকে বলে। ২০২১ সালে তার বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কাজ করার সামর্থ্য হারান। মাত্র ১৭ বছর বয়সে চম্পক লতাকে সংসারের হাল ধরতে হয়। বাবার মৃত্যু সেই দায় আরও বাড়িয়ে দেয়। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, সংসারের ব্যয় – সবকিছু এসে পড়ে তার কাঁধে।

টিউশনির পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওতে কাজ করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে থাকেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যান অবিচলভাবে। তিনি সরকারি DoICT অধিদপ্তরের ‘হার পাওয়ার’ প্রকল্পে কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে আরও দৃঢ় করেছে। তার উপলব্ধি – শিক্ষা হারালে জীবন থেমে যায়।

নিজের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকেই ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর গ্রামে দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে পড়ানো শুরু করেন চম্পক লতা। যেসব শিশু টাকার অভাবে কোচিং বা প্রাইভেট পড়তে পারে না, তারা তার কাছে আশ্রয় পায়। শুধু পাঠদানেই থেমে থাকেননি তিনি। পুরোনো বই সংগ্রহ করে বিদ্যালয়ে একটি ছোট লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। লক্ষ্য – অভাব যেন কোনো শিশুর শিক্ষাজীবনের বাধা না হয়, বইয়ের অভাবে যেন কেউ ঝরে না পড়ে।

২০২৩ সালে তিনি Winrock International-এর অগ্রগতি সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত FSTIP প্রকল্পে পিয়ার লিডার হিসেবে যুক্ত হন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা, আলোচনা ও অঙ্গীকার কর্মসূচি পরিচালনা তার নিয়মিত দায়িত্বে পরিণত হয়। কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি বাল্যবিবাহবিরোধী ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছেন। দীর্ঘ চার বছর মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন – শুধু প্রচারণা যথেষ্ট নয়। অনেক বাল্যবিবাহ ঘটে যায় সবার অগোচরে। তার মতে, বাল্যবিবাহের মূল কারণ দারিদ্র্য ও অল্পবয়সে কিশোর-কিশোরীদের ভুল সিদ্ধান্ত। তাই প্রতিরোধের উপায়ও হতে হবে দ্বিমুখী সচেতনতা ও শিক্ষায় সহায়তা। বর্তমানে তিনি আরডিএফ এনজিওর FSTIP প্রকল্পে আশাশুনি উপজেলার উপজেলা কমিউনিটি মবিলাইজার হিসেবে কাজ করছেন। বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে ডিভোর্স বা নির্যাতনের কারণে যারা পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে, তাদের পাশে দাঁড়ান তিনি। শিক্ষা উপকরণ দেওয়া, মানসিক সাহস জোগানো এবং পুনরায় বিদ্যালয়ে ফেরার অনুপ্রেরণা দেওয়াই তার অন্যতম কাজ। তার বিশ্বাস একটি ভুল সিদ্ধান্তে একটি মেয়ের পুরো জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে না।

প্রিয় বিদ্যালয়ে ফিরে নতুন লড়াই চম্পক লতার । রামকৃষ্ণপুর সৈয়দ কামাল বখত মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়-এর প্রাক্তন শিক্ষার্থী। স্কুলভিত্তিক ক্যাম্পেইনের সময় তিনি জানতে পারেন, এই বিদ্যালয়ে প্রতিবছর মাত্র ১৪-১৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এবছর এসএসসি ২০২৬ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে মাত্র ১৭জন শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের থেকে জানতে পারেন যে তারা যখন ২০২১সালে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয় শিক্ষার্থী ছিল ৪৫জন এবং বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ১৭জন। গত পাঁচ বছরে ২৮ জন শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে গেছে। নতুন দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছোঁয়া জানায় তারা ২০২২সালে ভর্তি হয় ৩৪জন শিক্ষার্থী এবং বার্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ১৫জন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী ছোঁয়া জানায়, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগেই আরও অনেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বাস্তবতা চম্পক লতাকে নাড়িয়ে দেয়। তিনি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণি থেকে ৫ জন করে শিক্ষার্থী নিয়ে একটি কিশোরী দল গঠন করেন। এ দল বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীর অবস্থা ও ঝুঁকির তথ্য সংগ্রহ করবে। প্রতি মাসে একবার কিশোরীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা ও কাউন্সেলিং করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে একটি পুরোনো গাইড বইয়ের লাইব্রেরি চালু করেছেন। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা পুরোনো গাইড জমা দেয়; আর দরিদ্র শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে বই সংগ্রহ করে পড়াশোনা চালায়। তার মতে, এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করবে এবং তাদের চিন্তাধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মুনসুর আলী বলেন, বাল্যবিবাহ আমাদের সমাজের বড় একটি সমস্যা। শুধু বিদ্যালয় বা প্রশাসন একা এটি বন্ধ করতে পারবে না। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সচেতন তরুণ সমাজ – সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলে অবশ্যই বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব হবে। চম্পক লতার মতো উদ্যোগ আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।

সহকারী ইংরেজি শিক্ষক মোঃ সাইদুর রহমান বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, অনেক মেধাবী ছাত্রী অল্প বয়সে বিয়ের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এই শপথ কর্মসূচি ও কিশোরী দল গঠনের মাধ্যমে মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। এভাবে সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কমবে এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

২০১৭ সালে উত্তরণের কিশোরী ক্লাবের সভাপতি হিসেবে সামাজিক কাজে হাতেখড়ি হয় তার। পরবর্তীতে বাল্যবিবাহ, মানবপাচার, নিরাপদ অভিবাসন, মানবাধিকার, শিশু সুরক্ষা, তথ্য অধিকার আইন ও যুব দক্ষতা বৃদ্ধি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০১৭ সাল থেকে উত্তরণ, অগ্রগতি, আরডিএফ, রূপান্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং The Carter Center, USAID ও UNDP-এর সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে সম্পৃক্ত ছিলেন।

সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাজমুন নাহার চম্পক লতার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার জন্য কাজ করা সত্যিই প্রশংসনীয়। চম্পক লতার মতো তরুণীরাই সমাজ পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর চম্পক লতার ডান হাত উঁচু করা সেই ছবিটি কেবল একটি মুহূর্ত নয়; এটি একটি প্রজন্মের বদলে যাওয়ার অঙ্গীকার। সংগ্রামকে শক্তিতে রূপান্তর করে চম্পক লতা প্রমাণ করেছেন – একজন মেয়েও চাইলে নিজের পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজকে বদলে দিতে পারে। বাল্যবিবাহের অন্ধকারের বিরুদ্ধে তার এই আলোকযাত্রা আজ অনেক কিশোরীর স্বপ্ন দেখার সাহস হয়ে উঠছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ