ভোরে জাল কাঁধে বনে ঢোকে কয়রার বনজীবী জেলেরা। ভোটের দিনেও আলাদা কিছু হয় না-সকালে ভোট, পরদিন আবার সুন্দরবন। বাঘের চোখ, নদীর স্রোত আর দেনার খাতার মাঝেই তাঁদের জীবন। তাই ভোট দিতে গেলেও মনে প্রশ্ন-এই ভোট কি আদৌ আমাগের জন্য?
নির্বাচন এলেই গ্রামে গ্রামে পোস্টার, মাইকিং আর প্রতিশ্রুতির বন্যা। কযরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বনাঞ্চলে বসবাস করা বনজীবী জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছেই এসব যেন চেনা কিন্তু দূরের গল্প। ভোট এলেও তাদের জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আসে না-এমন অনুভূতিই উঠে এসেছে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে। সুন্দরবনের পাশের একটি গ্রাম ৪ নং কয়রা কথা হয় ৫৫ বছর বয়সী বনজীবী আঃ হামিদ সরদারের সঙ্গে। জীবন কেটেছে বনেই-মধু সংগ্রহ, কাঁকড়া ধরা আর কখনো কখনো মাছ ধরেই সংসার চালান। ভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভোট দিই লাইনে দাঁড়াইয়া, কিন্তু আমাগের ভাগ্য দাঁড়ায় না’। বন তো আগের মতোই বিপদে ভরা, দুঃখও আগের মতোই।” এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন তিনি।
হামিদ সরদারের এই কথার সঙ্গে মিল পাওয়া
আশপাশের অনেকের অভিজ্ঞতায়। তাঁদের ভাষ্য, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা গ্রামে আসেন, ভোট আইলেই নেতা কই- “ভাই, বাঁধ ঠিক কইরা দিমু, পানি আর ঢুকবো না।” ভোট শেষ হইলেই সেই বাঁধ আগের মতোই ঢিলা, জোয়ার আইলে বুক কাঁপে।
ভোটের সময় কইছিল- “বনের চিন্তা করিস না, তোদের পাশেই আছি।” ভোট শেষ হইতেই বনই হইল ভয়, মধু তুলতে গেলেই মামলার আতঙ্ক।ৃ
দু’জনে একসাথেঃ ভোটের আগে আমরা মানুষ, ভোটের পরে আমরা শুধু ভোট। এই গাঁয়ের কথা শোনার মানুষ আর কেউ নাই নাকি?কয়রার আমাদী, মহারাজপুর, দক্ষিণ ও উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে সুন্দরবননির্ভর হাজার হাজার বনজীবী জেলে থাকেন। ভোেট দেন তাঁরা সবাই। কিন্তু ভোট শেষে বদলায় না তাঁদের জীবন।
‘ভোট দিই নাগরিক বইলা, বাঁচি বনজীবী বইলা’
আমাদী ইউনিয়নের জেলে আনোয়ার গাজী (৫৫) কয়রার টানে বলেন, “ভোট দিই নাগরিক বইলা। কিন্তু বাঁচি বনজীবী বইলা। ভোট দিয়া যদি পেট ভরত, তাইলে এই কষ্ট থাকতো না।” তার ভাষায়, ভোটের পর আর কেউ খোঁজ নেয় না-না জীবনের, না জীবিকার।
ভোটের দিনে নিরাপত্তা, বনে গেলে নীরবতা/ শূন্যতা
ভোটের দিন কেন্দ্রজুড়ে নিরাপত্তা। কেন্দ্রের সামনে পুলিশ, আনসার, ক্যামেরা।কিন্তু সুন্দরবনে গেলে সেই নিরাপত্তা আর থাকে না। মহারাজপুরের আঃ রহিম গাজী ও আঃ সামাদ বলেন, “ভোটের দিন পুলিশ থাকে। বনে গেলে আমাগের লাইগা কেউ থাকে না। ভোট নিলেই দায়িত্ব শেষ-এইটাই আমাগের অভিজ্ঞতা।”
স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর কয়রায় বাঘের আক্রমণ, ডাকাতি ও প্রাকৃতিক দুর্ঘটনায় বহু বনজীবী জেলে আহত বা নিহত হন। ক্ষতিপূরণ পেতে অনেককে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। এমনকি পরিবারগুলোর বড় অংশই নিয়মিত সহায়তা পান না।
নারীদের ভোট, নারীদের ভয়
বনজীবী জেলেদের পরিবারে ভোেট মানে আলাদা দুশ্চিন্তা। দক্ষিণ বেদকাশীর গৃহবধূ হালিমা বিবি বলেন, “ভোট দিই ঠিকই। কিন্তু ভোেট দিলে কি স্বামী বাঁচে? এই প্রশ্নের উত্তর নাই।” তিনি জানান, স্বামী বনে গেলে প্রতিটি রাত কাটে আতঙ্কে।
বিশেষজ্ঞদের কথা
উপকূলীয় সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, কয়রার বনজীবী জেলেদের ভোটবিরোধিতা নয়, কোনো অলসতা নয়, বরং বারবার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার দীর্ঘ ফারাকের প্রতিফলন। তাঁরা বলছেন, ভোটের সঙ্গে যদি জীবন-নিরাপত্তা, বিমা, ন্যায্যমূল্য আর বিকল্প কাজ না জুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে এই মানুষগুলোর কাছে ভোট কেবল আনুষ্ঠানিকতাই থাকবে। ভোটের কালি শুকায় একদিনে। কিন্তু কয়রার বনজীবী জেলেদের জীবন প্রতিদিনই লেখা হয় । লবণপানি, বাঘের ছাপ আর দেনার খাতায়।
তাঁরা বলছেন, বনজীবী জেলেদের জন্য
জীবন ও দুর্ঘটনা বীমা
দ্রুত ক্ষতিপূরণ
ন্যায্যমূল্যবিকল্প
কর্মসংস্থান
নিশ্চিত না হলে ভোট তাঁদের কাছে শুধু একটি দিনের দায়িত্বই থেকে যাবে। উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের বনজীবী জেলে মান্নান গাজী (৬০) কয়রার টানে বলেন, “ভোট দিই ঠিকই। কিন্তু কপালে কিছু জোটে না। বনে গেলে বাঘ, ঘরে আইলে দেনা-এইটাই আমাগের হিসাব।”
‘জাল ফেলি ভাগ্যের উপর’
আমাদী ইউনিয়নের বনজীবী জেলে আজিজুল গাজী (৪৫) বলেন, “বনে গেলে বাঘের ভয়, ডাঁইনে গেলে ডাকাতের ভয়। তাও যাই-কারণ ঘরে পোলাপান আছে। জাল ফেলি ভাগ্যের উপর।” তাঁর মতো অনেক জেলের ভাষ্য, একেকবার বনে গেলে ৭-১০ দিন পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। এই সময়টায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে খবর পৌঁছাতেও দেরি নারী-শিশুর অপেক্ষা, বনজীবী জেলেদের অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকেন পরিবারের নারীরা। দক্ষিণ বেদকাশীর গৃহবধূ ফিরোজা বিবি বলেন, “নৌকা ছাড়ার দিন থেইকা ঘুম হারাম। নদী শান্ত থাকলেও বুক শান্ত থাকে না।”
তবু আশা ছাড়েননি সবাই
সবাই যে একেবারেই আগ্রহ হারিয়েছেন, তা নয়। তরুণ বনজীবীদের কেউ কেউ এখনো বিশ্বাস করেন, একদিন পরিস্থিতি বদলাতে পারে। সুন্দরবনের তরুণ মৎস্যজীবী সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, “হয়তো একদিন এমন কেউ আসবে, যে সত্যিই আমাদের কথা ভাববে। সেই আশাতেই এখনো ভোেট দিই।”
বনজীবীদের জীবনে ভোট এখনো বড় কোনো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসতে পারেনি। তবে তাঁদের কণ্ঠে বারবারই ফিরে আসে একই কথা-সম্মান, নিরাপত্তা আর টিকে থাকার নিশ্চয়তা। নির্বাচন আসে যায়, কিন্তু সেই মৌলিক চাহিদাগুলো রয়ে যায় অপূর্ণই।
শাকবাড়িয়া নদীর তীরের বেড়িবাঁধে বসে মাছ ধরার জাল সেলাই করছিলেন ৪ নম্বর কয়রা গ্রামের রহিম শেখ তিনি বললেন, ‘এইবার ভোটটা দিতি চাই। আগের কয়ডা নির্বাচনে ভোট দিতি পারিনি। কিন্তু এখন শুনতিছি-ভোটের দিন নাকি গণভোটও হইবো। এই রাজার ভোটের মধ্যি আবার গণভোেট ঢুকল কেমনি!’
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বনজীবী রুহুল আমিনন। সদ্য সুন্দরবন থেকে মাছ ধরে ফিরেছেন তিনি। রুহুল আমিনের ভাষায়, ‘আগে তো ভোটই দিতি পারতাম না। এবার নাকি দুইখান ব্যালট দেবে-একখান রাজার ভোটের, আরেকখান গণভোটের। কে জিতল বড় কথা নয়, ভোটটা যেন ঠিকঠাক হয়-সেইডাই চাই।’
শাকবাড়িয়া নদীর তীর ধরে এগোলে একের পর এক চোখে পড়ে কয়রা উপজেলার টেপাখালী, গুড়িয়াবাড়ী, পাথরখালী, হরিহরপুর, গাতিরঘেরি, বীণাপাণি, জোড়শিং ও গোলখালী গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব এলাকার মানুষ সুন্দরবন ও নদীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।
কত কয়েক দিন সরেজমিনে এসব এলাকা ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়রা উপজেলার প্রধান সমস্যাগুলো ভাঙাচোরা সড়ক, দুর্বল বেড়িবাঁধ আর সুপেয় পানির সংকট। এই তিন সমস্যাই নিত্যদিনের কষ্টকে আরও গভীর করে তুলেছে।
গুড়িয়াবাড়ী গ্রামের স্কুলশিক্ষক সৌমেন সরকার বলেন, আইলা থেকে ইয়াস-একটির পর একটি ঘূর্ণিঝড়ে কয়রা উপজেলা বিপর্যস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতের ছাপ এখনো স্পষ্ট। লবণাক্ততার কারণে অনেক জমি একফসলিতে নেমে আসায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। তিনি বলেন, ভোেট ঘিরে রাস্তা ও বেড়িবাঁধের প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও, নির্বাচন শেষে সেগুলোর বাস্তবায়ন হবে কি না-সেটাই মানুষের সবচেয়ে বড় সংশয়।
মহারাজপুর গ্রামের দশালিয়া বেড়িবাঁধে জাল জোড়া দিচ্ছিলেন বৃদ্ধ জেলে আফসার আলী । হাতের কাজ থামাইয়া তিনি বললেন, ‘১২ তারিখে ভোেট আছে-এইটা জানি। তয় দিনমজুর মানুষ, কাজে থাকি, সব খবর রাখবার সময় নাই। মনে একটা মার্কা ( প্রতীক) ঠিক করা আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে আগায় থাকবে, ভোটটা তারেই দিমু।’
সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এই ভোটারের বড় অংশই সুন্দরবননির্ভর শ্রমজীবী মানুষ। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পি (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আসাদুল্লাহ ফকির (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির
আমাগো উপকূলের মানুষের চাওয়া খুব সোজা।
ভোটের দিন যেন ঠিকঠাক ভোট দিতি পারি।
আর যাঁরা ভোট পাইয়া ক্ষমতায় যাইবেন,
তাঁরা যেন ভোটের পর আমাগো কথা ভুলে না যান।
, কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা
গত বৃহস্পতিবার থেইকা প্রার্থীরা গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুইরা ভোট চাইতেছে। মাইক বাজাইয়া, পথসভা কইরা আর লিফলেট দিয়া কথা বলতেছে। কইতেছে—রাস্তা ঠিক করবো, নদীভাঙন ঠেকাইতে শক্ত বেড়িবাঁধ দিমু, খাওয়ার পানির কষ্ট ঘুচাইবো, চিকিৎসা ভালো করবো, সুন্দরবন ঘিরা কাজকাম বাড়াইবো। তয় গাঁয়ের মানুষের মনে একটাই কথা—ভোটের আগে কথা অনেক, ভোটের পরে এইগুলা কতোটা হবে, সেইডাই বড় সন্দেহ।
গত দুই দিনে সুন্দরবনসংলগ্ন দুই উপজেলার ৩০ থেকে ৩৫ জন মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। অনেকেই নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন, সেটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কেউ বলেন, ভোটে কিছু বদলায় না। তবু সবার কণ্ঠে একটাই প্রত্যাশা -ভোট যেন শান্তিপূর্ণ ও ভয়হীন হয়।
কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক শিক্ষক আ ব ম আব্দুল মালেক বলেন, উপকূলের মানুষের চাওয়া খুব সহজ। ভোটের দিন মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, আর যাঁরা ক্ষমতায় যাবেন, তাঁরা যেন সাধারণ মানুষের কথা ভুলে না যান-এইটাই তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা।