April 22, 2026, 4:33 pm
শিরনাম :
ময়মনসিংহে পূবালী ব্যাংকের ক্যাশলেস ক্যাম্পেইনের শুভ উদ্ধোধন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনেস্কো প্রতিনিধির সৌজন্য সাক্ষাৎ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ঢাকাস্থ জার্মান রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ সংরক্ষিত নারী আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মনোনয়নপত্র জমা চট্টগ্রামে সরকারি সিটি কলেজের ঘটনায় জামায়াতের বিবৃতি মাভাবিপ্রবিতে বিএসি অ্যাক্রেডিটেশন বিষয়ক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত কাঁঠালিয়ায় উৎসবমুখর পরিবেশে এসএসসি ও সমমানের পরিক্ষা শুরু রাজশাহী মেডিক্যালে চিকিৎসা সেবা নিয়ে চরম ক্ষোভ, ইন্টার্নদের কর্মবিরতিতে ভোগান্তি বেড়েছে রাউজানে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বাঘের মেলা’ অনুষ্ঠিত: লোকজ উৎসবে জনস্রোত ফরিদপুরে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিলেন আওয়ামীলীগ কর্মীরা

উপকূলবাসীর দুঃখ দূর্বল বেড়িবাঁধ দূর্যোগে আতঙ্কের নাম নভেম্বর

শাহজাহান সিরাজ, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

“চীনের দুঃখ” হিসেবে পরিচিত হোয়াংহো নদী যেমন ধ্বংসাত্মক বন্যার জন্য কুখ্যাত ছিল, তেমনি বাংলাদেশের উপকূলের বাসিন্দাদের জন্য দুর্বল বেড়িবাঁধ একটি দুঃখজনক বাস্তবতা। দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে প্রায়শই বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং ভাঙনের শিকার হতে হয়, যার ফলে জীবন ও জীবিকার মারাত্মক ক্ষতি হয়।

উপকূলবাসীর দুঃখের প্রধান কারণ হল দুর্বল বেড়িবাঁধ, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ভেঙে যায় এবং ফসল, ঘরবাড়ি ও জীবিকার ক্ষতি হয়। নভেম্বর মাসটি উপকূলবাসীর কাছে দুর্যোগের মাস হিসেবে পরিচিত, কারণ এই মাসে প্রায়শই বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এই দুর্বল বাঁধগুলো প্রায়শই ভাঙনের শিকার হয়, যা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে । একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্বান্ত হয়েছে উপকূলবাসী। একটি আঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকৃতির আরেকটি আঘাত। এভাবেই সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব খুলনার উপকূলীয় কয়রা এলাকার লাখ লাখ মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দুর্ভোগের যেন শেষ নেই এসব মানুষের। আইলা থেকে আম্ফান সব দুর্যোগেই ভেঙেছে উপকূল রক্ষার বেড়িবাঁধ। ভেসে গেছে মাছের ঘের, ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। নিরুপায় হয়ে বসতভিটা ছাড়ছেন অনেক উপকূলের বাসিন্দা।

একসময় বাংলার মায়েরা তাদের শিশুদের বর্গির হাঙ্গামার ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াতেন। ছড়া-কবিতায় তার প্রমাণ মেলে। চট্টগ্রাম বন্দর যখন পর্তুগিজদের দখলে, তখন উপকূলের অভিশাপ ছিল ঘূর্ণিঝড়। প্রায়ই মে/অক্টোবর/নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্কের ভয় দেখিয়ে পর্তুগিজ মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য বলত, ‘বেবি স্লিপ এনাদার নভেম্বর ইজ কামিং’। শুধু পর্তুগিজ মায়েরাই নয়, নভেম্বর মাস এলেই খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলীয় এলাকার মানুষকে সিডর, বুলবুল, গ্রেট ভোলা সাইক্লোনসহ ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ংকর স্মৃতি এখনো তাড়িত করে। উপকূল এলাকায় বড় বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে নভেম্বরে। এ বছর তেমন বড় কোনো ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা না থাকলেও সহকারি আবহাওয়াবিদ মো. মিজানুর রহমান জানান, নভেম্বরের শেষের দিকে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি একটি নিম্মচাপের সম্ভাবনা রয়েছে, এটি লঘুচাপ সৃষ্টি হলে ঘূর্ণিঝড়ের রুপ নিতে পারে বলে ধারণ করেছে।

জানা গেছে, ১৯৭০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর শুধু নভেম্বর মাসেই মোট ১১টি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, বন্য ও গৃহপালিত পশুর মৃত্যু ও সম্পদহানী ঘটে।

এর মধ্যে ‘বুলবুল’ নামক ঘূর্ণিঝড়ের তথ্যেও বেশ আতঙ্কিত ছিল উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন। তাই উপকূলবাসীর মধ্যে নভেম্বর আলাদা একটি আতঙ্কের মাস।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) দুর্যোগ কোষ থেকে বিগত বছরগুলোর মধ্যে শুধু নভেম্বর মাসের সংগঠিত ঘূর্ণিঝড় গুলো হচ্ছে:

সাল ১৯৭০, ঘূর্ণিঝড় হারিকেন (১১-১৩ নভেম্বর),

সারাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সর্বাপেক্ষা বেশি প্রাণহানি ও সম্পদ বিনষ্টকারী ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড় সংগঠিত হয়। হারিকেনের তীব্রতা নিয়ে প্রচণ্ড বাতাস দুদিন ধরে বার বার আঘাত হানে চট্টগ্রামে এবং সেই সঙ্গে বরগুনার বেতাগীসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলা-জেলা শহরেও ব্যাপক তাণ্ডব চলে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক প্রাণহানি, সম্পদ ও ফসলের ধ্বংস সাধন হয়।
সারাদেশের সরকারি হিসেব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে দেশের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিলো। ৩৫ হাজার হাজার সমুদ্রনির্ভর মৎস্যজীবী ও ৭২ হাজার অভ্যন্তরীণ মৎস্যজীবী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও জানা যায়, উপকূলসহ সারাদেশে এর মধ্যে ৪০ হাজারের ও বেশি অভ্যন্তরীণ মৎস্যজীবী ঘূর্ণিঝড় চলাকালে সমুদ্র ও বড় নদীতে মাছ ধরার সময় মৃত্যুবরণ করে। মোট ২০ সহস্রাধিক মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস হয়। সম্পদ ও ফসলের ক্ষতির পরিমাণও ছিল বেশ। লাখ লাখ গবাদিপশু মারা যায়। চার লাখ ঘরবাড়ি এবং তিন হাজারের ও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্রে ভরা জোয়ারের সময় ঘূর্ণিঝড়টি সংগঠিত হওয়ায় প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছিল।

সাল ১৯৭১,ঘূর্ণিঝড় (৫-৬ নভেম্বর),
চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী অঞ্চলে তীব্র ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে (ক্ষয় ক্ষতির বিবরণ পাওয়া যায়নি)। বেতাগীর চরখালি ও মাছুয়াখালীতে ব্যাপক গবাদি পশু মারা যায়। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সাল ১৯৭১, ঘূর্ণিঝড়(২৮-৩০ নভেম্বর),
বরগুনা জেলাসহ সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘণ্টায় ৯৫-১১৩ কিলোমিটার বায়ু প্রবাহ ও ১-২ মি. কম উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসহ ঘূর্ণিঝড় সংগঠিত হয়। এছাড়াও সমগ্র খুলনা অঞ্চলে ঝড়ো আবহাওয়া বিরাজ করে এবং খুলনা শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।

সাল ১৯৭৪, ঘূর্ণিঝড়(২৪-২৮ নভেম্বর),
বরগুনা জেলার পার্শ্ববর্তী সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা, এবং কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল এবং সমুদ্র তীরবর্তী দ্বীপ সমূহে ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটার বেগে বায়ু প্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় ও ৩-৫.২ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। প্রায় ২ শতাধিক মানুষ ও প্রায় ১ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয় এবং ২ হাজারের ও বেশি ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়।

সাল ১৯৮৩,ঘূর্ণিঝড় (৫-৬ নভেম্বর),
প্রতি ঘণ্টায় ১৩৬ কি.মি. বেগে বায়ু প্রবাহ ও ২মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় বেতাগী, বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার উপকূল ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। অর্ধশত নৌকা ও তিন শতাধিক মৎস্যজীবী নিখোঁজ হয় একইসঙ্গে। ধ্বংস হয় দুই হাজার বসতবাড়ি।

সাল ১৯৮৬ ঘূর্ণিঝড়(৮-৯ নভেম্বর),
উপকূলীয় অঞ্চল বরগুনা, বেতাগী বরিশাল, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর চরাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পরে। ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল প্রতি ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১১০ কিলোমিটার, খুলনায় ৯০ কিলোমিটার, বরিশালে ৮০ কিলোমিটার। এতে ১৪ ব্যক্তি নিহত হয় এবং ৯৭ হাজার ২০০ হেক্টর ফসলি জমি বিনষ্ট হয়।

সাল ১৯৮৮, ঘূর্ণিঝড় (২৪-৩০ নভেম্বর),
বরিশাল, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনাসহ উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার বেগে বায়ু প্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। মংলায় চার থেকে পাঁচ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়। এতে ৫ হাজার ৭০৮ ব্যক্তি নিহত হয় এবং ৬৫ হাজার গবাদি পশু মারা যায়। বহু সংখ্যক বন্য পশু মারা যায়। তার মধ্যে ছিল হরিণ ১৫ হাজার ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার ৯টি এবং ফসল বিনষ্ট হয় প্রায় শত কোটি টাকার।

সাল ১৯৯৫ ঘূর্ণিঝড়(২১-২৫ নভেম্বর),
উপকূলবর্তী দ্বীপ সমূহে এবং কক্সবাজারের চরাঞ্চলে ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার বেগে বায়ু প্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রায় ৬৫০ জনের মৃত্যু ও ১৭ হাজার গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে। একইসঙ্গে বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রে যাওয়া জেলে নিখোঁজসহ।

সাল ২০০৭ সিডর (১৫ নভেম্বর): প্রলয়ঙ্করী সুপার সাইক্লোন,
ঠিক ১৮ বছর পূর্বে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় সুপার সাইক্লোন সিডর আঘাত হানে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার। উপকূলীয় জনপদ খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি জেলা। লাখো মানুষ হারিয়েছিল ঘরবাড়ি, জীবিকা, প্রিয়জন। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আজও ভুলতে পারেনি সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা। সিডরের ধ্বংসযজ্ঞের পর কেটে গেছে দেড় যুগের বেশি সময়, কিন্তু খুলনার উপকূলীয় জনপদ এখনো ভয় আর অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢেকে আছে, বিশেষ করে বেড়িবাঁধের ভাঙন আতঙ্কে।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী সাইক্লোন সিডরের কারণে সারাদেশে ৩ হাজার ৪০৬ জন লোক মারা যায়, নিখোঁজ হয় ১ হাজার ৩ জন, মারাত্মক আহত হয় ৫৫ হাজার মানুষ। তা বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি ছিল।

বাংলাদেশে সিডরের আগে যে ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়গুলো আঘাত করেছিল, সেগুলোর কোনো নাম ছিল না। এর আগের বড় ঘূর্ণিঝড়গুলোকে ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হতো। এ অঞ্চলে যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে, তার নাম দেওয়া হয় ২০০৪ সালে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা শ্রীলঙ্কার দেওয়া নাম অনুসারে সিডরের নামটি ঠিক করে, যার অর্থ চোখ।
সাল ২০১৯, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল(৯ নভেম্বর) আলোচিত ঘূর্ণিঝড় বুলবুল,

অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগর দ্বীপ উপকূলে আঘাত হানার পর স্থলভাগ দিয়ে বাংলাদেশে আসায় ক্ষয়ক্ষতি আশঙ্কার চেয়ে কম হয়। ঝড়ে মারা যায় ২৪ জন। ৭২ হাজার ২১২ টন ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার আর্থিক মূল্য ২৬৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবনেরও। ২০০০ সাল থেকে ঝড়ের নামকরণের জন্য নিয়ম বানানো হয়।

সাল ২০২৩, ঘূর্ণিঝড় মিধিলি(১৭ নভেম্বর,)
আতঙ্ক বাড়ছে,
এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়রা সদর ইউনিয়নের কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী প্রায় এক কিলোমিটার, মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ী ও হোগলা এলাকার প্রায় দুই কিলোমিটার, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাটকাটা থেকে শাকবাড়িয়া গ্রাম পর্যন্ত এক কিলোমিটার, কাটমারচর এলাকায় এক কিলোমিটার, পাথরখালী এলাকায় ৬০০ মিটার, দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের আংটিহারা এলাকার ৭০০ মিটার এবং মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শেখেরকোনা, নয়ানি, তেঁতুলতলার চর ও চৌকুনি এলাকায় ৩ কিলোমিটারের মতো বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীতে পানি বাড়লে ওই সব এলাকার বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ ভেঙে ও পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী কাটকাটা ও কাটমারচর এলাকায় বাঁধ ধসে সরু হয়ে গেছে। চর ভেঙে একেবারে বাঁধের পাশ দিয়ে স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। তেঁতুলতলার চর, চৌকুনি, মহেশ্বরীপুরসহ কয়েক জায়গায় নিচু বাঁধের ওপর মাটি দিয়ে জোয়ারের পানি ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

তেঁতুলতলার চর গ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ এলাকার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এর আগে কয়েকবার নভেম্বর মাসের শেষ দিকে বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। তাই নভেম্বর মাস এলে বাঁধ ভাঙনের ভয় হয়।
আসলে নদীর তলা যত উঁচু হচ্ছে, জোয়ারের পানিরই উচ্চতাও তত বাড়তিছে। বাধ্য হয়ে নিচু বেড়িবাঁধের এক পাশে মাটির দেয়াল দিয়ে জোয়ারের পানি ঠেকানোর চেষ্টা করিছি। দ্রুত নিচু বাঁধগুলো উঁচু না করলি যেকোনো সময় এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।’

শেষ মুহূর্তে মেরামতের উদ্যোগ,
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বর্ষার আগমুহূর্তে যখন নদীতে জোয়ারের পানি বেড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়, কর্তৃপক্ষ সে সময় মেরামতের উদ্যোগ নেয়। এতে একদিকে খরচ বাড়ে, অন্যদিকে দ্রুতগতিতে কাজ করতে গিয়ে হয় নিম্নমানের। প্রায় সময় বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়।

কয়রার দশহালিয়া গ্রামের বাসিন্দা স্বপন কুমার বলেন, ‘সময়ের কাজ সময়মতো করলি আমাগে এত ভুগতি হয় না। গাঙের পানি যখন চরের নিচে থাকে, তখন কারও দেখা পাওয়া যায় না। যখন গাঙের পানি বাঁধের কানায় আইসে ঠেকবে, তখন অমনি পাউবোর ঠিকাদারেরা বাঁধে মাটি দিতি আসপে। শুনতিছি এবারও নাকি গাঙের পানি আরও বাড়বি।’
বাঁধের কাজে ধীরগতি,

পাউবো সূত্রে জানা যায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় কয়রার উত্তর বেদকাশী ও দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী প্রায় ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। ১১৭২ কোটি ৩১ লাখ ২০ হাজার দিকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেড়িবাধের কিছু স্থানে মাটির কাজ করে ফেলে রাখা হয়েছে। কিছু জায়াগায় এখনো মাটি পড়েনি। আবার কিছু স্থানে বালুর বস্তা মেলার অপেক্ষায় আছে। কয়েকটি স্থানে সিসি ব্লক বানানোর কাজ চলছে।
প্রকল্প এলাকার গাতিরখেতি গ্রামের বাসিন্দা দেব রঞ্জন সরকার বলেন, ‘দুই বছর বাইরে দেখতিছি গাতের কূলে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। বেড়ির (বাঁধ) ওপর এক ছাদ মাটিও ফেলা হয়নি। দুর্যোগের সময় নভেম্বর মাস তো আইসে গেছে, এখন ভয়ে আছি।’

‘স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চলছে,
করয়ার এ মূল মূল সমস্যা সমস্যা নদীভারন নদীস্তায়ন উল্লেখ করে পাউবোর খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘যেকোনো দুর্যোগে নদীতে জোয়ারের চাপ বাড়লে কোথাও না কোথাও ভঙন ধরে। আমরা স্থায়ী সমলানের চেষ্টা করছি। কয়রার কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আমাদের সংস্থারকাজ চলমান। আরও কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজের টেন্ডার হয়ে যাবে। আশা করছি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত না হানলে কোনো সমস্যা হবে না। চলমান প্রকল্পের কাজে ধীরগতি সম্পর্কে আশরাফুল আলম বলেন, ‘প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।

কাজের শুরুতেই যদি টার্গেট অনুযায়ী টাকাটা আসে, তাহলে কাজটাও দ্রুত বাস্তবায়ন করে নেওয়া সম্ভব হয়। এ ছাড়া দুর্গম জায়গায় মালামাল নেওয়াসহ নানা অসুবিধার জন্য কাজ বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। তবে আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ