July 25, 2026, 4:07 pm
শিরনাম :
মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার শ্যামনগরে বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কালীগঞ্জে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

সুন্দরবনের নদ- নদী থেকে অবাধে শামুক লুট, মারাত্মক হুমকির মুখে নদীর জীববৈচিত্র্য

শাহজাহান সিরাজ কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বন সুন্দরবন এখন নতুন ও নীরব এক বিপদের মুখোমুখি। একটি অসাধু চক্র সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত নদী, খাল ও জলাশয় থেকে অবাধে শামুক আহরণ করে পাচার করছে। যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের নতুন হুমকি।

সুন্দরবনের নদী-খাল থেকে প্রতিদিন প্রকাশ্যে ট্রলার ও নৌকায় ভরে নির্বিচারে শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে এসব শামুক ট্রাকে সড়কপথে কিংবা ট্রলারে নদীপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার হচ্ছে । প্রতিদিন কয়েক শ মণ শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও এসব শামুক অসাধু একটি চক্র নদীপথে অবৈধভাবে ভারতে পাচার করছে বলে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টাকার লোভ দেখিয়ে এই কাজে জড়ানো হচ্ছে প্রান্তিক জেলেদের। যাদের অধিকাংশই নারী। এভাবে কয়েক শ মণ শামুক একদিনেই সংগ্রহ করা হচ্ছে সুন্দরবন থেকে। আর সে শামুক সড়কপথে ও নদীপথে পাচার করা হচ্ছে। স্থানীয় জেলেরা অসাধু ওই চক্রের কাছে সেগুলো বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।

এই শামুকগুলো মূলত চিংড়ি ও কাঁকড়ার খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছের খাবার হিসেবেও এর চাহিদা বাড়ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চড়া দামে এসব শামুক অবৈধ পথে ভারতে পাচার করছে, যেখানে চিংড়ি চাষের জন্য এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে । আবার খোলগুলো চুন তৈরির কারখানায় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বস্তায় বিক্রি হয়। চুন কারখানার মালিকরা পাইকারদের কাছে অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখে শামুক-ঝিনুক কেনার জন্য। মনিরামপুর উপজেলার গোপালপুরে দুটি এবং চেচুড়িয়ায় একটি চুন কারখানা রয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও জলজ সম্পদ সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ অনুসারে, নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে শামুক বা ঝিনুক আহরণ ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এ কাজ দণ্ডনীয় অপরাধ।

উপকূলের অধিকাংশ মানুষই জানে না শামুক ঝিনুক পরিবেশের জন্য খুবই উপকারী একটি প্রাণী। সুন্দরবনে ২৬০ প্রজাতির প্রাণী আছে তার মধ্যে শামুক ঝিনুক অন্যতম। প্রতিনিয়ত অবৈধ ভাবে আহরণের কারণে অনেক প্রাণী সুন্দরবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। শামুক ঝিনুক সুন্দরবনের নদীর তলদেশের মাটির ভারসাম্য রক্ষায় সহযোগিতা করে। এগুলো নদীর প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, দূষণ কমায়, মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং মাছ ও কাঁকড়ার খাদ্যচক্র ধরে রাখে। ব্যাপক নিধন হলে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।

সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বন বিভাগের মাইকিং ও অভিযানের পরও শামুক আহরণ বন্ধ হচ্ছে না। বনাঞ্চল ঘেঁষে থাকা পশুরতলা খাল, কৈখালীর মাদার নদী, জয়াখালী খাল, শাকবাড়িয়া নদী, কয়রা নদী ও কপোতাক্ষ নদ থেকে প্রতিদিনই অবৈধভাবে শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি কয়রার কাটকাটা এলাকায় সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদীর পাড়ে গিয়ে দুই শামুক আহরণকারীর সঙ্গে দেখা হয়। তাদের একজন বলেন, তাঁরা সরকারি গুচ্ছগ্রামে থাকেন। কাজকর্ম নেই। এক মাস ধরে নদী থেকে শামুক তুলে বিক্রি করছেন। এ আয় দিয়েই সংসার চলে। শামুক আহরণ যে আইনতভাবে নিষিদ্ধ, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই।

আরেকজন বলেন, নদী থেকে তোলা শামুক কিনে নেন বাইরের কিছু লোক। বিভিন্ন স্থান থেকে শামুক সংগ্রহ করে তাঁরা কয়রার আমাদী ব্রিজের পাশে স্তূপ করে রাখেন। পরে সেখান থেকে ট্রাকে করে শামুক অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।

তাঁদের কথার সূত্র ধরে কয়রার আমাদী ব্রিজ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বস্তাভর্তি শামুকের স্তূপ। চারপাশে পচা দুর্গন্ধে টেকা দায়। পাশের কপোতাক্ষ নদে তখনো নারী-পুরুষ ব্যস্ত শামুক তুলতে। রেশমা বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘গাঙে শামুক কুড়িয়ে দিনে এক শ কেজির মতো পাই। প্রতি কেজি পাঁচ টাকায় বিক্রি করি।’

কয়রার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী গোবরা গ্রামের শামিম হোসেন বলেন, জেগে ওঠা বালুচর থেকে দিন-রাত শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। ট্রলারে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু ও শামুক একসঙ্গে ওঠানো হয়। পরে পানির স্রোতে বালু ধুয়ে ফেলে শুধু শামুক রাখা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দিলে আহরণকারীরা হুমকি দেন।

কয়রা কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক আ,ব,ম আব্দুল মালেক বলেন, শামুক-ঝিনুক পানি পরিশুদ্ধ করে। মাছ ও কাঁকড়াসহ নানা জলজ প্রাণীর খাবার হিসেবে কাজ করে। নির্বিচার নিধন চললে খাদ্যচক্র ভেঙে নদী ও খাল উজাড় হয়ে যাবে। তাই দ্রুত এটা বন্ধ করা প্রয়োজন।

মোঃ সাইফুল ইসলাম উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব বলেন, ‘শুধু অভিযান চালিয়ে নৌকা জব্দ করলেই হবে না। এ চক্রের মূলব হোতারা কোথা থেকে পরিচালনা করছে তা খুঁজে বের করতে হবে। সুন্দরবন ও উপকূল রক্ষা করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে।

খান সাহেব কোমরউদ্দীন ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক হাফিজুল হক বলেন, ‘শামুক তলদেশের জৈব পদার্থ খেয়ে পানিকে পরিশুদ্ধ রাখে। একইসঙ্গে মাছ, কাঁকড়া ও অনেক জলজ প্রাণীর জন্য এটি প্রধান খাদ্য। কিন্তু নির্বিচারে শামুক নিধন করলে খাদ্যচক্র ভেঙে যাবে, ফলে নদী-খাল উজাড় হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নদীর পানিতে বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহার করে মাছ ধরার প্রবণতা যেভাবে বাড়ছে – তাতে ছোট মাছ, চিংড়ির রেণু, কাঁকড়া এবং শামুক একসঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে। এটি শুধু জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ুতেও প্রভাব ফেলবে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়বে, জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হলে কার্বন শোষণের ক্ষমতাও কমে যাবে। তাই এখনই শামুক নিধনের কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সুন্দরবন ও উর এলাকার পরিবেশ ভয়াবহ সংকটে পড়বে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘শামুক হচ্ছে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এটি নদী-খালের তলদেশে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ শোষণ করে পানির গুণগত মান ঠিক রাখে। কিন্তু নির্বিচারে শামুক নিধন করলে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্যই নষ্ট হবে না, বরং জলজ প্রাণীদের খাদ্যচক্রেও বিরূপ প্রভাব পড়বে।’

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, এই চক্রটি শুধু শামুকই নয়, চিংড়ি আহরণের সময় বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করছে। মাছের ঝাঁক সহজে ধরতে নদী-খালের পানিতে মেশানো হচ্ছে কীটনাশক জাতীয় রাসায়নিক। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যে ছোট মাছ, চিংড়ির রেণু, কাঁকড়া, কই, টেংরা থেকে শুরু করে অন্যান্য জলজপ্রাণী অচেতন হয়ে ভেসে উঠে। জেলেরা তখন জাল দিয়ে সহজেই সেগুলো ধরে ফেলেন। কিন্তু এর ফলে নদীর বাস্তুন ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বন বিভাগের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, বন বিভাগের স্মার্ট টহল টিমসহ কয়েকটি দল নিয়মিত টহল দিচ্ছে, অবৈধ মালামাল জব্দ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ শামুক উদ্ধার করে নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে। তবে শুধু বনাঞ্চলের ভেতর নয়, পাশের লোকালয়েও পাচারকারীরা সক্রিয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবস্থা না নিলে অবৈধ কার্যক্রম ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ