
ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এক জীবন্ত কিংবদন্তির পাশে আমরা। ইনি বাসন্তী, যার একটা ছবি ১৯৭৪ সালে শুধু বাংলাদেশ নয়, কাঁপিয়ে দিয়েছিল সারা পৃথিবীর বিবেককে।
১৯৭৪ সাল। সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রলয়ংকরী বন্যায় ফসল ভেসে গেছে, খাদ্য সংকট চরমে। শোনা যায়,একমুঠো খাবারের জন্য মানুষ তার পরনের কাপড়, ঘরের থালা-বাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিচ্ছিল। চিলমারীর মতো চির অভাবী ও নদীতীরবর্তী এলাকায় এই সংকট ছিল আরও ভয়াবহ।
ঐ দুর্ভিক্ষের সময়ে, চিলমারীতে তোলা হয় বাসন্তীর একটা ছবি। সে ছবিতে, তৎকালীন ১৮-২০ বছর বয়সী তরুণী বাসন্তীর পরনে লজ্জা নিবারণের জন্য রয়েছে শুধু একটা মাছ ধরার জাল। ছবিটা প্রকাশের পর সে সময়ের রাজনীতিতে এক প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং ছবিটাকে ‘সাজানো’ বলে নানা বির্তকের জন্ম হয়।
কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? বাসন্তী জন্ম থেকে কিছুটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। তার পক্ষে কি আদৌ সম্ভব টাকার বিনিময়ে এমন ‘মডেল’ হওয়া বা অভিনয় করা? গ্রামের একজন সহজ-সরল তরুণী, যিনি হয়তো পরিস্থিতি বুঝতেই অক্ষম, কেন তিনি টাকার জন্য এমন ছবি তুলতে দেবেন? ছবিটা ছিল সেই সময়ের ভয়াবহ দারিদ্র্য এবং অসহায়ত্বের এক নির্ভেজাল এবং নির্মম প্রতিচ্ছবি।
আজ প্রায় ৫০ বছর পর, প্রায় ৭০ বছর বয়সী এই বাসন্তির সঙ্গে দেখা হয় তাঁর বাড়ির পাশে চিলমারীর সেই তিস্তার পাড়ে। সময়ের স্রোতে তার মুখে পড়েছে বয়সের ছাপ, কিন্তু সেই ৭৪-এর যন্ত্রণা আর বঞ্চনা’র ইতিহাস হয়তো আজও তার অবচেতন মনে রয়ে গেছে।
এই ছবিটা ইতিহাসের এক নীরব ঘটনার পাশে দাঁড়ানোর মুহূর্ত। যে অসহা’য় মুখ একদিন রাজনৈতিক ঢাল বানানো হয়েছিল, সেই বাসন্তীর বেঁচে থাকা যেন এক নীরব বিজয়। তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
২য় ছবিতে সবার ডানে আছেন মনোয়ারুল হক; তিনি আমাদের বাসন্তির সন্ধান দেন এবং বাসন্তি গ্রামে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান।