July 25, 2026, 4:54 pm
শিরনাম :
মাদার নদীর বাঁশের স্যাকোটি ব্রীজ করার দাবীতে এলাকাবাসী মানববন্ধন কবিরহাটে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার

পাটুয়ারটেক সী বিচ: নির্জনতার এক অনন্য সঙ্গী

আব্দুল্লাহ আল মারুফ, স্টাফ রিপোর্টার

সী বিচ’ শব্দটা শুনলেই আমাদের মধ্যে কাজ করে প্রকৃতির মোহময় সৌন্দর্য। আমরা হারিয়ে যাই সমুদ্রের আঁচড়ে পড়া ঢেউয়ে, বাতাস ও পানির এক নৈসর্গিক মিলনমেলায়।

এছাড়া সমুদ্র সৈকত বলতে সচরাচর আমাদের দৃশ্যপটে হাজির হয় পর্যটকদের কোলাহল, রঙিন ছাতার তলে বসে সমুদ্রের সাথে মিতালি গড়া,ঘোড়সওয়ারের দল,ক্যামেরাম্যান সহ নানান কিসিমে’র হকারদের আনাগোনা। এই চিরচেনা দৃশ্যপটের বাইরে ভিন্ন কিছু কল্পনা করুন একবার। যে সমুদ্র সৈকতে থাকবে একেবারে নিরিবিলি পরিবেশ। একান্তে আল্লাহর সৃষ্টির মহিমা উপভোগ করতে পারবেন।

এমনই একটি সী বিচের গল্প এবার আপনাদের সাথে শেয়ার করবো আমরা। সত্যি বলতে কি! নিজ চোখে দেখলে আরও বেশি বিশ্বাস করবেন আপনারা সেই সী বিচের নৈসর্গিক দৃশ্য। নির্জনতার মায়ায় বেড়ে ওঠা সী বিচটি হলো পাটুয়ারটেক সী বিচ। যা কক্সবাজার কলাতলী মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দূরত্ব বিবেচনায় কিংবা অজানায় ভ্রমণ পিপাসুদের নিকট পাটুয়ারটেক সী বিচ অপরিচিত নাম। পাটুয়ারটেক সী বিচ ইনানী বিচের কাছেই। ইনানী বিচ থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে।

পর্যটকের ভিড় নেই, নেই কোনো হোটেল বা ঝাঁ-চকচকে দোকান। একেবারে নির্জনতার মায়ায় ভরপুর। প্রথমেই পর্যটকদের স্বাগত জানাবে বীচের নুড়ি পাথর গুলো। এগুলোর উপর দিয়ে হাটঁতে হাটঁতে হঠাৎ টের পাবেন সমুদ্রের ঢেউ পাথরের গায়ে আচঁড়ে পড়ার অদ্ভুত শব্দে। এভাবে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন প্রকৃতির মায়ায়। একসময় মনে হবে এসব দৃশ্য স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে ক্যামেরাবন্দি করা দরকার! সাথে থাকা মানুষজনদের বলবেন বিরল দৃশ্যগুলো মূহুর্তের মধ্যে ক্লিক করতে।
আমরা দুপুরের খাবার শেষ করছি কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টের কাছাকাছি বুক করা হোটেলে। সামুদ্রিক মাছ, আরও অজানা একটা ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে রওনা হলাম পাটুয়ারটেক সী বিচের উদ্দেশ্যে। এই সফরে ছাদ খোলা চান্দের গাড়ি আমাদের সফরে ভিন্নতা তৈরি করেছে। ৫টি চান্দের গাড়ি নিয়ে আমাদের টিমের গন্তব্য শুরু হলো। সিরিয়ালে সবার আগে আমাদের গাড়িই ছিল। মাথার উপরের ছাউনি তুলে আমরা উপভোগ করতে থাকলাম পাহাড় সমুদ্রের এক অসজ্ঞায়িত সমীকরণ।মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরেই আমরা যেতে থাকলাম। হঠাৎ করে আমাদের আনন্দের মধ্যে প্রকৃতি তার নিজস্ব ছন্দে ছন্দপতন ঘটালো। আকাশের হালকা গর্জনের সাথে নামলো ঝুম বৃষ্টি। ছাদ খোলা থাকায় বৃষ্টির ফোঁটা একেবারে গায়ে এসে পড়ছে। তাই বাধ্য হয়ে ছাউনি টানিয়ে দিতে হলো। একটু পরে আবার বৃষ্টি উধাও। আবার ছাউনি তুলে দিয়ে কিছুদূর যেতেই বৃষ্টি হাজির। এভাবে বৃষ্টির সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে একসময় আমরা পৌঁছালাম পাটুয়ারটেক সী বিচে।

সূর্যের আলোয় তখন খুব একটা তেজ নেই বললেই চলে। সূর্যের লাল আভায় সেদিনের বিকেলটাকে রাঙিয়ে তুলছে। নুড়ি পাথরের মাঝে হাটঁতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছে এ যেন সেন্টমার্টিনের আরেকটা প্রতিচ্ছবি! সবাই আপনমনে সমুদ্রের কলকল ধ্বনি উপভোগ করে শহরের যান্ত্রিকতার কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করছে ক্ষণিকের জন্যে। কেউ কেউ স্মৃতির পাতায় সমুদ্র ভ্রমণকে ধরে রাখতে কুড়িয়ে নিচ্ছে নুড়ি পাথর,শামুক-ঝিনুকের মরা খোলস। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় অনেকটা শংকায় ছিলাম এই বুঝি বৃষ্টি নামলে! বীচের পাড়ে স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরার নৌকা গুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে। সাম্পান নৌকা গুলো দেখে বেশ ভালোই লাগলো। গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে যেয়ে কত জেলে না ফেরার দেশে চলে গেছে সেটাও মূহুর্তে মনে পড়লো। আমরা কয়েকজন আলাপ করছি পাটুয়ারটেক সী বিচের অপার সম্ভাবনা নিয়ে। পরিকল্পনা মাফিক এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে পর্যটকদের নিকট আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষজনের রুটিরুজির বন্দোবস্ত হবে এখানে। আশপাশের পরিবেশ দেখে অনুমেয় যে অত্র এলাকা এখনো অজপাড়াগাঁ।

সূর্যাস্তের একেবারে কাছাকাছি সময়ে বা সূর্যাস্ত হয়ে যাবার পরে আমরা ফেরার জন্য পথ ধরলাম। আবার চান্দের গাড়িতে উঠে বসলাম। মন পড়ে রইলো পাটুয়ারটেক সী বিচে। মন চাচ্ছিল আরও কিছুক্ষণ থাকি। প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে গল্প করি, সে সুযোগ আর কই। অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। আসার পথে ঝিঁঝি পোকার ডাক, সমুদ্রের কলকল ধ্বনি,শেয়াল-কুকুরের ডাক ইত্যাদি শব্দ আমাদের বিমোহিত করে তুলে। পরবর্তীতে পাটুয়ারটেক সী বিচের সেই বিকেলের কথা মনে পড়লে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঢেউয়ের আঁচড়, নুড়ি পাথরের মায়াবী মিতালি।

ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য পাটুয়ারটেক সী বিচ নিয়ে কিছু আনুষাঙ্গিক তথ্য শেয়ার করছি।

ইতিহাস ও পরিচিতি:
ঠিক কতসালে এই বীচ প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলা কঠিন। এর অন্যতম কারণ পরিকল্পিত কোন সী বিচ না,প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠেছে এটি। তবে ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্যমতে ২০১৯ সালের পরে এই সমুদ্র সৈকতটিতে স্থানীয় পর্যটকদের যাতায়াত শুরু হয়েছে। এছাড়া সাধারণত খুব কম মানুষজনই পাটুয়ারটেকের কথা জানে। সর্বোচ্চ ইনানী বিচ পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে আসে সবাই। ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মূলত নির্জনতা, প্রবাল পাথরের উপস্থিতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই পর্যটকদের নিকট আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে পাটুয়ারটেক সী বিচ। ভৌগোলিকভাবে এটি কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার আওতাধীন।

যাতায়াত:
কক্সবাজার থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বীচ।শহরের ডলফিন মোড় থেকে সিএনজি, অটোরিকশা, চান্দের গাড়ি, জিপ,মোটরসাইকেলে করে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে পাটুয়ারটেক পৌঁছানো যায়। সিএনজি ভাড়া প্রায় ১০০০-১৫০০ টাকা, অটোরিকশা ১০০০-১২০০ টাকা, এবং ছাদখোলা জিপ ১৮০০-২৫০০ টাকা হতে পারে,আর মোটরসাইকেল আলোচনা করে দাম নির্ধারণ করবেন বা নিজস্ব বাইক নিয়ে যাওয়া উত্তম। মোটামুটি এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে পৌঁছানো যাবে পাটুয়ারটেক সী বিচে।

থাকার ব্যবস্থা: এখনো ভালো মানের হোটেল-মোটেল তৈরি হয়নি এখানে। এছাড়া রাত্রি যাপন করার ব্যবস্থাও সীমিত। তবে পার্শ্ববর্তী ইনানী বিচে পাশে বেশকিছু রিসোর্ট ও হোটেল তৈরি হয়েছে। ইনানী রয়্যাল রিসোর্ট, রয়্যাল টিউলিপ রিসোর্ট, লা বেল্যা রিসোর্ট, ডেরা রিসোর্ট ইত্যাদি পরিচিত। পরামর্শ থাকবে কক্সবাজার শহরেই থাকার। সুবিধা এবং নিরাপদ হবে শহরের হোটেলে থাকা।

খাবার-দাবার:
বীচের পাশেই স্থানীয় ভাবে কয়েকটি রেস্টুরেন্ট এবং ঝুপড়ি দোকান গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে সী মাউন্ট বীচ ক্যাফে,কোরাল স্টেশন অন্যতম। বীচের বিপরীতে এগুলোর অবস্থান। এসব রেস্টুরেন্টে সী-ফুড, বারবিকিউ, গ্রিলড ক্যালামারি, লইট্টা দোপেয়াজাসহ ইত্যাদি সুস্বাদু বাংলা খাবার পরিবেশন করা হয়। তবে এগুলোতে দাম কিছুটা বেশিই থাকে।

পরামর্শ:
১. প্রবাল পাথরের উপর দিয়ে হাটঁতে সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, পাথরের আঘাতে পা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
২. সময় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একেবারে ফজরের পরে থেকে সূর্যের প্রখরতার আগ পর্যন্ত, এবং বিকেলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করা উত্তম। সন্ধ্যা হয়ে গেলে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তার অভাবে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।
৩. সম্ভব হলে সাথে খাবার এবং পানীয় নিয়ে যাওয়া।
৪. সমুদ্রে গোসলের চিন্তা বাদ দেওয়া, এখানে লাইফ জ্যাকেট,স্পীড বোট নেই। যার কারনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে কিছু করার থাকবে না।
৫. বাজেটের জন্য আলাদা করে চিন্তার দরকার নেই, কক্সবাজার গেলে সময় বের করে টিম নিয়ে বের হবেন।

লেখক,শিক্ষার্থী: মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ