September 15, 2026, 2:54 pm
শিরনাম :
বাগেরহাটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবিতে যুবদের সাইকেল র‍্যালি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে- আইনমন্ত্রী ফকিরহাটে অজ্ঞাত পরিবহণের ধাক্কায় পিকআপ চালক নিহত ফকিরহাটে আমন ক্ষেতে পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে মাঠে মাঠে আলোক ফাঁদ ভারত সেবা সংঘে গনেশ পূজোর শুভ সূচনা করলেন- মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাকৃবি’র তৃতীয় শ্রেণী কর্মচারী পরিষদ এর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত লামায় দোকানে গাঁজা বিক্রির অভিযোগে সুনীল কান্তি দে’র ৬ মাসের কারাদণ্ড মহানন্দা নদীতে গোসল করতে নেমে স্রোতে হারিয়ে গেল ‌দুই ছাত্র সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে বদলে যাবে কালীগঞ্জের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের চিত্র-এমপি, ফজলূল হক মিলন তালায় সেবা প্রদানকারী দপ্তরের সাথে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

এক বছরেও শেষ হয়নি লক্ষ্মীখালী ব্রিজ, পড়ে আছে পাইপ-নির্মাণসামগ্রী

সৈয়দ জালিস মাহমুদ

এক বছরেও শেষ হয়নি লক্ষ্মীখালী ব্রিজ, পড়ে আছে পাইপ-নির্মাণসামগ্রী

বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলার সীমান্তবর্তী লক্ষ্মীখালী খালের ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজের কাজ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। পাইলিংয়ের কাজ শুরুর পর দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় এখনো জরাজীর্ণ কাঠের পোলই দুই উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। ঝুঁকিপূর্ণ এই পোল পার হতে গিয়ে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিশু, নারী, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা।

দীর্ঘদিনের দাবির পর স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজ শুরুর কিছুদিন পরই তা বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এক বছর ধরে নির্মাণকাজ থেমে থাকায় ব্রিজ নির্মাণস্থল এখন অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও পড়ে আছে নির্মাণকাজের মেশিন, কোথাও পাইপ, আবার কোথাও শ্রমিকদের থাকার ঘর। নির্মাণস্থলের পাশে পড়ে আছে বালুও। এভাবে বছরের পর বছর নির্মাণসামগ্রী ও সরঞ্জাম পড়ে থাকলেও ব্রিজ নির্মাণের কাজ আর এগোয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা অবস্থায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করেছে। এ নিয়ে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, বিল পরিশোধ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে বিল উত্তোলনের অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

এলাকাবাসী জানান, লক্ষ্মীখালী খালের ওপর থাকা পুরোনো কাঠের পোলটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ। কোথাও কাঠ ভেঙে গেছে, কোথাও পোলের অংশ দেবে গেছে। বর্ষায় সংযোগ সড়কও পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পোল পার হচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লক্ষ্মীখালী ব্রিজটি বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলার মানুষের সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য দুই উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এ পথের ওপর নির্ভরশীল। ব্রিজটি নির্মাণ না হওয়ায় বিকল্প পথে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে সময়ের পাশাপাশি বেড়ে যায় যানবাহন ভাড়াও।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীখালী খালের ওপর স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের শেষ দিকে নিশীথ বসুকে কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ব্রিজটি নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪ হাজার ২১ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের ১২ এপ্রিলের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল।

তবে স্থানীয়দের দাবি, পাইলিংয়ের কাজ শুরু করার পর গত বছরের ৩ নভেম্বরের পর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর দৃশ্যমান কোনো কাজ করেনি। একপর্যায়ে লোড টেস্টের পর কয়েকটি পাইল দেবে যাওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে নির্মাণস্থলে আর তেমন কোনো কাজ হয়নি। বর্তমানে সেখানে পাইল, মেশিন, পাইপ, বালু ও শ্রমিকদের থাকার ঘরসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নারায়ণ মজুমদার বলেন,ব্রিজটি অনেকদিন ধরে অবহেলিতভাবে পড়ে আছে। কিছুদিন কাজ হওয়ার পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। একদিন লোড টেস্ট দেওয়ার পর পাইলগুলো দেবে যায়। এরপর ঠিকাদারকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকবার মানববন্ধন করেছি, এলজিইডির প্রকৌশলীদের জানিয়েছি, বিভিন্ন জায়গায় অবহিত করেছি। কিন্তু কোনো সুফল পাইনি। আমরা চাই দ্রুত ব্রিজটির কাজ শেষ করা হোক।

স্থানীয় বাসিন্দা প্রণব মন্ডল বলেন,আমাদের গ্রামের ব্রিজটি ভাঙা কাঠ দিয়ে তৈরি। মাঝেমধ্যে ভেঙে যায়, আবার মেরামত করতে হয়। মোটরসাইকেল ও ভ্যান চলাচলের সময়ও প্রায়ই সমস্যা হয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সময় ভয় পায়। অনেক সময় হাত ধরে পার করে দিতে হয়। ব্রিজটি নির্মাণ হলে মানুষের অনেক উপকার হবে।

খান টুকু নামে আরেক বাসিন্দা বলেন,ব্রিজটি শেষ না হওয়ায় মানুষের অনেক সমস্যা হচ্ছে। কাঠের পোল দিয়ে চলাচল করা খুব কষ্টকর। শিশু ও বৃদ্ধদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যেকোনো সময় পোলের ফাঁকে পা ঢুকে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। স্রোতের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। আমরা দ্রুত ব্রিজটির কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।

পূর্ব সায়রা এলাকার বাসিন্দা মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, এখানে আগে একটি ঢালাই ব্রিজ ছিল। সেটি সরিয়ে নতুন ব্রিজ নির্মাণের জন্য কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু এখন আগের চেয়েও আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হয়েছে। কাঠের পোলের মাঝখান ভেঙে যাওয়ায় স্কুলে যাওয়ার সময় অনেক বাচ্চা পড়ে গেছে। একদিন একটি বাচ্চা পড়ে গেলে একজন মহিলা তাকে তুলে না ধরলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

তিনি আরও বলেন,এপাশে বাগেরহাট, ওপাশে রামপাল। রামপালের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এটিই আমাদের সরাসরি পথ। বাজার, ওষুধ কেনা, শিশুদের স্কুলে যাওয়া এবং কৃষিপণ্য বারাকপুরে নিয়ে বিক্রি—সবকিছুর জন্য এই পথ ব্যবহার করি। এখন কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও ভাড়া দুটোই বেশি লাগে।

নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার আল আমিন বলেন,বৃষ্টির কারণে আপাতত কাজ বন্ধ আছে। যোগাযোগের রাস্তা ভালো না হওয়ায় মালামাল নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। খুব দ্রুতই কাজটি সম্পন্ন করা হবে।

বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদ বলেন,লক্ষ্মীখালী ব্রিজ নির্মাণের জন্য নিশীথ বসুকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে কাজ এগিয়ে নেয়নি।

তিনি আরও বলেন,ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও চিঠি পাঠানো হয়েছে। কার্যাদেশ বাতিলের অনুমোদন পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর দ্রুত নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, লক্ষ্মীখালী ব্রিজটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়,এটি বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও দৈনন্দিন যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। নির্মাণস্থলে বছরের পর বছর মেশিন, পাইপ, বালু ও শ্রমিকদের থাকার ঘর পড়ে থাকার দৃশ্য প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতারই চিত্র তুলে ধরছে। তাই দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ব্রিজটির নির্মাণকাজ শেষ করে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ