September 15, 2026, 1:27 pm
শিরনাম :
বাগেরহাটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবিতে যুবদের সাইকেল র‍্যালি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে- আইনমন্ত্রী ফকিরহাটে অজ্ঞাত পরিবহণের ধাক্কায় পিকআপ চালক নিহত ফকিরহাটে আমন ক্ষেতে পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে মাঠে মাঠে আলোক ফাঁদ ভারত সেবা সংঘে গনেশ পূজোর শুভ সূচনা করলেন- মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাকৃবি’র তৃতীয় শ্রেণী কর্মচারী পরিষদ এর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত লামায় দোকানে গাঁজা বিক্রির অভিযোগে সুনীল কান্তি দে’র ৬ মাসের কারাদণ্ড মহানন্দা নদীতে গোসল করতে নেমে স্রোতে হারিয়ে গেল ‌দুই ছাত্র সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে বদলে যাবে কালীগঞ্জের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের চিত্র-এমপি, ফজলূল হক মিলন তালায় সেবা প্রদানকারী দপ্তরের সাথে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

সুন্দরবনের নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন পুরুষ, সংসারের হাল নারীর কাঁধে

ফারুক হোসেন রাজ, স্টাফ রিপোর্টার

সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জীবনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রতিবছরই তৈরি করে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট। বন বা সাগরে মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকলে কর্মহীন হয়ে পড়েন হাজারো বনজীবী ও জেলে। তখন পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা এবং ঋণের কিস্তি চালানোর দায়িত্ব এসে পড়ে নারীদের কাঁধে।

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ পূর্ব কালিনগর এলাকার সাবিনা খাতুন এমনই এক পরিবারের প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্বামী আব্দুস সালাম সুন্দরবননির্ভর জেলে। সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি বন্ধ থাকলে কর্মহীন হয়ে বাড়িতে থাকতে হয় তাঁকে। কিন্তু সংসারের খরচ কিংবা এনজিও ও মহাজনের ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না। সাবিনা খাতুন বলেন, বন বন্ধ থাকলে স্বামী কাজ পায় না। কিন্তু সংসারের খরচ আর ঋণের কিস্তি ঠিকই চালাতে লাগে। তাই বাধ্য হয়ে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পরের চিংড়ি ঘেরে ‘জোন’ দিতে হয়। আগে মিষ্টি পানিতে ধান হতো, এখন লোনা পানির কারণে আবাদি জমি শেষ। বিকল্প কাজ বলতে শুধু ঘেরের শারীরিক শ্রমই বাকি আছে।

সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জসহ সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, সুন্দরবনের প্রজনন, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন ধরনের আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকে। জুন, জুলাই ও আগস্ট – এই তিন মাস পর্যটনসহ সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকে। এছাড়া জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে থাকে ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা।

বনজীবীদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয় হলেও এ সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় উপকূলীয় পরিবারগুলোকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হয়। বিশেষ করে সুন্দরবননির্ভর পুরুষদের বড় একটি অংশের অন্য কোনো পেশায় দক্ষতা না থাকায় তারা কর্মহীন হয়ে পড়েন। মুন্সীগঞ্জ এলাকার বনজীবী নেপাল সানা বলেন, ছোটবেলা থেকে শুধু সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরি। অন্য কোনো কাজের দক্ষতা নেই। ঘেরে কাজের সুযোগও সীমিত, মজুরিও কম। পরিবারের পুরুষেরা খুলনা বা ঢাকায় রিকশা চালানো কিংবা ইটভাটায় কাজ করতে না গেলে অনেক সময় কাজ পায় না। তখন পরিবারের নারীদের দিনমজুরি দিতে যেতে হয়।

নিষেধাজ্ঞার সময় নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হলেও সেখানে রয়েছে মজুরি বৈষম্যের অভিযোগ। স্থানীয় নারী শ্রমিক শেফালী বিবি, রহিমা বুলি দাসীসহ কয়েকজন জানান, পুরুষ শ্রমিকেরা একই ধরনের কাজে যেখানে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পান, সেখানে নারীদের দেওয়া হয় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। কোথাও কোথাও এই মজুরি আরও কম। স্থানীয়দের অভিযোগ, কম মজুরির কারণে অনেক ঘের মালিকও পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিক নিতে বেশি আগ্রহী। সংসারের খাবার ও ঋণের কিস্তির তাগিদে নারীরাও বাধ্য হয়ে কম মজুরিতে কঠোর শারীরিক শ্রমে যুক্ত হচ্ছেন।

দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শেফালী বিবি বলেন, সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকলে উপকূলীয় এলাকার পুরুষদের বড় একটি অংশ বিকল্প কাজে যুক্ত হতে চান না। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে পরিবার ও নারীদের ওপর। তিনি বলেন, সন্তানদের পড়াশোনা, প্রাইভেটের খরচ ও সংসারের খাবারের ব্যবস্থা করতে নারীদের তখন চরম হিমশিম খেতে হয়। পুরুষেরা ইটভাটা, মাটি কাটা, ধান রোপণ কিংবা ভ্যান চালানোর মতো কাজে যেতে অনাগ্রহী। অনেকেই এসব কাজকে মান-সম্মানের পরিপন্থী মনে করেন। তার মতে, পুরুষদের বিকল্প জীবিকায় যুক্ত করার পাশাপাশি নারীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না করলে উপকূলীয় পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সংকট কাটবে না।

সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে বড় ব্যবধান। জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ হাজার। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন। শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৭ হাজার ৩৫৫ জন। সমুদ্রে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত ১২ হাজার ৮৭৯ জন জেলেকে ভিজিএফের আওতায় প্রতি মাসে চাল দেওয়া হয়। দুই মাসে জনপ্রতি মোট ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি চাল পাওয়ার কথা রয়েছে।তবে স্থানীয় জেলে ও ট্রলার মালিক সমিতির দাবি, সাতক্ষীরা জেলায় প্রকৃত জেলের সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। ফলে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

দাতিনাখালী গ্রামের জেলে শাহজাহান সরদার বলেন, যাদের কার্ড আছে তারাই সাহায্য পায়। বছরের পর বছর ধরে এই পেশায় থেকেও কার্ড পাইনি। নিষেধাজ্ঞার সময় কাজ না থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়। অন্যদিকে নিবন্ধিত জেলে আজগর আলী বলেন, যে চাল দেওয়া হয়, তা কিছুটা স্বস্তি দেয়। কিন্তু পাঁচ সদস্যের পরিবার শুধু চাল দিয়ে চলে না। তেল, ডাল, নুনসহ অন্যান্য খরচের জন্য আবার ঋণ নিতে হয়।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, নিবন্ধিত জেলেদের বড় একটি অংশকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। তবে শুধু চাল দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটে না। তাই চালের পাশাপাশি ডাল, তেল ও আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, জেলে কার্ড ও বন বিভাগের বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) ডেটাবেজের মধ্যে সমন্বয়ের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিত প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সুন্দরবন গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টুর মতে, সুন্দরবনসংলগ্ন হাজার হাজার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের অনেকেই দাদন ও মহাজনী ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

বন বিভাগের সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ বনজীবীদের কাছে এর সুফল এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে তিনি মনে করেন।

মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত বলেন, শুধু চাল দিয়ে একটি উপকূলীয় পরিবার বাঁচতে পারে না। নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবারপ্রতি চালের পাশাপাশি অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মৎস্যজীবীবান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততার বিস্তার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি ও কর্মসংস্থানের সুযোগকে সংকুচিত করেছে। আবাদি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার ক্রমেই সুন্দরবন ও জলাশয়কেন্দ্রিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, পুরুষেরা কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেলে কিংবা নিষেধাজ্ঞার সময়ে কর্মহীন থাকলে সংসারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভার নারীদের ওপর পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্য, মৎস্য ও বন বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা ফজলুল রহমান বলেন, বন বিভাগের বিএলসি অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া গেলে প্রকৃত বনজীবীদের চিহ্নিত করা সহজ হবে। বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় মাছ ও কাঁকড়া চাষ, হাঁস-মুরগি পালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁর মতে, এত বড় জনগোষ্ঠীর জীবনমান পরিবর্তনে বন বিভাগের একার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। খাদ্য, মৎস্য ও বন বিভাগের সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি দাদনচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

সুন্দরবন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা যেমন জরুরি, তেমনি নিষেধাজ্ঞার সময়ে সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষাও জরুরি। উপকূলের নারীরা প্রতিদিনের শ্রম দিয়ে যে পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখছেন, তাদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে বন সংরক্ষণের সঙ্গে মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের এই দ্বন্দ্ব আরও গভীর হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ