শ্রাবণধারায় জাগল খোলপেটুয়া, তক্তায় তক্তায় হাতুড়ির হাঁক: কয়রার নৌকাপল্লিতে কোটি টাকার কারবার
আষাঢ়-শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টিতে, কূল উপছায় নদী,
জোয়ারে ভাসে নতুন ডিঙি, কারিগর জাগে যদি।
কাঠের খাঁচে লোহা ঠুকে, তক্তায় পিন্টু গায়,
ভাটি অঞ্চলের নৌকাপল্লিতে এবার উজান বায়।
দর হাঁকাহাঁকি আর খরিদ্দারের জোড়াজুড়ির পালা শেষ। ১২ হাত লম্বা শিরিস কাঠের নৌকাটি হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে গায়ের বাঁধন আর ভারসাম্য মেপে দেখছিলেন সুন্দরবনের জেলে হামিদ গাজী। কপোতাক্ষ আর খোলপেটুয়ার বুক চিরে মাছ-কাঁকড়া ধরাই যাঁর আজন্ম পেশা। ঝোড়ো হাওয়ায় জলযানের শক্তপোক্ত গড়নই তো মূল ভরসা। দাম মিটিয়ে নাও ভাসানোর তরজোর করতেই ধারের চালার তলা থেকে ছিটকে এল করাত আর হাতুড়ির একটানা ঠুকঠাক আওয়াজ। শ্রাবণের ঘন মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন জমে উঠেছে কাঠ কাটার সোঁদা গন্ধ আর কারিগরদের হাঁকডাক। বর্ষার পানিতে গাঙ ভেসে উঠতেই খুলনার প্রান্তিক জনপদ কয়রার বহু বছরের পুরনো নৌকাপল্লিটি যেন এক লহমায় চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
উপজেলার কয়রা –খুলনা প্রধান সড়কের পাশে কয়রা বাস স্ট্যান্ড এর দুই পাশ জুড়ে কয়রা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে আবহাওয়া অফিস পর্যন্ত, অন্তাবুনিয়া বাজার সংলগ্ন, মহারাজপুর, দেওলিয়া বাজার চত্বরে বছরের পর বছর ধরে জাঁকিয়ে বসেছে এই নৌশিল্প। উপকূলীয় এলাকায় আষাঢ়-শ্রাবণে প্লাবন বাড়লে যাতায়াত, ঘাস কাটা কিংবা মাছ শিকারের প্রধান সঙ্গী হয়ে ওঠে জলপথের এসব ডিঙি, কোষা ও বালকি নৌকা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই নৌকার খাতির ছড়িয়ে পড়েছে খুলনা, সাতক্ষীরা, পাইকগাছা, যশোর আর বাজুয়ার বাজার সহ দূর-দূরান্তের গঞ্জে। দুর্যোগপ্রবণ এই অঞ্চলে কয়রার কারিগরদের হাতে গড়া শক্তপোক্ত নৌকার জুড়ি মেলা ভার।
কাঠের চ্যালা আর পেরেক ঠোকার ব্যস্ততায় মুখরিত গঞ্জঃ
গত শনিবার কয়রার নৌকা পল্লিতে পা রাখতেই চোখে পড়ে এলাহি কারবার। একের পর এক চালার নিচে চলছে নতুন ডিঙি গড়ার লড়াই। কেউ করাত টেনে ফাঁড়ছেন শিরিস, মেহগনি, রেনট্রি বা বাবলার গুড়ি, কেউ আবার হাতুড়ির ঘায়ে তক্তার গাঁথনিতে বসাচ্ছেন লোহা কিংবা চটের ক্যালফাৎ। শেষ ধাপে চলে আলকাতরার প্রলেপ আর ঘষামাজার পালিশ।
এক কারখানার ভেতর ডিঙি পরখ করছিলেন এক ব্যাপারী। মালিক তাঁহাকে আশ্বস্ত করে বললেন, “সুন্দরবনের উথাল-পাথাল ঢেউয়েও এ নাও উল্টাবে না। তক্তার তলাটা চওড়া করে মোড়া হয়েছে, তাই কানায় দাঁড়িয়ে জাল টানলেও হেলে পড়ার ভয় নেই।”
তিন দশকের অভিজ্ঞ কারিগর নজরুল ইসলাম জানালেন, ৮ থেকে ১০ হাত সাইজের ডিঙির দাম পড়ে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা। আর খই বা রেনট্রি কাঠের তৈরি ১৫ হাতের ভারী নৌকার খরিদ্দারকে গুনতে হয় ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া বনের ভেতর মাছ বা কাঁকড়া বহনের ট্রলার ও কোষা বিকোয় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায়।
নৌকা গড়ার কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে কারিগর শওকাত বাজোনদার বলেন, “সকাল থ্যাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা কাঠ কাটা আর পেরেক ঠোকার কাজ করি। আঙুলে হাতুড়ির চোট লাগে, পিঠ ব্যথা হয়ে যায়, তাও বর্ষার সময় কাজ থাহে বইল্যা মনে স্বস্তি পায়।”
ক্রেতা হামিদ গাজী বলছিলেন, “কয়রার নদীতে পানির তোড় বেজায় বেশি। এখানকার মিস্ত্রিদের হাতের বাঁধন এতই কড়া যে ক বছরের মধ্যেও পানি গলে না। সেই বিশ্বাসের টানেই এখানে আসা।”
মালিক ও কারিগরদের মুখে সংকটের কথাঃ
বেচাবিক্রি থাকলেও ভেতরের সংকট বেশ জোরালো। বিসমিল্লাহ নৌকা কারখানার মালিক হাবিবুর রহমান কপালে হাত দিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, “নৌকার চাহিদা থাকলেও আগের মতো লাভ নেই। মেহগনি ও বাবলার কাঠের দাম গত দুই বছরে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। সেই সঙ্গে লোহা, পেরেক, আলকাতরা আর চটের দামও চড়া। কিন্তু কাঠের দাম বাড়লেও কাস্টমারের কাছে নৌকার দাম সেই অনুপাতে বাড়াতে পারি না। এতে ব্যবসার মার্জিন একদম কমে গেছে।”

অন্যদিকে কারিগরদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট মেটেনি। প্রবীণ কারিগর মোসলেম বলেন, “বর্ষার তিন-চার মাস আমাদের দিনরাত খাটুনি থাকে, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে কাজ একদম কমে যায়। মহাজনরা তখন দৈনিক ৩০০-৪০০ টাকার বেশি মজুরি দিতে পারে না। এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।”
অন্যান্য কারখানা মালিকদের মতে, উপযুক্ত পুঁজির অভাব এই নৌশিল্পের প্রধান বাধা। এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালাতে গিয়ে লাভের বড় অংশ সুদের পেছনেই চলে যায়। ফলে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা করা না গেলে এই স্থানীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্ষার মৌসুমে কোটি টাকার লেনদেনঃ
কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ীদের হিসেবমতে, কয়রা এলাকায় ৮ থেকে ১০টি বড় চালার নিচে প্রায় শতাধিক মিস্ত্রি ও সাহায্যকারী রাত-দিন খেটে চলেছেন। ভরা শ্রাবণে এ এলাকা থেকে প্রায় কোটি টাকার ওপরে নৌকা ও ছাট ট্রলার কেনাবেচা হয়।
তবে কাঠ, লোহা, আলকাতরাসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের চড়া দামের কারণে বেচাবিক্রি বাড়লেও আগের মতো মুনাফা মিলছে না বলে আক্ষেপ কারিগরদের। তবু এই বর্ষার কয়েক মাসের রোজগারেই সারা বছর স্বাচ্ছন্দ্যে টেনে নেন তাঁদের সংসার।
মেসার্স তামিম এন্টারপ্রাইজ নৌকা কারখানার মালিক মো. সাহেব আলী খোকন। তিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে নৌকা তৈরি করছেন। বর্তমানে তাঁর কারখানায় ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন। সাহেব আলী খোকন জানান, বর্ষা এলেই তাঁদের বেচাকেনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এখন কয়রা শুধু নৌকা তৈরির কেন্দ্র নয়; বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় নৌকার বাজারে পরিণত হয়েছে। ছোট নৌকার দাম ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। মাঝারি নৌকা ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আর ৪৫ হাত লম্বা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের দাম ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। এখানে ট্রলার, পালতোলা, কোষা, ডিঙিসহ সব ধরনের কাঠের নৌকা তৈরি হয়। মেহগনি, খই, চাম্বল, লম্বু, শিরিস, পিত্তিরাজসহ বিভিন্ন ধরনের কাঠ ব্যবহার করা হয়।
কারখানার মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কয়রায় ৮ টি নৌকা তৈরির কারখানায় শতাধিক কারিগর কাজ করছেন। তবে কাঠ ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় আগের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা মানসম্মত কাঠের সংকট বলে জানান কয়রা নৌকা কারখানার মালিক খোকন। প্রতি মৌসুমে এখান থেকে প্রায় এক কোটি টাকার বেশি নৌকা বিক্রি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুঁজি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাবও এই শিল্পের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিবন্ধন ও কারিগরি সহায়তার আশ্বাসঃ
স্থানীয় প্রশাসনের মতে, জলবেষ্টিত এ জনপদে নৌকাপল্লি শুধু এক ব্যবসার ঠাঁই নয়, বরঞ্চ উপকূলের অর্থনীতি ও মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
সংশ্লিষ্ট কুটির শিল্প কর্মকর্তারা জানান,
এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোক্তাদের তালিকার আওতায় আনা হচ্ছে। সহজ শর্তে সরকারি ঋণ ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে কয়রার এই বাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মস্ত বড় এক নৌ-সরবরাহ কেন্দ্রে পরিণত হবে।