ছোটগল্প “নির্বাক মুগ্ধতায়” – সাঈদ চৌধুরী
‘তোমার পরশে আমি আলোকিত হই, নির্বাক মুগ্ধতায় হই রোমাঞ্চিত‘।
সাবিহার মোবাইল থেকে এই ওয়াটস আপ মেসেজ পেয়ে বিস্মিত হয় মারওয়ান। আনন্দিত না হয়ে তাজ্জব বনে যায় সে। কাব্যময় ও চিত্তাকর্ষক মেসেজ তাকে আবেগে আপ্লুত করেনি, এমন নয়। তবে এটি তার কাছে রহস্যময় মনে হয়।
তিন দিন আগেও ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে সাবিহা বেশ জুরালো ভাষায় সিঙ্গল নারিদের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। দ্যা গার্ডিয়ানের বরাত দিয়ে অবিবাহিত নারিদের সুখবর বিতরণ করেছে।
লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের আচরণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল ডোলান নাকি বলেছেন, পৃথিবীর মানুষদের মধ্যে যেসব নারির স্বামী-সন্তান নেই তারাই সবচেয়ে বেশি সুখী। শুধু তা-ই নয়, সন্তান পালনকারী ও বিবাহিত নারিদের চেয়ে অবিবাহিত বা কুমারি নারিরা বেশি দিন বাঁচে।
সাবিহা এসব তথ্য উদগীরণ করেছে বেশ জোরালো ভাষায়, অনেকটা সগৌরবে।
বান্ধবী মেহজাবিন ও ফাহমিদা বিষয়টি মানতে নারাজ। অনেক সময় ধরে বিতর্ক চালিয়েছে তারা।
ফাহমিদার স্বামী অধ্যাপক ইরফানও তর্কে যুক্ত হয়েছেন। নিজেদের সুখী সংসারের অনেক উদাহরণ টেনে এনেছেন অবলীলায়। তারপরও সাবিহা নিজের যুক্তিতে অটল ছিল, খানিকটা দৃঢ় সংকল্পে।
মেহজাবিন বিবাহ শব্দটির অন্তরঙ্গ যোগসাধনা করে বলেছে, বিবাহ মানেই হচ্ছে, স্বামী ও স্ত্রী একে অপরকে বিশেষ রূপে বহন করা। দিন শেষে নিজের ঘরই মানুষের শান্তির ঠিকানা।
এত সবের পরেও সাবিহা তার সহকর্মির অভিজ্ঞতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, বিবাহের পর শুধু পুরুষরাই উপকৃত হয়। নারির সাহচর্যে তারা শান্ত ও প্রসন্ন হয়। ফলে অনেক বেশি দিন বাঁচে।
এই তেজস্বিনী আরো বলেছে, বিবাহিত নারি তার সঙ্গীকে কেবল বিভিন্ন ভাবে সেবা আর সঙ্গ দিয়ে যেতে হয়। তাই সবচেয়ে সুখী ও স্বাস্থ্যবান নারি হচ্ছে তারাই, যারা বিয়ে করেনা এবং সন্তান জন্ম দেয়না।
সাবিহার প্রতি মারওয়ানের অন্তরে অপরিমেয় ভালোবাসা ছিল, সেদিনের এই বিতর্ক শুনে তা গেল কোথায়? বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে।
সেই বিতর্কের জের এখনো কাটেনি। তাই আজই কোন পুরুষের প্রতি সাবিহার আকর্ষণ বা বোধোদয় মোটেও স্বাভাবিক নয়। ভাবতে ভাবতে কিছুটা আচ্ছন্নের মত হয়ে যায় সে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষকদের মধ্যে সাবিহা খুব চৌকস ও মেধাবী হিসেবে খ্যাত। একই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেছে বলে ছোট বড় সকলের পরিচিত। এডমিন কর্মকর্তা মি. নাইম এই সুন্দরির প্রেমে মজেছে বহুদিন। খুব একটা পাত্তা পায়নি বলে এখন পিছন ছেড়ে দিয়েছে।
অন্যদিনের মত ক্যাফেতে না বসে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাড় দিয়ে হেঁটে বাঙ্গালি অধ্যুষিত একটি পার্কের বেঞ্চে বসে সাবিহা। মহা সড়কের সীমানা ঘেঁষেই পার্ক। এই রাস্তাকে চুম্বন করে প্রবল বেগে বয়ে চলেছে টেম্স নদী। সৌন্দর্য-বুভুক্ষু তৃপ্তিদায়ক দৃশ্য।
সুন্দরি রমনির দিকে তাকিয়ে দূর থেকে একজন গুন গুন করে গান ধরেছে। ‘কি জাদু করেছে, রুপের বাত্তি জালাইয়া মন উজার করেছে।‘
মারওয়ানের খুব মনে ধরেছে গানটি। সুরটা তার মাথার ভেতর ঘোরে। ওয়াটস আপ থেকে আগের দিনের মেসেজ বের করে তাকিয়ে থাকে।
অনেক্ষণ ধ্যানমগ্ন দেখে সাবিহা জানতে চায় কী হয়েছে? হতচকিত হয়ে বাক ফেরায় সে। আকাশে মেঘের আল্পনা। মেঘেদের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
অপরাহ্নের এক চিলতে রোদ এসে সাবিহার চেহারায় পড়েছে। অপূর্ব লাগছে তাকে। টেমসের অবিরাম কলতান আর সুনীল আকাশের অনবদ্য সৌন্দর্য যেন তাকে ঘিরে আছে।
চারদিকের শুনশান নিরবতা ভংগ করে কথা শুরু করে সাবিহা। সিঙ্গল নারিদের পক্ষে বিতর্কের পর গোধুলী বেলায় ফাহমিদা ফোন করেছিল। তার মতে, জীবন চলার জন্য মানুষের একজন সঙ্গী প্রয়োজন। কেউ একা থাকতে পারেনা। কারো বাবা-মা চিরদিন বেঁচে থাকেনা। আপন ভাই-বোনেরাও একসময় নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
যে নারির বিয়ে হয়নি বা বিয়ে হতে দেরি হচ্ছে, তাকে নিয়ে তার পরিবারে চিন্তার অন্ত নেই।
মারওয়ান বেশ পুলকিত হয়। যেন ঘোরের মাঝে সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে। পারিবারিক সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানায়। পরস্পরের মধ্যে অধিকার ও দায়িত্ব অনুভূত হলে অবশ্যই বিয়ে করা উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করে।
পার্ক জুড়ে হলুদ ও গোলাপি রঙের প্রজাপতি ওড়ছে। উঁচু উঁচু গাছের ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশ। একপাশে লালচে সবুজ আপেল বাগান। অপরদিকে ঘন সন্নিবদ্ধ পাইনের সারি আর সবুজ ঘাসের বুকে বেগুনি রঙের ছোট ছোট লাল বর্ণের বাহারি ফুল।
পেশায় বিজ্ঞান শিক্ষক হলেও আধুনিক চিকিৎসা বিশেষ করে করোনাভাইরাস নিয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা ও খোঁজ খবর রাখে মারওয়ান। সে জানায়, গবেষণা মতে অবিবাহিতদের করোনায় মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি। সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দাবি করেছেন, করোনায় এদের ১.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বেশি প্রাণ হানি ঘটতে পারে।
মারওয়ানের কথায় সায় দেয় সাবিহা। আরো নিরেট তথ্য জানতে চায়।
অবিবাহিত পুরুষ বা মহিলাদের চেয়ে বিবাহিত নারি-পুরুষের করোনায় মৃত্যুর আশঙ্কা কম। শুধু অবিবাহিত বলেই নয়, স্ত্রী মারা গেছেন এমন পুরুষ বা স্বামী গত হয়েছেন এমন মহিলার ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য।
যাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে এমন নারি বা পুরুষেরও সমান ভাবে করোনায় মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে বলে এক্যমতে এসেছেন গবেষকদল, জানায় মারওয়ান।
করোনার দাপটে বিশ্ব কার্যত হারিয়ে ফেলেছে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। নতুন গবেষণার খবর সাবিহা জেনে গেছে আগেই। তবে বুঝতে দেয়নি মারওয়ানকে।
অন্যদিনের মত মজার মজার খবর দিয়ে আলোচনায় বৈচিত্র আনতে চায়। সে জানায়, ব্রাজিলের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত নোভা ডো করডেরিও শহরে অনেক মেয়েরা বিয়ে করেনি। তাদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ৩৫। এই শহরের মেয়েরা বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন এমন খবরে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের মাঝে বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। তবে সেখানে কিছু নিয়ম আছে যা মেনে চলতে হয় স্বামীদের, যেগুলো স্থানীয় পুরুষদের অপছন্দ।
বিয়ের পর নাকি স্বামীকে শশুরালয়েই থাকতে হবে এবং বাসন মাজা, বাথরুম পরিস্কার করা আর রান্নায় সাহায্য করতে হবে।
মারওয়ান এর একটা ব্যখ্যা দিয়ে বলে, সেখানে যেসব নারি অবিবাহিত, তারা পুরুষ বিদ্বেষী নয়। তারা হয়ত নারি-পুরুষকে সমান ভাবে দেখতে চায়। তবে তারা অর্থনৈতিক ভাবে বেশ স্বাবলম্বী এবং একটু স্বাধীনচেতা। অবশ্য অধিক স্বাধীনতার কুফল হল, নোভা ডো করডেরিও শহরে বিবাহযোগ্য মেয়েদের সংখ্যা এখন বেড়েই চলেছে।
মারওয়ানের কথায় হালকা হাসিতে ঝলসে ওঠে সাবিহা। একের পর এক জোকস ও কৌতুক সমৃদ্ধ ঘটনা প্রবাহে আড্ডা জমায়। নিজের আইপেডে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এর খবর দেখিয়ে বলে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনে নতুন চন্দ্র বছর উদযাপন করতে কোটি কোটি মানুষ তাদের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে পরিবারের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কিছু চাকরিজীবী কর্মক্ষেত্র থেকে তাদের সাত দিনের নিয়মিত ছুটির সঙ্গে বাড়তি আট দিনের ছুটি পাচ্ছেন। ৩০ বছর পার হওয়া অবিবাহিত নারিরা যেন তাদের জীবন সঙ্গী খুঁজে নিতে পারেন, সে জন্যই এই সুযোগ।
উত্তরে মারওয়ান বলে, দেশটিতে কোনো নারি তিরিশের কাছাকাছি চলে আসার পরও যদি অবিবাহিত থাকে, তখন তাদের তাচ্ছিল্য করে ডাকা হয় শেং নু অর্থাৎ বাতিল কিংবা বাজেয়াপ্ত মেয়ে বলে। এ বিষয়ে সমালোচনা করে লেটা হং ফিনচার লেফটওভার ওমেন ও বিট্রেয়িইং বিগ ব্রাদার: দ্য ফেমিনিস্ট এওয়েকেনিং ইন চায়না নামে দুটি বইও লিখেছেন।
আসলে চীনের সামাজিক জীবনে এবং জনসংখ্যায় নারি-পুরুষের অনুপাতে বড় ধরনের ভারসাম্য হীনতা রয়েছে, কারণ সেখানে পরিবারে ছেলে শিশু নেয়াকে আজো অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
সাবিহা ভারতীয় পরকীয়া প্রেম নিয়ে কথা তুলে। এ সম্পর্কিত আইন পুরোপুরি নারি অধিকারের পরিপন্থী বলে মত প্রকাশ করে। আইনটি বড়ই অদ্ভুত।
ব্যাভিচারী স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী কোনও অভিযোগ করতে পারবে না, পুলিশেও নালিশ জানাতে পারবে না। বড়জোর নিজের বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করতে পারবে।
মারওয়ান বলে, এটা সত্যিই সেলুকাস! কোন স্বামী অবিবাহিত নারি, যৌন কর্মী অথবা বিধবা নারির সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত হয় তাতেও ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। শুধুমাত্র বিবাহিত পুরুষ অন্য কারো স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে সেটা অপরাধ বলে ধরা হয়। একজন ব্যভিচারী স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার স্বামী ফৌজদারি মামলা করতে পারে, কিন্তু স্ত্রী কোন স্বামীর বিরুদ্ধে তা করতে পারেনা।
রানি ভিক্টোরিয়ার আমলে যখন এই আইন তৈরি হয়েছিল, তখন মহিলারা আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে একজন স্ত্রীকে তার স্বামীর সম্পত্তি বলেই মনে করা হত।
মৃদু গতিতে হিমেল হাওয়া বইছে। চারিদিক সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। টেমস নদীতে একের পর এক জাহাজ, লঞ্চ ও স্টিমার ছুটে চলেছে। হঠাৎ একটা বিলাস বহুল জাহাজ দেখে চমকে যায় সাবিহা। সে জানে আমোদ-প্রমোদ ও বিনোদনের উৎস হিসাবে টেমস নদীর জনপ্রিয়তা ভিক্টোরিয়ান আমল থেকেই চলে আসছে।
লন্ডনের সুরম্য অট্টালিকার পাশ দিয়ে তার কুলকুল ধ্বনি আর ঝির ঝিরি বাতাসে অপরূপ রুপের আবেশ ছড়িয়ে রেখেছে এই নদী। কিন্তু ঐতিহাসিক টাইটানিকের মত এমন জমকালো জাহাজ আর কখনো চোখে পড়ে না তার।
টাইটানিকের প্রসঙ্গ আসতেই মারওয়ান নড়ে চড়ে বসে। বিরল ভালোবাসার একটা কাহিনী তার মনে পড়ে যায়। টাইটানিক যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন সকলেই প্রাণ বাঁচাতে দিক-বেদিক ছুটে চলেছেন। কিন্তু একজন যাত্রী তার প্রিয়জনকে ছেড়ে যাননি, একা বাঁচতে চাননি।
জাহাজে বিপদঘণ্টা বেজে চলেছে। যাত্রীরা সবাই বাঁচার আকুতিতে
ছোটাছুটি করছেন। কিন্তু ওই দম্পতি তাদের বিছানায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছেন। জাহাজে ঢুকে পড়া সমুদ্রের পানি ধাক্কা দিচ্ছে তাঁদের বিছানায়। কিন্তু এতে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুদিন আগে এই দম্পতির পরিচয় মিলেছে।
শুধু সিনেমায় নয়, সত্যিকারের ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজে এমন এক দম্পতি ছিলেন। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, টাইটানিক ডুবির প্রায় ৪১ বছর আগে মার্কিন ওই দম্পতির বিয়ে হয়। তারা ফ্রান্সে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন।
প্রথম শ্রেণির কেবিনের যাত্রী হওয়ার সুবাদে টাইটানিক ডুবে যাওয়ার সময় ইডাকে লাইফবোট নিয়ে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বামী ইসিডরের জন্য কোনো লাইফবোট বরাদ্দ না থাকায় ওই চরম মুহূর্তেও তিনি স্বামীকে ফেলে একা চলে যেতে চাননি। সে সময় ইডা তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, ‘ইসিডর, আমরা একসঙ্গে অনেক থেকেছি। আমরা একে অপরকে অনেক ভালোবাসি। তাই চলো, মৃত্যু পর্যন্ত এক
সঙ্গেই থাকি।’
পরে টাইটানিক ডুবে যাওয়া পর্যন্ত কেবিনের বিছানায় ওই দম্পতি একে অপরকে নির্বিকার ভাবে জড়িয়ে ধরে ছিলেন।
গল্পটা সাবিহাকে উন্মাতাল করে তুলে। শিহরণ জাগে তার মাঝে। টগবগ করে ওঠে রক্তপ্রবাহ। সংসার জীবন নিয়ে ভূল ধারণা বদলে দিতে চায়। এ নিয়ে একটা মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত নয় কি? জানতে চায় সে।
বিষয়টি মোটেও ছোট নয়। এ নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে নানা জটিলতা বিরাজমান। একটা মোটিভেশন অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাব করে মারওয়ান। দ্রুত সাড়া দেয় সাবিহা।
নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারে গবেষণাধর্মী একটা অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়। মারওয়ানের বন্ধু আদিল মোহাম্মদকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। আধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্পোরেট হাউজের উচ্চপদস্থ কয়েকজন বন্ধু এতে অংশ গ্রহন করেন। তাদের বক্তব্য থেকে চুম্বক অংশটি নোট নেন আদিল।
বিয়ের বয়স নিয়ে বিশ্লেষণ হয় সবচেয়ে বেশী। প্রায় সকলে একমত হন যে, সাধারণত ১৩ বছর বয়স থেকে মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন গুলো বেশ দ্রুত ঘটতে থাকে। অনেকের শারীরিক বৃদ্ধিসাধন ও মানসিক পরিপক্কতা আসতে আরো কিছু সময় লাগে। হরমোনের অসামঞ্জস্যতা বা বংশগত কারণে ঋতুস্রাব শুরু হতে বিলম্ব হয়।
ইউরোপ ও আমেরিকায় অধিকাংশ মেয়েদের মাসিক ১৩/১৪ বছর বয়সে শুরু হলেও গড়ে ১৭ বছর ধরা হয়। আর এ সময় থেকে মহান স্রষ্টার অমোঘ নিয়মে বিয়ের উপযুক্ত সময় বিবেচনা করা উচিত।
সাধারণত কুড়ি বছরের পর থেকেই ছেলে-মেয়ের বিয়ে বিষয়ক সরব আলোচনায় শুরু হয়। ২৫ বছর বয়সের পর বিয়ে না করা নিয়ে তাদের সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় নিকট জনেরা খোটা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক গঞ্জনা ও কুত্সা রটনার মত ঘটনা ঘটে থাকে। এ থেকে সৃষ্টি হয় নিঃসঙ্গতা বোধ ও বিষণ্ণতা।
বিলম্বের কারণ সম্পর্কে অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মেয়েদের কলেজ জীবনে উচ্চ শিক্ষার প্রত্যাশা, আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর ছেলের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশা, এমনকি দর্শনীয় গুনাবলি বাছ বিচার করতে গিয়ে সমতায় না আসা, মনের মতো সঙ্গী খুঁজে না পাওয়া, সাংসারিক জীবন নিয়ে ভীতি, অনবরত বিয়ে বিচ্ছেদ দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বিয়ে না করা ইত্যাদি বিষয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সময়ের ব্যবধানে অনুকূল পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে পড়ে। সময় গড়াতে থাকে, শুরু হয় কর্ম জীবন। পেশাগত চাপে দৈহিক লাবণ্য ও কমনীয়তা কমতে থাকে। অপর দিকে সমাজে বিবাহ না হওয়াকে গণ্য করা হয় অলক্ষুণে হিসেবে। কোথাও আবার সামাজিক আনুষ্ঠানে বেশি বয়সী অবিবাহিত নারিদের নেয়া হয়না। অনেকেই মনে করেন হয়তো
প্রেমে অসফল হয়েছে। মাথায় সমস্যা আছে বা পরকীয়া আছে এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। একটা সময়ে অবিবাহিতদের নিঃসঙ্গতা বোধ আঁকড়ে ধরে। বিপদে আপদে সহায়তার মানুষের অভাব, আপনজনদের অবহেলা, পরিচিত জনের কটুক্তি, প্রতিবেশির বাঁকা দৃষ্টি – সব মিলে জীবনটা দূর্বিসহ হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে বিয়ের সুফল ও কুফল নিয়ে বিস্তর বিতর্ক শেষে বিবাহের ফলে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের আশঙ্কা কমে হয় বলে সাম্প্রতিক গবেষণার বিষয়ে সকলে একমত হন।
বৃটিশ জার্নাল হার্ট-এ প্রকাশিত গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ব্রিটেনের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল ৪২ থেকে ৭৭ বছর বয়সী প্রায় ২০ লাখ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তারা মূলত ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনাভিয়া, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
অনেক পর্যালোচনার পর তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অবিবাহিতদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৪২ শতাংশ। যারা বিপত্নীক-বিধবা, ডিভোর্সি অথবা কখনও বিয়ে করেননি তাদের মধ্যে কার্ডিও ভাস্কুলার বা হৃদজনিত রোগ এবং করোনারি আর্টারি হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার বিপদ রয়েছে। পর্যালোচনায় উঠে আসে, ডিভোর্সের ফলে নারী ও পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আবার বিপত্নীক-বিধবা হলে স্ট্রোকের বিপদ ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
মারওয়ান বলে, দাম্পত্য জীবনের সুখ নিয়ে যাদের ধারণা অপ্রতুল তারাই কেবল বিবাহিত জীবনের প্রতি ভীতি ছড়িয়েছে। সত্যিকারের মানবিক সম্পর্কের মাঝেই আসল সুখ- একথাটি অনেকেই অনুভব করতে সময় লাগে।
আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু বছর ধরে একটি গবেষণা হয়েছে। ওই জরিপে ৭০ থেকে ৭৫ বছর বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছে হ্যাপিনেস বা সুখের সংজ্ঞা জানতে চাওয়া হয়। গবেষণা শেষে নানা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষকরা জানান, হ্যাপিনেস হচ্ছে জেন্যুইন হিউম্যান রিলেশনশিপ বা সত্যিকারের মানবিক সম্পর্ক। সে ব্যক্তির অর্থবিত্ত থাকুক বা না থাকুক, তার সঙ্গে তারা সুখী।
অনুষ্ঠানটি সাবিহা ও মারওয়ানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতক্ষণে পরস্পরকে গভীর ভাবে জানা হয়ে যায়। বুঝাবুঝির নতুন মাত্রা লাভ করে। নির্বাক মুগ্ধতায় তারা হয়ে ওঠে রোমাঞ্চিত।
* সাঈদ চৌধুরী – দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক
https://www.facebook.com/share/v/19Ag3XVKuU/?mibextid=wwXIfr