July 25, 2026, 4:01 pm
শিরনাম :
মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার শ্যামনগরে বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কালীগঞ্জে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

ছয় মাস পর নিজ সাম্রাজ্যে ফিরছে সেই বাঘিনী

তরফদার রবিউল ইসলাম

দীর্ঘ ছয় মাসের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে অবশেষে সুন্দরবনের সেই আহত বাঘিনী ফিরছে তার নিজস্ব আবাসস্থলে।

হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ছিটকা ফাঁদে গুরুতর আহত হওয়ার পর উদ্ধার করা বাঘিনীটিকে আগামী রবিবার (১২ জুলাই) সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খালসংলগ্ন গহীন অরণ্যে অবমুক্ত করা হবে। বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ কার্যক্রমে উপস্থিত থাকবেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম।

তবে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্যাটেলাইট কলার পাওয়া না যাওয়ায় বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। অবমুক্ত এলাকার প্রায় ৮ কিলোমিটারজুড়ে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে তার চলাচল, আচরণ ও শিকার করার সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে প্রায় ১০ বছর বয়সী বাঘিনীটি গুরুতর আহত হয়। পরদিন ট্রাঙ্কুলাইজার ব্যবহার করে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে গত ছয় মাস ধরে নিবিড় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তোলা হয়েছে।

বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, উদ্ধারকালে বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। ছিটকা ফাঁদের রশিতে দীর্ঘ সময় আটকে থেকে টানাটানির কারণে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল। উদ্ধার করার পর দ্রুত পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, নিয়মিত ড্রেসিং ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে তার চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে ক্ষত সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে, নতুন মাংস ও লোম গজিয়েছে এবং বাঘিনীটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে।প্রজনন মৌসুম ছাড়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার সাধারণত নির্দিষ্ট একটি এলাকায় একাই বিচরণ করে। তাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা বাঘিনীটিকে তার চিরচেনা আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, বনে ফিরে সে স্বাভাবিকভাবে শিকার করে নিজের জীবনধারা পুনরায় শুরু করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন,বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছিল বাঘিনীটির গলায় স্যাটেলাইট কলার লাগিয়ে অবমুক্ত করার, যাতে তার চলাচল, শিকার করার সক্ষমতা ও সার্বিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইইউসিএনের কাছ থেকে স্যাটেলাইট কলার পাওয়া যায়নি। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অবমুক্ত এলাকার প্রায় ৮ কিলোমিটারজুড়ে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে বাঘিনীটির গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। আমি নিজেও অবমুক্ত কার্যক্রমে উপস্থিত থেকে পুরো বিষয়টি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করব।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ ছয় মাসের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর বাঘিনীটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তার ক্ষত পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে, শারীরিক সক্ষমতা ফিরে এসেছে। ওজন বেড়েছে, চলাফেরা ও ক্ষিপ্রতাও আগের মতো হয়েছে। চিকিৎসাকালীন সময়ে তার আচরণ, খাদ্য গ্রহণ ও শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় আমাদের ধারণা, বাঘিনীটি এখন স্বাভাবিকভাবে শিকার করে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম হবে।

তিনি আরও বলেন,প্রাথমিকভাবে বাঘিনীটির গলায় স্যাটেলাইট কলার লাগিয়ে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইইউসিএনের কাছ থেকে সেটি পাওয়া না যাওয়ায় আর বিলম্ব না করে তাকে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিকল্প হিসেবে অবমুক্ত এলাকার প্রায় ৮ কিলোমিটারজুড়ে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে তার চলাচল, আচরণ এবং স্বাভাবিকভাবে শিকার করতে পারছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এছাড়া ট্রাঙ্কুলাইজার ব্যবহার করে নাকি অন্য কোনো নিরাপদ পদ্ধতিতে তাকে সুন্দরবনে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বাঘ গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম. এ. আজিজ বলেন, সুন্দরবনের একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার সাধারণত ১৪ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। উদ্ধার হওয়া বাঘিনীটির বয়স প্রায় ১০ বছর। সে হিসেবে এখনও তার কয়েক বছর প্রজনন ও স্বাভাবিকভাবে বনে বিচরণের সুযোগ রয়েছে। তাই চিকিৎসা শেষে তাকে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত। যত দ্রুত তাকে বনে অবমুক্ত করা যাবে, ততই তার জন্য মঙ্গলজনক হবে।

তিনি আরও বলেন,বন্যপ্রাণী দীর্ঘদিন বন্দি অবস্থায় থাকলে তাদের স্বাভাবিক আচরণ ও শিকার করার দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে গিয়ে নিজেই শিকার করে বেঁচে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না করে তাকে নিজস্ব আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

স্যাটেলাইট কলার না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এম. এ. আজিজ বলেন,স্যাটেলাইট কলার থাকলে বাঘিনীটির অবস্থান ও চলাচল আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতো। তবে নির্ধারিত সময়ে সেটি না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে যে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও একটি কার্যকর উদ্যোগ। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে বাঘিনীটির চলাচল, আচরণ এবং স্বাভাবিকভাবে শিকার করতে পারছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। প্রয়োজন হলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ