July 25, 2026, 4:00 pm
শিরনাম :
মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার শ্যামনগরে বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কালীগঞ্জে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

মহাজনের দাদন আর দস্যুর মার: সুন্দরবনে ‘টোকেন’ বাণিজ্যে নিঃস্ব ১৩ মৌয়াল

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

মহাজনের দাদন আর দস্যুর মার: সুন্দরবনে ‘টোকেন’ বাণিজ্যে নিঃস্ব ১৩ মৌয়াল দস্যুর খালে বন্দি দুই রাত, মুক্তিপণ দিয়ে ফেরা—মধু নয়, চোখে জল নিয়ে ফিরল ১৩ মৌয়াল”

সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে মধু খুঁজতে গিয়ে গভীর খালে দুই রাতের দুঃস্বপ্ন শেষে দস্যুদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে মুক্তিপণ দিয়ে প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন ১৩ মৌয়াল। রবিবার বিকেলে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে ফিরলেও তাদের হাতে নেই একফোঁটা মধু—আছে শুধু ঋণের বোঝা আর আতঙ্কের স্মৃতি।

গত বৃহস্পতিবার বানিয়াখালি ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমতি নিয়ে বনে ঢুকলেও নিয়তি তাদের টেনে নিয়ে যায় শিবসা নদীর ‘কুমড়াখালি’ খালে। সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র হাতে জিম্মি হন তারা।

​‘নিজেগের খাবো কি, আর মহাজনের দাদন শোধ করবো কি দিয়া?’

অপহরণের শিকার মৌয়াল দলের সরদার আব্দুল গফুর গাজী বাড়িতে ফিরে যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ডুকরে কেঁদে চোখে পানি নিয়ে বলেন,
“বনে ঢুকতি না ঢুকতেই দস্যুরা ঘিরে ধরলো। দুই দিন খালের ভিতর রাইখা মারধর করলো। টেকা-পয়সা, কাপড়চোপড়, সব লইয়া নিলো। শেষে বাড়িত ফোন দিয়া কয়—টেকা না দিলে ছাড়মু না।”
দস্যুরা প্রথমে দেড় লাখ টাকা দাবি করলেও দেনদরবার করে শেষ পর্যন্ত বিকাশে ৩৬ হাজার টাকা পাঠানোর পর মুক্তি পান তারা। তবে যাওয়ার সময় সঙ্গে থাকা নগদ প্রায় ৪২ হাজার টাকা, মধু সংগ্রহের সরঞ্জাম—সবই ছিনিয়ে নেয় দস্যুরা।

মৌয়াল হারুন গাজী ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন,
“আমাগো হাত-পা বাইন্ধা মারছে। কয়—হাসান মেম্বররে টেকা না দিয়া বনে ঢুকছস ক্যান? এইডা নাকি নিয়ম!”

একই কথা জানান খোকন মণ্ডলও,
“আগে জানতাম না কারা দস্যু, কারা লোকাল। এখন বুঝতাছি—সবাই একসাথে মিলা আমাগো মতো গরিব মানুষরে ঠকায়।”

পরিমল সরকার হতাশ কণ্ঠে বলেন,
“দাদন লইয়া বনে গেছি। যাওয়ার আগেই টেকা লইয়া গেছে, আবার বাড়ি থেইকাও টেকা নিছে। এখন ঋণ শোধ করমু কেমনে, বাচ্চা-পোলা খাওয়ামু কেমনে?”

দস্যু-জনপ্রতিনিধি ‘মধুর’ সম্পর্ক!
​মৌয়ালদের অভিযোগ, এবারের অপহরণের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মদদ। বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র পেছনে ছায়ার মতো কাজ করছেন আমাদি ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল হাসান ওরফে হাসান মেম্বর। মৌয়ালদের দাবি, হাসান মেম্বরের কাছে টাকা দিয়ে ‘টোকেন’ না নিয়ে বনে ঢোকাই ছিল তাদের অপরাধ।

​আরেক ভুক্তভোগী মৌয়াল গৌতম সরকার আক্ষেপ করে বলেন:
​”যাবার সময় ডাকাতি ধরলি নির্যাতনের থেইকে রেহাই পাতি কিছু নগদ টাকাও নিয়া গেছি সবাই। সেই টাকাও নিছে, আবার নির্যাতন কইরে বাড়ি থেইকেও বিকাশে ৩৬ হাজার টাকা নিছে। হাসান মেম্বর আমাগের এলাকার লোক হইয়ে এমন কাজ করতি পারলো—এটা ভাবতি কষ্ট লাগে।”

মৌয়াল খোকন মণ্ডলের বয়ানে উঠে এলো আরও ভয়াবহ তথ্য। তিনি জানান:
​”দস্যুরা অস্ত্র কেনার জন্যি হাসান মেম্বরের সাথে ৭ লাখ টাকায় চুক্তি করিছে। সেই টাকা তোলার জন্যিই আমাগের মতন বনজীবীদের ওপর এই জুলুম চলতেছে। আমরা তো জানতাম না যে রক্ষকই ভক্ষক!”

​টোকেন বাণিজ্য ও নেপথ্যের কারিগরঃ
​স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসান মেম্বরের সহযোগী বিপুল মণ্ডল দস্যুদের খাবার পৌঁছে দেন এবং লুট করা মধু লোকালয়ে এনে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য আবুল হাসান বলেন, “শাহাদাত কবিরাজ নামের একজনের সঙ্গে আমার বিরোধ থাকায় আমার নামে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”

প্রশাসনের বক্তব্যঃ
​সুন্দরবনের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন জানান, ১৩ জন মৌয়াল ফিরে আসার খবর তারা পেয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।
​এদিকে, মুক্তিপণ দিয়ে ফিরলেও দাদনের টাকা পরিশোধ আর সংসার চালানো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে এই ১৩টি পরিবারের। সুন্দরবনের ‘সোনার মধু’ এখন তাদের কাছে কান্নার নোনা জল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​এক নজরে ঘটনা:
​স্থান: কুমড়াখালি খাল, শিবসা নদী সংলগ্ন সুন্দরবন।
​বাহিনী: বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’।
​ক্ষয়ক্ষতি: নগদ ৪২ হাজার টাকা, সরঞ্জাম এবং বিকাশে ৩৬ হাজার টাকা মুক্তিপণ।
​অভিযুক্ত: স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হাসান (হাসান মেম্বর)।

সুশীল সমাজের অভিজ্ঞলোকদের মতে, সুন্দরবন–এ মৌয়াল ও বনজীবীদের নিরাপত্তা এখনো বড় প্রশ্ন। প্রতি মৌসুমেই এমন অপহরণ, চাঁদাবাজি আর দস্যুতার অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় আতঙ্ক কাটছে না।

মধুর মৌসুমে জীবিকা খুঁজতে গিয়ে এবার জীবন বাঁচিয়ে ফিরেছেন তারা—কিন্তু সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও কঠিন লড়াই: ঋণ শোধ আর পরিবারের ভরণপোষণ।
শাহজাহান সিরাজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ