July 25, 2026, 7:31 pm
শিরনাম :
পবিপ্রবিতে উদয় ভবনের নিলাম অনুষ্ঠিত আগের সরকারের দুর্নীতির তদন্ত করে পরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু যশোরের বাঘারপাড়ায় এনসিপির পথসভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ তালায় টিআরএম বিলের বকেয়া আদায় ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন প্রান্তিক ভূমিহীন ও মৎস্যজীবীদের কেন্দ্রীয় ভূমি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত পবিপ্রবিতে চাকসু প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় জুলাই অভূত্থান স্মরণে ছাত্রশিবিরের আয়োজনে স্বর্ণপদক প্রদান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রাজশাহী ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন ভূমিমন্ত্রী মেদনী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মাঠে রফিকুল ইসলাম খান

সুন্দরবনের গহীনে এবার ‘তরল সোনা’র খোঁজে’

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

সুন্দরবনের গহীনে এবার ‘তরল সোনা ‘র খোঁজে ‘, ১ এপ্রিল খুলছে অরন্যের দুয়ার মধুর ভান্ডার, মধু আহরনের অপেক্ষার প্রহর গুনছে মৌয়ালেরা

দিগন্তজোড়া গাছপালা আর নোনা জলের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরবন আবার ডাক দিচ্ছে। বসন্তের শেষ আর গ্রীষ্মের শুরুর এই সময়ে ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে সুন্দরবন। গরান, গেওয়া, খলিশাসহ নানা প্রজাতির ফুলে ভরে গেছে বনাঞ্চল। আর এই ফুলের সুবাসেই তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক মধুর ভাণ্ডার। বন জুড়ে মৌমাছিদের গুঞ্জন জানান দিচ্ছে-সময় হয়েছে ‘তরল সোনা’ সংগ্রহের। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১লা এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে মধু আহরণ মৌসুম। আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রস্তুত উপকূলের হাজারো মৌয়াল- যাদের কাছে এই মৌসুম মানেই বেঁচে থাকার লড়াই। সেই মধু সংগ্রহের অপেক্ষায় দিন গুনছেন উপকূলের মৌয়ালরা।

মৌয়াল পাড়ায় সাজ সাজ রব:
কয়রা উপজেলার মৌয়াল পল্লীগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ। কেউ নৌকায় রং মাখাচ্ছেন, কেউ ঠিক করছেন ‘কারু’ (ধোঁয়া দেওয়ার বিশেষ মশাল), আবার কেউ ব্যস্ত জাল আর দড়ি মেরামতে। বংশপরম্পরায় যারা বনের বাঘ-কুমিরের সাথে লড়াই করে মধু আনেন, তাদের কাছে ১লা এপ্রিল মানেই নতুন স্বপ্নের শুরু।

মৌয়ালদের ভাষায়, এবার বৃষ্টি সময়মতো হওয়ায় সুন্দরবনের গহিনে খলিশা ও গরান ফুলের ফলন বেশ ভালো। ফলে মধুর মান এবং পরিমাণ-দুটোই গতবারের চেয়ে বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হবে, যা চলবে টানা দুই মাস। এ বছর সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় এক হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর দুই হাজার ৮৫৩ জন মৌয়াল বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে এক হাজার ৪২৯ কুইন্টাল মধু ও ৪২৯ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেছিলেন।

গতকাল রবিবার খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীপথ ধরে আমাদের নৌকা যখন সুন্দরবনের আরও গভীরে প্রবেশ করল, মনে হলো কোনো নিপুণ শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে ঢুকে পড়েছি। চারিদিকে খলিশা আর গরান ফুলের হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ। কেওড়া গাছের সরু ডালগুলো যেন কুঁড়ির ভারে নুয়ে পড়ছে, আর কাঁটাভরা হারগোজাও আজ ফুলের হাসিতে তার রুক্ষতা লুকিয়েছে।

বনের এই রূপ কেবল দেখার নয়, অনুভব করার। কচি পাতার সেই গাঢ় সবুজ আর কাদা ফুঁড়ে বের হওয়া অজস্র শ্বাসমূল জানান দিচ্ছিল, শীতের জীর্ণতা কাটিয়ে বন আবার জেগে উঠেছে। এরই মাঝে নীরবতা ভেঙে কানে আসছিল মৌমাছিদের গুনগুনানি। ওরা বনের এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে এক অদ্ভুত ব্যস্ততায়—এক ফোঁটা মধুর খোঁজে, জীবনের খোঁজে।

বনের বর্তমান দৃশ্যপট:
ফুলের মেলা: কেওড়ার ডালে ডালে এখন কচি কুঁড়ির হাতছানি, আর কণ্টকাকীর্ণ হারগোজাও নিজেকে সাজিয়েছে সাদা-বেগুনি ফুলের সাজে।

সবুজের সমারোহ: কচি পাতার উজ্জ্বল সবুজ আভা আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা শ্বাসমূলের বিস্তার জানান দিচ্ছে প্রকৃতির নতুন প্রাণের স্পন্দন।

মধুর সন্ধানে: এই বুনো ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে মৌমাছির দল ব্যস্ত সময় পার করছে। এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে উড়ে তারা সংগ্রহ করছে খাঁটি বনজ মধু।

“সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ফরেস্ট স্টেশনে এখন সাজসাজ রব। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল-আমিন যেন অতন্দ্র প্রহরী। সেখানে ডানা মেলছে তিন প্রজাতির মৌমাছি— ‘এপিস ডরসাটা’, ‘সেরানা’ আর ‘ফ্লোরিয়া’। তবে বনের আসল ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে ডরসাটার চাকগুলোতে, যা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। মৌসুমের শুরুতেই মৌমাছিরা যখন নিচু ডালে বাসা বাঁধছে, ঠিক তখনই একদল অসাধু চক্রের নজর পড়েছে সেই সোনার তরলে। কিন্তু বনবিভাগও প্রস্তুত; নদীপথে চলছে চিরুনি অভিযান আর প্রতিটি নৌযানে তল্লাশি, যেন একটি ফোঁটা মধুও চুরি হতে না পারে।”

প্রাণের ঝুঁকি, তবুও অদম্য যাত্রা:
সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করা যতটা রোমাঞ্চকর, ঠিক ততটাই বিপজ্জনক। মৌয়ালদের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে থাকছে:
রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার: গহিন ঝোপের ভেতর বাঘের থাবা।

লোনা জলের কুমির: খালের ধারে বা পারাপারের সময় ওত পেতে থাকে বিপদ।

বনদস্যু ও জলদস্যু: যদিও আগের চেয়ে দস্যুতা অনেক কমেছে, তবুও ভয় কাটেনি পুরোপুরি।

“বন বিবির নাম নিয়ে বনে ঢুকি। আমরা জানি না ফিরে আসব কি না, কিন্তু পেটের দায়ে আর এই আদি পেশার টানে আমাদের যেতেই হয়। এবার ফুলের মুখ দেখে মনে হচ্ছে মা বন বিবি আমাদের খালি হাতে ফেরাবেন না।” এমনভাবে বলেন, মৌয়াল আবদুল জব্বার (৫২),

মৌয়ালদের ‘বাওয়ালি’ ও ‘কারু’ কৌশল:
মৌয়ালরা যখন বনের গভীরে যান, তারা বিশেষ কিছু কৌশল অবলম্বন করেন:

কারু (মশাল): খড় বা গাছের পাতা দিয়ে এক ধরনের ধোঁয়া তৈরি করা হয় যাকে ‘কারু’ বলে। এটি দিয়ে মৌমাছি তাড়ানো হয় যেন তারা হুল ফোটাতে না পারে।

ছাও (মধু কাটা): অভিজ্ঞ মৌয়ালরা চাকের উপরের অংশ (যেখানে মধু থাকে) কাটেন, কিন্তু নিচের অংশ বা ‘মাথা’ রেখে দেন যাতে মৌমাছিরা আবার সেখানে বাসা বাঁধতে পারে।

মন্ত্র ও বিশ্বাস: অনেক মৌয়াল বিশ্বাস করেন ‘বন বিবি’র কূপা থাকলে বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব। তাই বনে ঢোকার আগে তারা বিশেষ দোয়া বা আচার পালন করেন।

বনের ভেতরের কঠোর জীবন:
বনের ভেতর ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত থাকতে হয় মৌয়ালদের। এই সময়ে তাদের জীবন কাটে নৌকায়:

লবণাক্ত পানির চ্যালেঞ্জ: বনের পানি লবণাক্ত হওয়ায় তারা ছোট ছোট ড্রামে করে খাবার পানি নিয়ে যান। পানি ফুরিয়ে গেলে অনেক সময় কষ্টের সীমা থাকে না।

রান্না ও ঘুম: নৌকার ভেতরেই চলে রান্নাবান্না। আর বাঘের ভয়ে রাতে কেউ ডাঙায় নামেন না, মাঝনদীতে নৌকা নোঙর করে ঘুমান।

মধু সংগ্রহের ঝুঁকি ও আয়:
একজন মৌয়াল পুরো মৌসুমে গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি মধু সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু কষ্টের তুলনায় তারা সবসময় সঠিক দাম পান না। আড়তদার বা মহাজনদের কাছ থেকে দাদন (অগ্রিম টাকা) নেওয়ার ফলে অনেক সময় কম দামে মধু বিক্রি করতে তারা বাধ্য হন।

এদিকে মধুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন মৌয়ালরা। স্থানীয় বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত দাম থেকে বঞ্চিত হন বলে জানান তারা।
কয়রার এক মৌয়াল দলের নেতা বলেন, “আমরা কষ্ট করে মধু সংগ্রহ করি, কিন্তু বিক্রির সময় ন্যায্য দাম পাই না। এতে আমাদের লাভ কমে যায়।”

পরিবেশবিদদের মতে, মৌয়ালদের এই জীবনসংগ্রামকে টিকিয়ে রাখতে হলে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সচেতনভাবে মধু আহরণ করলে বনের জীববৈচিত্র্যও রক্ষা পায়।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী সাইফুল ইসলাম বলেন, “মৌয়ালরা বনের শত্রু না, বরং অংশ। তারা টিকে থাকলে সুন্দরবনও টিকে থাকবে।”
এদিকে মৌসুম শুরু মানেই উপকূলের পরিবারগুলোতে অস্থিরতা।

কয়রার এক গৃহবধূর কণ্ঠে আতঙ্ক স্পষ্ট, “ওরা বনে গেলে প্রতিদিন মনে হয়-আজ ফিরবে তো? আমরা শুধু অপেক্ষা করি।” মধুর মৌসুম তাই শুধু সংগ্রহের সময় নয়-এটি একসঙ্গে আশা ও আশঙ্কার সময়। কারণ, সুন্দরবনে প্রতিটি মৌয়ালের যাত্রা মানে-ফিরে আসার অনিশ্চয়তাই জীবনের দিকে “বনে ঢুকলেই মনে হয়, এই বুঝি বাঘ সামনে এসে দাঁড়াল। তারপরও যেতে হয়, কারণ ঘরে বসে থাকলে তো সন্তানদের খাওয়াতে পারব না,” -কথাগুলো বলছিলেন পল্লীমঙ্গলের মৌয়াল রফিকুল ইসলাম।

শুধু বাঘ নয়, নদীপথে দস্যুদের উৎপাত, হঠাৎ ঝড় কিংবা জোয়ার-ভাটার ঝুঁকিও কম নয়। “আমরা যখন বনে থাকি, তখন প্রতিদিনই পরিবারের লোকজন আতঙ্কে থাকে। ফোনে কথা বললেই তারা শুধু বলে-সাবধানে থেকো,” –জানালেন মহারাজপুরের মৌয়াল আঃ রহিম।

মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়:
সুন্দরবনের মধু মানেই স্বাদের এক অনন্য বিবর্তন। মৌসুমের শুরুতেই মৌয়ালরা মুখিয়ে থাকেন সেই দুর্লভ খলিশা ফুলের মধুর জন্য—যা নারকেল তেলের মতো স্বচ্ছ আর জিভে লেগে থাকা মিষ্টি স্বাদের জন্য বিখ্যাত। তবে খলিশা গাছ কম হওয়ায় এই মধু পাওয়া যায় খুব সীমিত পরিমাণে। এরপর বনের প্রকৃতি একে একে বিলিয়ে দেয় গরান, কাঁকড়া আর হারগোজা ফুলের রস। মৌসুমের একদম শেষে আসে কেওড়া ও গেওয়ার মধু। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ার আসল কারিগর প্রকৃতি; ঠিকঠাক বৃষ্টি না হলে ফুল ঝরে পড়ে থমকে যায় মধু সংগ্রহের এই উৎসব।”

“বনের গাছে ফুল ফুটলিও মনে শান্তি নেই জাহিদুরদের”
শাকবাড়িয়া পারে কথা হয় মৌয়াল জাহিদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ “শাকবাড়িয়া নদীর কূলে দাঁড়ায়ি জাহিদুর কতিছে, ‘বনের গাচি এট্টু ফুল ফুটি গিছে। এক তারিখি আমরা সব দল বান্দি মধু কাটতি যাবানে। এক নৌকায় পাঁচজন করি থাহি, খরচপাতিও তো সোজা না—মাথাপিছু কুড়ি হাজার টাকার উপুরি লাগে। প্রথম দিকি মধু ইট্টু কমই হয়। গত বছর তো ৩০ হাজার টাকা মণ দরে মধু বেচিলাম। এহন সুন্দরবনে আবার ডাকাত উপদ্রব বাইড়ে গেছে, শেষমেশ যে কী হবে কিচু বুঝতি পারতিছিনে’।”

“সুন্দরবনে এবার মধুর মৌসুম শুরু হচ্ছে এক রাজকীয় আয়োজনে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হাছানুর রহমান জানান, এ বছর মধু আহরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় পরিসরে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বনের শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়ম করা হয়েছে কড়া—একজন মৌয়াল ১৪ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ কেজি মধু ও ১৫ কেজি মোম সংগ্রহের অনুমতি পাবেন। নির্ধারিত সময়ের এক মুহূর্ত বেশিও বনে অবস্থান করা যাবে না।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ