July 25, 2026, 6:41 pm
শিরনাম :
আগের সরকারের দুর্নীতির তদন্ত করে পরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু যশোরের বাঘারপাড়ায় এনসিপির পথসভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ তালায় টিআরএম বিলের বকেয়া আদায় ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন প্রান্তিক ভূমিহীন ও মৎস্যজীবীদের কেন্দ্রীয় ভূমি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত পবিপ্রবিতে চাকসু প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় জুলাই অভূত্থান স্মরণে ছাত্রশিবিরের আয়োজনে স্বর্ণপদক প্রদান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রাজশাহী ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন ভূমিমন্ত্রী মেদনী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মাঠে রফিকুল ইসলাম খান কালীগঞ্জে বাল্য বিয়ের অপরাধে কনের পিতাকে ছয় মাসের কারাদন্ড

ধোয়ার গন্ধে মন টানে , গায়ের সন্ধ্যায় ভাপা পিঠার পসরা জমছে মানুষের ভিড়, বাড়তি আয়ে খুশি নারীরা

শাহজহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে শীতের হালকা কুয়াশা। দূর থেকে চোখে পড়ছিল মিটমিট করে জ্বলতে থাকা আলো। কাছে যেতেই দেখা গেল, (গ্রাজুয়েটস স্কুলের সামনে দিয়ে পিচের রাস্তা ছেদুর ব্রীজে তকিম মোড়ল সুপার মার্কেটের সামনে ) মোড়ে মাটির চুলায় ভাপা পিঠা বানাচ্ছেন মৌসুমি খাতুন (২৫)।

চুলার আগুনে ফুটছে পানিভরা হাঁড়ি, তার ওপর সাজানো পিঠা। গরম-গরম পিঠা কিনতে তাঁর চারপাশে ভিড় জমিয়েছেন গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ। কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিঠা খাচ্ছেন, কেউ বাড়িতে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ কেউ চুলার আগুনের কাছে হাত বাড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।

আগুনের আঁচে বসানো পাতিল থেইকা ধোঁয়া উঠলেই মানুষ বুঝে যায়-ভাপা পিঠা তৈরি হইতাছে। ঠান্ডা বতাসের লগে লগে খেজুর গুড় আর নারিকেলের গন্ধ ছড়াইয়া পড়ে গ্রামে-গ্রামে। দিনভর হাল-চাষ বা খেতের কাম সাইরা মানুষ ফিরবার পথে একটু থামে। কেউ বলে, “একডা দাও তো, গরম গরম।” কেউ আবার দুইটা পিঠা নেয় বাচ্চার লাইগা। রাস্তার ধারের এই পিঠার হাঁড়িই যেন শীতের সবচেয়ে বড় ডাক।

সরেজমিনে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি ) সন্ধ্যায় দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের সড়কের মোড়ে মোড়ে মাটির চুলায় পিঠা তৈরি করছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। দোকানের সামনে স্বাদের পিঠা খাওয়ার ধুম লেগেছে। তবে বেশি ভিড় দেখা গেছে মহারাজপুর গ্রামের ছেদুর ব্রীজ মোড় তকিম মোড়ল সুপার মার্কেটের শাহিনুরের বিকাশের দোকানের সামনে। নতুন চালের পিঠা খেতে অনেক সময় কাড়াকাড়ি বেঁধে যায় এ দোকানে। মাত্র ১০ টাকার মধ্যে পছন্দমতো পিঠার স্বাদ নিতে পারছেন সাধারণ মানুষজন।

তকিম মোড়ল সুপার মার্কেটের সামনে পিঠা কিনতে আসা সেলিম বলেন, গ্রামের বাড়িতে শীতের সময় পিঠা খাওয়ার আনন্দঘন মুহূর্তগুলো শহুরে জীবনে এখন স্মৃতি। এখন গ্রামেই মিলছে নানা রকম পিঠা। শীতের পিঠার এ রসনা বিলাসের সুযোগ হাতছাড়া করি না। প্রায় কিনে নিয়ে যাই বাসায়। তবে বিরক্তির বিষয় একটি এখানে কখনও লাইনে না দাঁড়িয়ে পিঠা কেনা যায় না।

পিঠা খাওয়ার সময় কথা হয় প্রাইভেটকার চালক রনির সঙ্গে। তিনি বলেন, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতা বাড়ে। তখন গরম পিঠা খেতে খুব মজা লাগে।

মনিরুন্নেছা নামের এক চাকরিজীবী নারী বলেন, ব্যস্ত নাগরিক জীবনে ঘরে পিঠা বানানোর সময় তেমন হয় না। সে কারণে বাইরের দোকানের পিঠাই একমাত্র ভরসা।

বামিয়া এক গাঁয়ের পিঠা বানানো মাইয়া হাজেরা বেগম কইলেন, “শীত আইলেই এই হাঁড়ি নিয়া বসি। দিনে তেমন বেচা নাই, কিন্তু সন্ধ্যার পর মানুষ আইসা দাঁড়ায়। আল্লাহ দিলে দুই-চার পয়সা হয়, ঘরের চুলা জ্বলে।” এই ভাপা পিঠা বানানো গাঁয়ের মাইয়াদের কাছে নতুন কিছু না। ভোরে উঠেই চাল ভিজানো, ঢেঁকিতে গুঁড়া করা, গুড় ভাঙা-সব কাম নিজের হাতে। হাজেরা বেগম কইলেন, “এই পিঠা তো দোকানের জিনিস না। গাঁয়ের মাটির লগে মিশা স্বাদ। যত কষ্টই হোক, এই পিঠার স্বাদ বদলাই না।”

বয়স্ক মানুষদের চোখে আবার অন্য ছবি। তারা এই ভাপা পিঠার মধ্যে খোঁজে পুরোনো দিন। গ্রামের মুরব্বি রাজ্জাক চাচা কইলেন, “আগে তো ঘরে ঘরে পিঠা হইত। এখন সবাই ব্যস্ত। তয় রাস্তার ধারে এই হাঁড়ি দেইখা মনে হয়, শীত এখনো গাঁ ছাড়ে নাই।” শীত যত বাড়ে, ততই গাঁয়ের রাস্তার ধারে ভাপা পিঠার হাঁড়ি বাড়ে। এই পিঠা শুধু খাওনের জিনিস না-এইটা গাঁয়ের মানুষের সুখ, কষ্ট আর স্মৃতির লগে জড়ানো।

জায়গীর মহল হাসপাতালের সামনে এক গাঁয়ের বৃদ্ধা ছফুরা নেছা চোখে পানি নিয়া কইলেন, “বাবা, এই গন্ধ পাইলে বুকটা কেমন জানি কইরা ওঠে। আমার মায় আছিল, শীত আইলেই উঠোনে পিঠা বানাইত। এখন তো আর সেই ঘর নাই, তয় এই পিঠা দেখলে মনডা ভিজা যায়।”

একটু দূরে রাস্তার ধারে হাঁড়ি বসাইছে রমেছা বেগম। হাত থামাইয়া হেসে কইলেন”এই পিঠা বানাইয়া বড় ইতাছি না, কিন্তু মনডা শান্তি পায়। মানুষ খাইয়া যখন কয়-‘খুব ভালো হইছে’, তখন মনে হয় কষ্ট সার্থক।”
কেউ খায় স্মৃতির টানে, কেউ খায় ক্লান্তি ভাঙাতে। ক্ষেত থেইকা ফেরা কৃষক ছলেমান সরদার কইলেন, “সারা দিন ঠান্ডায় কাম কইরা গা শক্ত হইয়া যায়। এই গরম পিঠা খাইলে গা-মন দুইটাই নরম হয়।”

গাঁয়ের কিশোর রাজু আর তার বন্ধুরা পিঠা হাতে হাসাহাসি করতেছে। রাজু কইল, “আমরা তো শহরে যাই না। এই পিঠাই আমাদের শীতের ট্রিট। বন্ধুদের লগে দাঁড়াইয়া খাই-এইটাই আনন্দ।”

আবার স্কুলের মোড়ে দাঁড়ানো এক মধ্যবয়সী মানুষ চাপা গলায় কইলেন, “শহরে গেলে অনেক কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু এই রাস্তার ধারের পিঠার মতো মন ভরায় না। এইটার লগে গাঁয়ের মায়া লাগা।”

এই ভাপা পিঠার হাঁড়ির চারপাশে কেউ শুধু খাবার খায় না-কেউ খোঁজে মায়ের হাত, কেউ খোঁজে পুরোনো উঠোন, কেউ খোঁজে একটুখানি উষ্ণতা। শীতের সন্ধ্যায় রাস্তার ধারে দাঁড়ানো এই ছোট ছোট হাঁড়িগুলোর ভেতরেই মিশে থাকে মানুষের হাসি, দীর্ঘশ্বাস আর নীরব ভালোবাসা। তাই ভাপা পিঠা শুধু পেট ভরানোর জিনিস না। এইটা গাঁয়ের শীতের ভাষা-যেই ভাষায় ধোঁয়া কথা কয়, আর মানুষের মন আপন হয়ে যায়।

বিক্রেতারা বলছেন, শীত এলেই এই মৌসুমি ব্যবসায় প্রাণ ফেরে। অল্প পুঁজিতে সংসারের বাড়তি আয় হয়। কেউ কেউ বছরের বাকি সময় অন্য কাজ করলেও শীতে ভাপা পিঠার হাঁড়িই হয়ে ওঠে জীবিকার ভরসা। দামও তুলনামূলক সহনীয়-দুটি পিঠা কিনে শীতের সন্ধ্যায় একটু স্বস্তি খুঁজে নেন ক্রেতারা।

ভাপা পিঠা বিক্রেতা মৌসুমি খাতুন প্রতিবেদককে বলেন,এখানে প্রতিদিন ৫-৭ কেজি চালের গুড়ার ভাপা পিঠা বিক্রি হয়। প্রতিটি পিঠার মূল্য ১০ টাকা। তিনি জানান, এতো বেশি ভিড় হয় যে মাঝে মধ্যে হিমশিম খেতে হয়। অনেককেই ফিরিয়ে দিতে হয়।

কয়রা উপজেলার মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, এখন নারীরা তো আর পিছিয়ে নেই। শীতকালে নিজ এলাকায় বিভিন্ন ধরনের পিঠার দোকান দিয়ে তাঁরা আয় করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে আরও কোনো সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে সেটি আরও ভালো হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ