July 25, 2026, 6:41 pm
শিরনাম :
আগের সরকারের দুর্নীতির তদন্ত করে পরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু যশোরের বাঘারপাড়ায় এনসিপির পথসভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ তালায় টিআরএম বিলের বকেয়া আদায় ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন প্রান্তিক ভূমিহীন ও মৎস্যজীবীদের কেন্দ্রীয় ভূমি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত পবিপ্রবিতে চাকসু প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় জুলাই অভূত্থান স্মরণে ছাত্রশিবিরের আয়োজনে স্বর্ণপদক প্রদান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রাজশাহী ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন ভূমিমন্ত্রী মেদনী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মাঠে রফিকুল ইসলাম খান কালীগঞ্জে বাল্য বিয়ের অপরাধে কনের পিতাকে ছয় মাসের কারাদন্ড

সুন্দরবনে দুই মাস কাঁকড়া ধরা বন্ধ জীবিকার টানে অপেক্ষা, বন রক্ষার দায়ে নীরব জেলেপাড়া

শাহজাহান সিরাজ, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাকড়া আহরণে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম। সুন্দরবনের নদী-খালে কাঁকড়ার এই প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে (১ লা জানুয়ারি) থেকে দুই মাসের জন্য কাঁকড়া ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। এ নিষেধাজ্ঞা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।এ সময় সুন্দরবনে এ জলজ প্রাণী শিকার নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ।

বন বিভাগের এই সিদ্ধান্তে বনের খাল-নদীতে থেমে গেছে কাকড়ার খাঁচা নামানো। এতে একদিকে বন রক্ষার উদ্যোগ জোরালো হলেও, অন্যদিকে জীবিকার একমাত্র ভরসা হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে সুন্দরবনঘেঁষা কয়েক হাজার জেলে পরিবার।
“বন বাঁচলে আমরাও বাঁচব, কিন্তু সংসারও তো চলে।

খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামের জেলে আবদুস সালাম (৪৫) বলেন, “বছরের এই দুই মাস খুব কষ্টের। কাকড়া ধরা ছাড়া আমাদের আর কোনো কাজ নাই। তবু জানি, এখন না ছাড়লে পরে কিছুই থাকবে না।”
সালামের মতো অনেক জেলেই নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা বোঝেন। তবে বাস্তবতা কঠিন। সংসারে চাল, ডাল, ছেলেমেয়ের স্কুল-সবকিছুই নির্ভর করে এই বনের ওপর।

বিকল্প কাজ নেই, ধারই ভরসা
৪ নং কয়রা এলাকার জেলে নারী আয়মন বেগম বলেন, “স্বামী বনে যায় না এখন। ঘরে বসে আছে।“বিকল্প কাজের ব্যবস্থা নেই। নদীতে নামতে না পারলে ঋণ করে সংসার চালাতে হবে। এনজিও থেকে আগে কিছু ঋণ ছিল, আবার ধার নিতে হচ্ছে। সরকার যদি এই সময় একটু সহায়তা দিত তাহলে এ নিয়ম মানা সহজ হতো।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা

তবে মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা মানতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন প্রান্তিক জেলেরা। কয়রা, উপজেলার ৭ ইউনিয়নের বহু পরিবার বছরের বড় একটি সময় কেবল কাঁকড়া ধরার ওপর নির্ভরশীল।
কয়রার মহেশ্বরীপুর গ্রামের জেলে কুদ্দুস বলেন, “আমরা দিনে যা আয় করি, তা দিয়েই সংসার চলে। দুই মাস কাজ বন্ধ মানে ধারদেনা বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।”

বাজারে কাঁকড়া, প্রশ্ন নজরদারিতে
নিষেধাজ্ঞা চললেও স্থানীয় কিছু বাজারে কাকড়া পাওয়া যাচ্ছে। এতে নজরদারি ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলেদের অভিযোগ, সরাসরি বননির্ভর দরিদ্র জেলেদের ওপর নজরদারি কড়াকড়ি হলেও প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগীদের ক্ষেত্রে ততটা কার্যকর হয় না।

উপজেলার এক জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা নৌকা নামালেই টহল আসে। কিন্তু অন্য পথে ঠিকই কাঁকড়া যাচ্ছে।”

সহায়তা না থাকলে ঝুঁকি বাড়বে
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবিকা সহায়তা ছাড়া এমন নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখা কঠিন। খুলনার এক পরিবেশ গবেষক বলেন, “সংরক্ষণ ও জীবিকা-দুটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। নইলে নিষেধাজ্ঞা জেলেদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে এবং অবৈধ আহরণ বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।” অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক জেলে ইতিমধ্যে এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণগ্রস্ত। দুই মাস আয় বন্ধ থাকলে সেই ঋণের চাপ আরও বাড়বে।

সমাধান কী
জেলে নেতাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় চাল, নগদ সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে তারা স্বেচ্ছায় নিয়ম মানবেন। একই সঙ্গে বাজার ও পরিবহন পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোরও দাবি উঠেছে।
সুন্দরবনের কাকড়া সংরক্ষণ পরিবেশের জন্য অপরিহার্য হলেও, সেই উদ্যোগে মানবিক ও সামাজিক দিকটি উপেক্ষিত হলে তা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে-এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন বিভাগের ভাষ্য
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, প্রতিবছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি-এই দুই মাসে সুন্দরবনের নদী-খালে কাঁকড়া ডিম পাড়ে এবং সেখান থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়। এ সময় কাঁকড়া অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

বন সংরক্ষক আরও বলেন, এ সময়ে কাঁকড়া ধরা হলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কাঁকড়া ধরার অনুমতিপত্র ইস্যু বন্ধ থাকায় গভীর বনাঞ্চলে অবস্থানরত জেলেরা লোকালয়ে ফিরে এসেছেন।

তবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, প্রজনন মৌসুমে কয়েকটি চক্র নানা কৌশলে সুন্দরবনে ঢুকে কাঁকড়া শিকার করে। বন বিভাগের একশ্রেণির অসাধু বনরক্ষী ও কর্মকর্তার সহায়তায় এসব চক্র অবৈধভাবে কাঁকড়া ধরা অব্যাহত রাখে। এতে সাধারণ জেলেরা যেমন আর্থিক সংকটে পড়েন, তেমনি নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়। পাশাপাশি কাঁকড়ার বংশবিস্তার ও সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা পরিবেশবাদীদের।
পরিবেশবাদীরা বলেন, সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম, তবে তা সুন্দরবনের ক্ষতি করে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বন কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ঘুষ আদায়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।

উপজেলার কয়েকজন বনজীবী জেলে জানান, কাঁকড়ার ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক। এ কারণে প্রজনন মৌসুমেও সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরা বন্ধ হচ্ছে না। অধিক লাভের আশায় একশ্রেণির জেলে প্রতি বছর বন বিভাগের কাছ থেকে মাছ ধরার অনুমতি নিয়ে বনে ঢুকে ডিমওয়ালা কাঁকড়া শিকার করেন।

সুন্দরবনের ভেতর থেকে কাঁকড়া ধরে নৌকাযোগে লোকালয়ে আনা হয়। পরে তা সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার ঘড়িলাল, গোলখালি, আংটিহারা, কাটাকাট ও দেউলিয়া এবং দাকোপ উপজেলার নলিয়ান, কালিনগর, কৈলাশগঞ্জ, রামনগর, বাজুয়া, চালনা ও পাইকগাছা বাজারের ডিপোগুলোতে বিক্রি করা হয়।

কয়রার এক কাঁকড়া ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নিষেধাজ্ঞা আসলে কাগজে-কলমেই থাকে। ঘাটে ঘাটে কিছু টাকা দিলেই সব পক্ষ ম্যানেজ করা যায়।”
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জলভাগ প্রায় ৩১ শতাংশ। এখানে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী আছে। সুন্দরবনের সম্পদ আহরণের জন্য ১২ হাজার নৌকার অনুমতিপত্র দেওয়া হয়, যার এক-তৃতীয়াংশ কাঁকড়া ধরার জন্য বরাদ্দ। প্রজনন মৌসুমে কাঁকড়া ধরার অনুমতি বন্ধ থাকলেও মাছ ধরার অনুমতি বহাল থাকে।

কাঁকড়া রক্ষা ও প্রজনন সম্পর্কে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, ‘জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে কাঁকড়া ডিম পাড়ে। ডিমওয়ালা কাঁকড়ারা ক্ষুধার্ত থাকে, তাই সহজে ধরা যায়। এ সময় শিকার না করলে পরের বছর বেশি কাঁকড়া উৎপাদন সম্ভব। আমরা টহল জোরদার করেছি। কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে বন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পশ্চিম সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, কাঁকড়া শুধু অর্থনৈতিক নয়, সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্থানীয় জনগণ, জেলে ও ব্যবসায়ীদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সুন্দরবনের খালগুলো এখন নীরব। সেই নীরবতার ভেতরেই জেলেরা গুনছেন অপেক্ষার দিন-বন বাঁচুক, আবার জীবিকাও ফিরুক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ