আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। গত বছর এই দিনে ছাত্র-জনতাসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের বিপুল বিক্ষোভে সরকারের পতন ঘটে।
এই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি সামনে রেখে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাপ্তাহিক দ্য ইকোনমিস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে উচ্ছ্বাস এসেছিল, সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে মাত্র চার বছরেই তা ফিকে হয়ে যায়। গত বছর একটি গণবিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে দ্বিতীয় যে মুক্তির সূচনা হয়েছে, তা আরও দ্রুত ‘ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে’।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের গণতন্ত্রকে নতুন করে গড়ে তোলা। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও, নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
‘অ্যা বিগ মিসটেক বাই বাংলাদেশ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ইকোনমিস্ট লিখেছে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিক আছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতে, ২০২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.২ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে ৩.৯ শতাংশে দাঁড়ালেও এটি আগের আশঙ্কার তুলনায় ভালো। প্রবাসী আয় বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা বেড়েছে। জুলাই ২০২৪-এ যেখানে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশ, তা মে ২০২৫-এ নেমেছে ৯ শতাংশে।
সরকার ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দূর করতে উদ্যোগ নিয়েছে এবং বলা হচ্ছে, আগের সরকারের সময় পাচার হওয়া কোটি কোটি ডলারের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এদিকে আইএমএফ ও এডিবি সম্প্রতি বহু বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে।
১৯ জুন চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রথম ত্রিপক্ষীয় সম্মেলন করেছে। ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে। বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল হয়েছে, যা রফতানির খরচ বাড়াবে।
ড. ইউনূস জানিয়েছেন, নির্বাচন হতে পারে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বা এপ্রিলের পরে নির্বাচন যাবে না। এর আগে ‘জুলাই চার্টার’ নামে একটি দলিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনের নিয়ম ও কাক্সিক্ষত সংস্কারের তালিকায় সম্মত হতে বলা হচ্ছে। প্রায় ১৫০টি দল নির্বাচনে অংশ নিতে নিবন্ধন করেছে, যা পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্রদের আন্দোলন থেকে উঠে আসা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। সরকার নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের উঠে আসতে সাহায্য করতে চায়। এটা আশাব্যঞ্জক। তবে সমস্যা হলো, এসব ছোট দল তেমন ভোট পাবে না।
একটি জনমত জরিপ বলছে, মাত্র ৫ শতাংশ ভোটার এনসিপিকে ভোট দিতে চান। বিপরীতে বিএনপি ৪২ শতাংশ ও জামায়াতে ইসলামি ৩২ শতাংশ ভোটে এগিয়ে। উদারপন্থিদের শঙ্কা, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় উগ্রপন্থা বৃদ্ধি পাবে। আর বিএনপিকে অনেক বাংলাদেশিই সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত হওয়া দলটির মতোই দুর্নীতিপরায়ণ ও আত্মতুষ্ট মনে করছেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আইন বিশেষজ্ঞ আরাফাত খান মনে করেন, টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সব বাংলাদেশিকে ঐক্যবদ্ধ করা। বাংলাদেশের দরকার এখন একটি ‘নেলসন ম্যান্ডেলা মুহূর্ত’।