April 22, 2026, 1:19 pm
শিরনাম :
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনেস্কো প্রতিনিধির সৌজন্য সাক্ষাৎ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ঢাকাস্থ জার্মান রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ সংরক্ষিত নারী আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মনোনয়নপত্র জমা চট্টগ্রামে সরকারি সিটি কলেজের ঘটনায় জামায়াতের বিবৃতি মাভাবিপ্রবিতে বিএসি অ্যাক্রেডিটেশন বিষয়ক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত কাঁঠালিয়ায় উৎসবমুখর পরিবেশে এসএসসি ও সমমানের পরিক্ষা শুরু রাজশাহী মেডিক্যালে চিকিৎসা সেবা নিয়ে চরম ক্ষোভ, ইন্টার্নদের কর্মবিরতিতে ভোগান্তি বেড়েছে রাউজানে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বাঘের মেলা’ অনুষ্ঠিত: লোকজ উৎসবে জনস্রোত ফরিদপুরে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিলেন আওয়ামীলীগ কর্মীরা রাজারহাটে মরণব্যাধি ক্যানসার আক্রান্ত শিশু ফাহিম বাঁচতে চায়

বিদায় বেগম খালেদা জিয়া; সেলিম রেজা

সেলিম রেজা

লেখকঃ সেলিম রেজা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সরকার প্রধানের যাত্রা শুরু করেন। মাত্র তিন বছর পর নিহত হোন সপরিবারে। দেশের মাটিতে কবর পেয়েছেন বটে। তবে এক সময়ের গণমানুষের নেতাকে বিদায় দেওয়া হয় অনেকটা নীরবে, নিভৃতে, চাপা আতংকে।

শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের মাটি পেয়েছেন, আড়ম্বরপূর্ণ বিদায়ও পেয়েছেন। কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যু পাননি। আচমকা কিছু বুঝে উঠার আগেই তাঁর দিকে ছুটে এসেছে ব্রাশ ফায়ারের বুলেটের ঝাঁক।

হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ এ হিসেবে ভাগ্যবান। তিনি দীর্ঘ জীবন ও স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকারী ছিলেন। কবরও হয়েছে দেশের বুকে। কিন্তু এককালের প্রতাপশালী এই শাসক এমন এক জীবন বয়ে টেনেছেন, বিদায়কালে ক্ষমতার অংশ হবার পরেও প্রস্থান হলো প্রায় সাড়া শব্দহীনভাবে। যিনি রাস্তায় নামলে এক ব্যাটেলিয়ন আর্মি পুলিশ ছেয়ে যেত রাস্তা, সেই লোকের শেষ যাত্রাকে মানুষ এমনভাবে নিল যেন কিছুই হয়নি, কিচ্ছু ঘটেনি।

তত্ত্বাবধান সরকারের দায়িত্ব ও পরিস্থিতির চাপে কিছু মানুষ স্বল্পকালীন সময়ে সরকার প্রধান ছিলেন। তাঁদেরকে এখানে না টানাই ভালো। একজন অবশ্য ব্যতিক্রম আছেন। খন্দকার মুশতাক। তিনি হাড়ে মাংসে ক্ষমতার স্বাদ কামনা করা মানুষ। অল্পদিনের রাজত্বের পর তিনি সেই যে হারালেন, আর ফিরলেন না। রাজনীতির রঙিন বায়োস্কোপে অনেক নায়ক ভিলেন হলেন, অনেক ভিলেনকে নায়ক করা হলো…সামনে আবার রোল পাল্টাবে, তারপর আবার। কিন্তু খন্দকার মুশতাক মরে গিয়েছিলেন মৃত্যুর আগেই। সম্ভবত বেশিরভাগ মানুষ এই সময়েও জানে না তিনি কবে কখন কোথায় কিভাবে মরেছেন।

প্রায় দুই বছর ক্ষমতা উপভোগ করা ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন জুটি আনঅফিশিয়ালি নির্বাসনে। তাঁদের আর দেশে ফেরার কথা নয়। যদি ফিরেন, যদি এদেশে মারা যান…পত্রিকার শিরোনাম হওয়া ছাড়া খুব বেশি পার্থক্য হবে বলে মনে হয় না।

শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে আছেন ভারতে। অতি নাটকীয় কিছু না ঘটলে তাঁর দেশে ফেরা প্রায় অসম্ভব। স্বাভবিক মৃত্যু ও দেশের মাটিতে কবর বহু পরের আলোচনা।

ক্ষমতায় আছেন ডক্টর ইউনুস। অতল অকূল ভালোবাসা দিয়ে দেশের মানুষ ক্ষমতায় বসিয়েছিল তাঁকে। দেড় বছরের বাস্তবতার পর তাঁর জীবনে সামনে কী ঘটে সেটা সময়ই বলে দেবে।

অর্থাৎ নিজ গুণে হোক, নিজ দোষে হোক বা হোক ভাগ্যের ফেরে…এদেশের কোনো সরকার প্রধানের কপালে একইসাথে স্বাভাবিক মৃত্যু, বেশিরভাগ মানুষের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের সম্মান ও দেশের মাটিতে কবর…এসব ঘটেনি। সামনে ঘটবে কিনা সেটাও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না।

কেবল বেগম খালেদা জিয়া এখানে বিরল এক ইতিহাস ঘটিয়ে ফেললেন।

তিনি হাসপাতালে ডাক্তারদের নিবিড় কেয়ারে থেকে শেষ নিঃশ্বাস টেনেছেন। সরকার শোক ঘোষণা করেছে। একমাত্র পুত্র জানাজায় সামনের কাতারে থাকবেন। সারাদেশ থেকে নেতাকর্মী ও গণমানুষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে এবং জানাবে। কবর হবে স্বামীর পাশে।

এর চেয়ে ভালো শেষ যাত্রা কয়জনের হয়?

রাজনীতিবীদ খালেদা জিয়া নিঃষ্কলুষ ছিলেন না, এটা সম্ভবও না। সাধারণ মানুষ যে চোখে নিষ্পাপ ও ভালো মানুষ কল্পনা করে, জগতে এমন কোনো শাসক থাকা কেবল থিওরটিক্যালিই সম্ভব।

খালেদা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মারা গেলে এমন শ্রদ্ধা পেতেন না। কিছুদিন পরেই ইলেকশন। যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। ততদিন বেঁচে থাকলে তাঁকে ক্ষমতার কিছু পাপের ভার নিতে হতো। আবার বিগত সরকারের সময়ে চলে গেলে তাঁর প্রস্থানকে চেপেচুপে করা হতো আড়ম্বরহীন। বলা বাহুল্য, একমাত্র পুত্রকেও কাছে পাওয়া হতো না।

মৃত্যু যে কোনো সময়েই বেদনাদায়ক। কিন্তু সব হিসেব মিলিয়ে বেগম জিয়া বোধহয় জগতকে বিদায় জানাবার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়টাই পেয়েছেন।

আমাদের দেশে সম্মানের সাথে বিদায় সর্বত্রই বিরল ব্যাপার। প্রবল ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ক্ষমতা চলে গেলে মোসাহেবরা চিরতরে তালাক দিয়ে দেয়। ক্রিকেটাররা পর্যন্ত জানে না কখন বিদায় নিলে ফেয়ারওয়েল পাওয়া যায়। যেখানে যে আছে সবাইকেই টেনে নামাতে হয়। অধিকাংশ পরিবারে বৃদ্ধ বৃদ্ধার মৃত্যুর পর আগত স্বজনদের কাছে গুরুত্ব বেশি পেয়ে যায় তরকারির কোয়ালিটি, ছোট্ট বাবুটার ঠান্ডা লাগার কাহিনী।

খালেদা জিয়া কেমন শাসক ছিলেন ইতিহাস বিচার করবে। ইতিহাস বড়ো নির্মম, সবাইকেই বিচার করে। স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক মৃত্যু, দেশের ভেতরে-বাইরে কবর…এসব আবেগী বিষয় সেই রুক্ষ বিচারে ততটা গুরুত্বপূর্ণ হয় না। ইতিহাসের বিচারে বেগম জিয়া পঞ্চাশ বছর পর কোথায় থাকবেন এখনই বলা মুশকিল।

তবে রাজনীতির জটিল ও কুটিল জগত থেকে যদি আমরা একদিনের জন্য বের হই, যদি বেগম জিয়াকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে দেখা যাবে তিনি একইসাথে ভীষণ দুঃখী ও ভীষণ ভাগ্যবান মানুষ ছিলেন।

তরুণী বয়সেই স্বামীর ঝাঁঝরা দেহের সাক্ষী বিধবা গৃহবধূটিকে কান্না সামলানোর আগে সামলাতে হয়েছে বিশাল এক রাজনৈতিক দলকে। তিনি পঙ্গুপ্রায় এক পুত্রকে নির্বাসিত হতে দেখেছেন। দেখেছেন অন্য পুত্রের মৃত্যু। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাঁকে সইতে হয়েছে নিঃসঙ্গ কারাবরণ।

একই সঙ্গে এই নবীশ গৃহবধূটিই দলের দায়িত্ব নেবার অর্ধযুগের মধ্যেই বনে গেছেন সরকারপ্রধান। মুসলিম বিশ্ব তো বটেই সারা দুনিয়াতেই এটা বিরল ঘটনা। গৃহবন্দী জীবনে মৃত্যু যখন প্রায় নিশ্চিত, আচমকা হলো পটপরিবর্তন। তিনি মুক্ত বাতাসে বের হলেন। তিনি বিদেশ গেলেন। তিনি স্ত্রী পুত্রবধূ ও নাতনীর ভালোবাসায় সিক্ত হলেন।

তারপর সবচেয়ে ভালো সময়ে নিলেন চিরবিদায়। রাস্ট্র যখন নিজের শক্তিকে কেবল কাঠামোতে সীমাবদ্ধ করে ফেলে, তখন সে ভুলে যায় ইতিহাস শেষ পর্যন্ত লিখিত হয় মানুষের অনুভূতিতে, নথিতে নয়।।

বিদায় বেগম খালেদা জিয়া। আপনার আত্মার শান্তি কামনা করি। এদেশে শান্তি আসবে বিশ্বাস হয় না। তাও আশা করি আপনার জীবনের শেষ টুইস্টের মতোই কোনো নাটকীয় জাদুতে দেশে যেন শান্তি নেমে আসে।।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ