July 25, 2026, 3:19 pm
শিরনাম :
মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তালায় জলবায়ু পরিবর্তন, প্রভাব এবং করনীয় শীর্ষক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় অলিম্পিক কোম্পানির ডিলারের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড বাগেরহাটে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ফকিরহাটে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন বাগেরহাট জেলায় শুরু হয়েছে স্মার্ট কৃষক কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ কাঁঠালিয়ায় চলছে কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ রাজপাড়া থানা পরিদর্শনে আরএমপি কমিশনার শ্যামনগরে বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কালীগঞ্জে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

পতাকা তৈরিই তাঁর প্রাণ- লাল- সবুজের সঙ্গেই জীবন কাটানোর অঙ্গীকার

শাহজাহান সিরাজ, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

উপজেলা সদরের কয়রা – খুলনা প্রধান সড়কের পাশে পুরোনো একটি টিনশেড ঘর। বাইরে কাপড় শুকানোর দড়িতে সারি সারি লাল-সবুজ ঝুলে আছে। ভেতরে ছোট একটি সেলাই মেশিন। মেশিনের সামনে বসে আছেন একজন মানুষ-যাঁর জীবনের পরিচয় কেবল একটাই: তিনি আনোয়ার মির্জা বয়স (৬৮) বছর ,পতাকার মানুষ। বয়স পেরিয়েছে বহু আগেই, কিন্তু দেশের পতাকা বানানোর প্রতি তাঁর ভালোবাসা এখনো একই রকম।
তিনি বলেন,

“লাল-সবুজের পতাকা আমার শ্বাস-প্রশ্বাস। এই পতাকার সঙ্গেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চাই।”
পতাকা বানানোর শুরুটা ছিল খুবই ছোট

ছোটবেলা থেকে আব্বাকে সেলাইয়ের কাজে সহযোগিতা করতাম। খুলনার খালিশপুরে আমাদের আদি বাড়ি। খালিশপুর ক্রিসেন্ট জুট মিলের সামনে ছিল আব্বার (মির্জা আফসার উদ্দীন) দর্জির দোকান। বাবার কাজে সহযোগিতা করার করার ফাঁকে ফাঁকে সেলাইয়ের কাজটা শিখে নিয়েছিলাম। প্রথমে শখের বসে এক-দুটি পতাকা বানালেও পরে তা দিনদিন পেশায় পরিণত হয়। স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবস এলেই তাঁর ঘর হয়ে উঠত ব্যস্ততম কর্মশালা। তবে পতাকা বানানোর সঙ্গে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি।

তিনি স্মিতহাস্যে বলেন, “একটা পতাকা বানালে মনে হতো দেশের প্রতি নিজের একটা দায়িত্ব পালন করলাম।”
পতাকা বানানো তাঁর কাছে ইবাদতের মতো

তিনি বলেন,“পতাকা শুধু বিক্রি করি না, আমি গর্ব নিয়ে বানাই। প্রতিটি পতাকা বানানোর সময় দেশকে মনে করি, শহীদদের কথা মনে করি।”

মানুষের ভালোবাসাই তাঁর প্রাপ্তি
এলাকার মানুষের কাছে তিনি এখন “পতাকার মানুষ” বা “পতাকা চাচা”। যে কোনো জাতীয় দিবসের আগে মানুষ তাঁর ঘরে লাইন দেয় পতাকা কিনতে। কেউ দাম না দিলে বা কম দিলে তিনি কষ্ট পান না। “টাকার জন্য পতাকা বানাই না। মানুষ ভালোবাসা নিয়ে আসে, সেই ভালোবাসাই আমার শক্তি।” -গর্বের সুরে একথা বলেন তিনি।

আর্থিক লাভ নয়, দেশপ্রেমই তাঁর জ্বালানি
পতাকা বানিয়ে জীবিকা চলে ঠিকই, তবে তার চেয়ে বেশি আনন্দ পান মানুষের ভালোবাসায়। তিনি বলেন, “অনেকে দাম কম নেয়ার কথা বলে, আমি কষ্ট পাই না। এটা আমার দেশপ্রেমের জায়গা।”

লাল-সবুজ তাঁর কাছে শুধু রং নয়
একটি পতাকা তৈরি করার সময় তিনি অতি যত্ন নেন। কোন কাপড় ব্যবহার হবে, কোন সেলাই কতটা টেকসই-সবই তিনি নিজে দেখেন। তিনি বলেন, “পতাকা কোনো সাধারণ কাপড় না। এটা শহীদের রক্তে রাঙানো। তাই বানানোর সময় হাত যেন থমকে থাকে।”

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ১৬ বছর। নবম শ্রেণিতে পড়তাম। এলাকাতেই ছিলাম। আব্বার দরজির দোকানে দেখতাম মুক্তিবাহিনীর লোকজন আসতেন। কেউ কেউ দোকানে অস্ত্রশস্ত্রও লুকিয়ে রাখতেন। তাঁদের কাছে সারা দেশের যুদ্ধের খবর নিতাম। ১৬ ডিসেম্বর দেশ বিজয়ের খবরও তাঁদের কাছে জেনেছিলাম; কিন্তু সেদিনও আমাদের এলাকা হানাদারমুক্ত হয়নি। পরের দিন ১৭ডিসেম্বর সকালে খালিশপুর গোলচত্বরে স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন করতে গিয়েও পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে একজন শহীদ হন।

পতাকা তৈরির প্রথম সফলতা
সকালের ঘটনার পর চিন্তা করেছিলাম-আমি তো সেলাইয়ের কাজ পারি, আজ নিজেই পতাকা তৈরি করব। তখন তো পতাকায় সবুজের ওপর লাল সূর্যের মধ্যে হলুদ রঙের বাংলার মানচিত্র ছিল। প্রথমবার অনেক চেষ্টা করে তৈরি করলাম। আমার তৈরি করা প্রথম পতাকাটা মুক্তিবাহিনীর লোকজন নিয়ে উড়িয়েছিলেন। সেদিনই খালিশপুর শত্রুমুক্ত ঘোষণা করা হয়।সেই থেকেই জাতীয় পতাকা তৈরি শুরু। স্বাধীন বাংলাদেশে পতাকার বেশ চাহিদাও ছিল। বানিয়ে বানিয়ে বিক্রি করতাম। পাশাপাশি অন্যান্য কাপড় সেলাইয়ের কাজও করতাম।

অতি কষ্টের জীবন
সবকিছু বেশ ভালোই চলছিল। ১৯৮৫ সালে আব্বা মারা যান। সংসারে আরেকটু সচ্ছলতার জন্য বিদেশে যেতে চেয়েছিলাম। এ জন্য দোকানঘর বিক্রি করে তার সঙ্গে আরও কিছু টাকা ঋণও নিই। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সব টাকা এক দালালের কাছে দিয়ে প্রতারিত হই। ঘাড়ের ওপর ঋণের বোঝা আর অসম্মানের সঙ্গে এলাকায় থাকাটা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন। বাধ্য হয়ে পরিবারসহ সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায় চলে যাই। পরবর্তীকালে জমি বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করি। তবে খালিশপুরে আর ফেরা হয়নি। এরপর ২০০১ সালের দিকে কয়রায় চলে আসি। তবে যেখানেই থেকেছি, পতাকা তৈরি করেছি।

জাতীয় পতাকা তৈরি করি মনের তাগিদে
পতাকা সেলাই ও বিক্রি করেই সংসার চলে মির্জা আনোয়ারের । আমার পাঁচ মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। স্ত্রী মারা গেছে ২০১৪ সালে। একমাত্র ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে চাকরি করে। একাই থাকি কয়রায়। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কয়েক কিলোমিটার দৌড়াই। শরীরে কোনো রোগবালাই নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করি মনের তাগিদে। বিক্রি হবে কি হবে না জানি না। না হলেও দুঃখ নেই। ব্যবসা হয় বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইতালি, জার্মানি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা ভালো বিক্রি হয়।

আসছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বিজয় দিবস, বিজয়ের র‍্যালি তাই প্রতি বছরের ডিসেম্বর মাস এলেই মির্জা আনোয়ারের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। সকাল আটটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পতাকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তার। বিভিন্ন আকারের বাংলাদেশি পতাকায় ভরিয়ে তুলছেন দোকান। বছরের অন্য সময় যখন পতাকা বেচাবিক্রি বেশি হয় না, তখন অন্য কাপড়চোপড়ও সেলাই করি; কিন্তু পতাকা বানানোর এই কাজ ছাড়ি না।
আসছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বিজয় দিবস, বিজয় র ্যালি। তাই প্রতি বছরের ডিসেম্বর মাস এলেই মির্জা আনোয়ারের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। সকাল আটটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পতাকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তার। বিভিন্ন আকারের বাংলাদেশি পতাকায় ভরিয়ে তুলছেন দোকান।

মির্জা আনোয়ার বলেন, ‘পতাকা হচ্ছে সম্মান ও গর্বের। এই লাল-সবুজের পতাকার সঙ্গে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই। পতাকা সবাই সেলাই করতে পারে না। সঠিক মাপের পতাকা না হলে আইনি ঝামেলা পোহাতে হয়। আমি দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বৃত্তের সঠিক মাপের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। সর্বনিম্ন ৩ টাকা থেকে ৩০০ টাকা দামের পতাকাও তৈরি করি’।

নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর আহ্বান
নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন,”দেশকে ভালোবাসো, দেশের পতাকাকে সম্মান করো। আমার জীবন চলে গেছে পতাকা বানিয়ে, তোমরা অন্তত পতাকার মর্যাদা রাখো।”শুধু পতাকা বানানো নয়, তরুণদের দেশ সম্পর্কে জানাতেও উৎসাহী তিনি। তিনি চান তাঁর মতো আরও অনেক মানুষ দেশের পতাকা নিয়ে কাজ করুক, দেশের সঠিক ইতিহাস জানুক, সম্মান করুক।

বয়স বাড়লেও লক্ষ্য অটুট
স্বাস্থ্য আগের মতো নেই, চোখেও ঝাপসা দেখে-তবুও কাজ থামান না। জাতীয় দিবসের আগের রাতে কখনো-কখনো ভোর পর্যন্ত জেগে থাকেন।

শেষ কথায় তিনি বলেন, “জীবন কতদিন আছে জানি না। কিন্তু যতদিন আছি, লাল-সবুজের পতাকার সঙ্গেই থাকতে চাই-এইটাই আমার স্বপ্ন, এইটাই আমার শান্তি।”
লাল-সবুজের প্রতি এমন অটুট ভালোবাসা খুব কম মানুষই দেখাতে পারেন। তাঁর ছোট্ট ঘরটিতে প্রতিদিনই তৈরি হয় দেশপ্রেমের প্রতীক, আর তাঁর জীবনই যেন প্রমাণ-একটি পতাকা একজন মানুষের পুরো পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ