পলাশ সরদার এখন এলাকায় ‘বেগুন পলাশ’ নামেই অধিক পরিচিত। ত্রিশোর্ধ পলাশের নামের সঙ্গে ‘বেগুন’ যুক্ত হলো কেন? পাশে তাঁর স্ত্রী শম্পা রাণী এই প্রশ্ন শুনে হাসলেন। পলাশ বিব্রত না হয়ে বরং এক গাল হাসি দিয়ে গর্বের সঙ্গেই বললেন, ‘বেগুন চাষ করে আমার সমৃদ্ধি এসেছে বলেই লোকজন আমাকে এই নামে ডাকেন।’
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা কয়রা উপজেলার ৩ নং কয়রা গ্রামে পলাশের এই সুখ্যাতির গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে ঢুকতেই তা টের পাওয়া গেল। শফিকুল ইসলাম নামের এক যুবকের কাছে পলাশের বাড়ি কোনটা জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘বেগুন পলাশ ? ওই তো, সামনেই!’

কয়রা সদর থেকে পূর্ব দিকে ৩ নং কয়রা গ্রাম। ঐ গ্রামের পিচের রাস্তা দিয়ে একটু সামনে এগুতেই রাস্তার ডান পাশে চোখে পড়ল সাজানো গোছানো এক সবুজ ক্ষেত। একটা বিশাল বাগানে সারি সারি সবুজ লম্বা লম্বা বেগুন গাছ আর তাতে ঝুলছে বড় বড় বেগুন। চারপাশসহ উপরে জাল দিয়ে ঢাকা। চোখজুড়ানো এই মনোহর দৃশ্য যে কাউকে সতেজ করে। কাছে গিয়ে দেখা গেল, পলাশ ও শম্পা দম্পতি পরম যত্নে গাছগুলোর পরিচর্যা করছেন। গাছ থেকে বেগুন ছিড়ে ঝুড়িতে রাখছেন। কয়েকটি বেগুনেই ভরে যাচ্ছিল একটি ঝুড়ি। কারন, একেকটি বেগুনের ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম। পলাশ সরদারের ক্ষেতের একেকটি বেগুনগাছ ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা। প্রতিটি গাছ বলিষ্ট। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। একেকটি গাছে পাঁচ থেকে সাতটি বেগুন ঝুলে থাকতে দেখা গেছে। একেকটি বেগুন ফুটবলের মত। চারজন শ্রমিক কাজ করছে। একই সঙ্গে স্বপ্নপূরনের আশা নিয়ে ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় কয়রায় চাষিরা।
রোদের উত্তাপ থেকে একটু ছায়ার আশ্রয়ে এসে কথা তুলতেই পলাশের মুখ ম্লান হলো। বললেন, ‘জীবনে অনেক কষ্ট করছি, এরপর এখন সাফল্য।’ সেই কষ্ট কেমন? প্রশ্ন শুনেই কপালের ঘাম মুছতে মুছতে পলাশ বলে চললেন সেই কষ্টগাথা।

পলাশ সরদারের বাবা প্রভাস চন্দ্র সরদারের খেয়েপরে পরিবার নিয়ে ভালোই ছিলেন। বাবা মা, ভাইকে নিয়ে চারজনের সংসার চলছিল কৃষির ওপর। প্রায় ছয় একর জমি ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে সর্বনাসা ঘূর্ণিঝড় আইলায় সর্বশান্ত হন।
পলাশ তখন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। বৃদ্ধ বাবার পরিবারে নেমে আসে ঘোরতর দুর্দিন। পলাশের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। সংসারের হাল ধরতে তাঁকে আয়ের পথ খুঁজতে হয়। দারিদ্র্যের সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ করতে করতে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন পলাশ । সর্বনাসা আইলায় ঘরবাড়ি সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বাড়ির উপরে বুক সমান পানি। অবশেষে বাব, মা ও ভাইকে নিয়ে সাতক্ষীরায় চলে আসেন আত্মীয়ের বাড়ীতে। সাতক্ষীরায় খালুর বাড়িতে থাকাকালীন খালুর সাথে কৃষি কাজে সহযোগিতা করতেন। ৩ থেকে ৪ বছর পর আবার ফিরে আসে বাস্তুভিটা কয়রায়। আইলায় ধ্বংসাত্মক বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর পর বাস্তভিটায় কোন রকমে একটি ঘর বেঁধে থাকে। সামান্য কিছু পুঁজি নিয়ে শুরু করেছিলেন সবজির ব্যবসা। কিন্তু বাজারের ওঠানামায় সেই ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও হতাশ হন। দারিদ্র্য যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরপর বিয়ে করে সংসার হয়। সবকিছু সামলাতে গিয়ে হতাশায় নুয়ে পড়ে জীবন।

পলাশ সরদার বলেন, এই যখন অবস্থা, তখন একদিন তাঁর কানে এল এক বিশেষ জাতের বেগুনের গল্প। সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ থানার জয়পত্র কাটি গ্রামের মানুষদের চাষ করা এই বিশেষ জাতের বেগুন নাকি আকারে বড়, স্বাদে অনন্য, আর চাহিদাও ব্যাপক! এই গল্প শুনে কৌতূহল জাগল পলাশের । তিনি খোঁজ নিতে শুরু করলেন এবং জানতে পারলেন, ঠিকঠাক যত্ন নিলে এই বেগুন হতে পারে তাঁর ভাগ্যবদলের চাবিকাঠি। ব্যস, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন- এই সানগ্রো জাতের বেগুন আবাদ করে টিকে থাকার শেষ চেষ্টাটা করবেন।
সেটা ২০২২ সালের কথা। সাতক্ষীরা শশুরবাড়ী লোকজনের কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে প্রথমে বাড়ির ১০ কাঠা জমিতে এই বেগুন চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরেই আশাতীত সাফল্য পান। প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ হয়। ফলন যেমন ভালো, চাহিদাও তেমনি বেশি। সেই যে শুরু আর পেছনে ফিরে তাকাননি পলাশ। ক্রমে জমির পরিমাণ বাড়াতে থাকেন। এখন তিনি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২ একর জমিতে বেগুন চাষ করছেন। এতে প্রতি মৌসুমে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা লাভ করছেন। পলাশের সঙ্গে খেতের পরিচর্যা থেকে শুরু করে বেগুন তোলা, বিক্রি সবকিছুতেই সার্বক্ষণিক সহায়তা করছেন স্ত্রী শম্পা সরদার।

চলতি মৌসুমে আগাম শীতকালীন সবজি হিসেবে ৫ বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন কৃষক পলাশ সরদার। বেগুন চারা খরচ, রোপণ, পরিচর্যা, শ্রমিক খরচ, পোকা দমনের ঔষধসহ খরচ হয়েছে প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার মতো। এ পর্যন্ত বিক্রি করেছেন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। আরও ৫/৭ লাখ টাকার বেগুন বিক্রি হবে।
এ বছর ২ রকম জাতের বেগুন লাগিয়েছি, ৩ বিঘায় সাগ্রো জাতের বেগুন আর ২ বিঘায় থাই গ্রীন বেগুন সব মিলিয়ে ৮ হাজার চারা রোপন করেছি শ্রাবন ১ম সপ্তাহে । সেখান থেকে ৫০ বা ৬০ দিনের মাথায় বেগুন গাছে বেগুন ধরতে শুরু করে। আশ্বিন মাস থেকে তুলতে শুরু করেছি কার্তিক মাস তুলেছি এবং সামনে আগামী ২ মাস অগ্রাহায়ণ ও পৌস মাস বেগুন উঠবে। এখন এক দিন পরপর ৮ থেকে ১০ মণ বেগুন তুলছি।
বেগুন বীজ সম্পর্কে কৃষক পলাশের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সানগ্রো ও থাই গ্রীন দুইটা ইন্ডিয়ান বীজ তবে থাইগ্রিন বীজ থেকে বীজ তৈরি করা যায়। আমি গতবার সানগ্রোর সাথে অল্প কিছু জায়গায় পরিক্ষামূলক চাষ করে ভাল ফল পেয়ে ১০ টা বেগুন বীজ রাখছিলাম এবার সেই বী দিয়ে ২ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। যেমন ফলন ভাল তেমন দাম ও চাহিদা বেশি। পাইকারি দরে প্রতিটি প্রথম দিকে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি করেন পলাশ । বর্তমানে বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে। দাম ও আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামী দুই মাসে অন্তত আরও ১২ থেকে ১৫ হাজার কেজি বেগুন বিক্রি করবেন।

পলাশের এই সাফল্য শুধু তাঁর নিজের জীবন বদলে দেয়নি; বরং আশপাশের কৃষকদেরও অনুপ্রাণিত করছে এই বেগুন চাষে এগিয়ে আসতে। এমনকি এবার ৬ নং কয়রা গ্রামের আশরাফুল মোল্লার পুত্র ইমরান হোসাইন মাষ্টার্স পাশ করে এসে কৃষক পলাশের দেখে তিনি এবার ১ বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন। ভাল ফলন হয়েছে এবং আগামীতে বড় আকারে করবেন। কোন বেকার যুবক উদ্যোক্তা হতে চাইলে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করবেন তারা।
বেগুনের ফড়িয়া, আল আমিন , জানান, কয়রার এ বেগুন স্থানীয়ভাবে কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। কয়রার বেগুন ট্রাক ভরে নামাতে দেরি কিন্তু বিক্রি করতে দেরি হয় না। তারা এ বছর ভালো লাভের মুখ দেখবে বলে জানান।

কৃষক পলাশের সবজি চাষে প্রতিবন্দকতা:
কৃষক পলাশ সরদার বলেন, সবজি চাষে ব্যাপক পানির সেচের দরকার হয়। ডিপ থেকে পানি উঠাতে শিল্পমিটারে আমার বিদ্যুৎ খরচ ১০ থেকে ১২ টাকা ইউনিট পড়ে। আমাকে যদি একটা সেচ মিটার দিত, তাহলে উৎপাদন খরচ কম হত। আরও বেশি করে সবজি লাগাতাম লাভ ও বেশি হত। তিনি বলেন, বহু বার সেচ মিটারের জন্য বিদ্যুৎ অফিসে গিয়েছি তারা বলে কৃষি অফিসে যেতে। কৃষি অফিস বলে আবেদন কর। আবেদন করেও অফিসে ঘুরে ঘুরে না পেয়ে এখন যাওয়া বাদ দিয়েছি।

তবে তিনি সবজি উৎপাদনের সাফল্য ধরে রাখতে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে হয়ে উঠতে পারেন একজন দক্ষ কৃষক।
কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ( ভারপ্রাপ্ত) তরুন রায় বলেন, আগাম সবজি চাষিরা প্রতিবছরই ভালো দাম পান। পরিচর্চা খরচ কম হওয়ায় সব সবজিতেই মালচিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
শীতকালীন বা গ্রীষ্মকালীন- সব সময়ে সবজিসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে কৃষকদের প্রণোদনা, পরামর্শ এবং কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।