July 27, 2026, 2:22 am
শিরনাম :
রাজবাড়ীতে আর্থিক প্রতারণার প্রতিবাদে ও টাকা ফেরতের দাবিতে মানববন্ধন পাথরঘাটায় জেলের ছদ্মবেশী সাংবাদিকের কাছ থেকে নৌ পুলিশের চাঁদা গ্রহণের ভিডিও ভাইরাল বাংলাদেশ প্রেসক্লাব ইউএইর সভাপতিতে সংবর্ধনা ঝালকাঠি জেলা পরিষদে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত তালা হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মচারী সাসপেন্ড খালিয়াজুড়ির মেন্দিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করার অভিযোগ জামালপুরে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন বান্দরবানে সদর ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসনিক ক্ষমতা পেলেন কৃষি কর্মকর্তা চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবুজ বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগে বৃক্ষমেলা উদ্বোধন শ্যামনগরে জলাবদ্ধতায় ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে আছে

রমজানে হল বনাম বাসা- স্বস্তি দিন শেষে মায়ের কাছে ফিরে আসা

ইসরাত জাহান আশা, মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি

পবিত্র রমজান মাসে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- এর (মাভাবিপ্রবি) যেন অন্য এক রূপে ধরা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক চাপ, পড়াশোনার মধ্যে আবাসিক হলগুলোতে থেকে ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবনযাপন করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই হয়ে ওঠে চ্যালেঞ্জিং। সাহরি ও ইফতারের সীমাবদ্ধতা, খাবারের মান ও সময়ের অসামঞ্জস্যতা এর মধ্যে আবার সেমিস্টার ফাইনাল পাশাপাশি পরিবারের সান্নিধ্যের অভাব-সব মিলিয়ে একধরনের অস্বস্তি কাজ করে এখানকার শিক্ষার্থীদের মাঝে।

এমন বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থী রমজানের প্রায় মাঝামাঝি সময় থেকেই বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন। যারা যেতে পারেননি সরকারি আদেশ জারি হবার পর থেকে তাদের মধ্যেও দ্রুত বাসায় ফেরার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বাসায় থেকে রমজান পালন করা অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক ও মানসিকভাবে প্রশান্তিদায়ক। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করা, সাহরিতে পছন্দের খাবার পাওয়া, হলে সবচে বেশি কষ্ট হয় খাবার নিয়ে, পুষ্টিকর খাবারের অভাব মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং ধর্মীয় পরিবেশে সময় কাটানো এসবই তাদের কাছে বাড়তি আনন্দ যোগ করে।

এ বিষয়ে ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স (এফটিএনএস) বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী নুসরাত মিম জানান- ‘ রমজানে হল ও বাসার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। হলে থাকতে হলে পড়াশোনা, ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততার মাঝেই নিজের ইফতার–সাহরি নিজেকেই ম্যানেজ করতে হয়। অনেক সময় বাইরে থেকে কিনে বা নিজের বানানো খাবার খেতে হয়, যেগুলোতে সেই স্বাদ বা তৃপ্তি থাকে না- অনেকটা প্রয়োজনের তাগিদেই খাওয়া। সব কাজ নিজে করতে হওয়ায় বিশ্রামের সুযোগও কম থাকে। রুমমেটদের সঙ্গে ইফতার করলেও পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়ার যে আনন্দ, সেইটার ঘাটতি অনুভূত হয়। সাহরিতে প্রায়ই ঠান্ডা খাবার খেতে হয়, আর হলের একঘেয়ে খাবার ও প্রোটিনের ঘাটতিও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তার ওপর পানি বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলাও থাকে।

অন্যদিকে, বাসায় রমজান অনেকটাই স্বস্তির। ইফতার ও সাহরিতে গরম, পছন্দের খাবার সহজেই পাওয়া যায়, বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ আলাদা আনন্দ দেয়। প্রতিদিন খাবারে ভিন্নতা থাকে, কোনো লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা বা খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে না। সবচেয়ে বড় বিষয়, পরিবারের সঙ্গে একসাথে ইফতার করার আনন্দ রোজার অনুভূতিকে আরও পূর্ণ করে তোলে। সব মিলিয়ে হলে রমজান মানে নিজ দায়িত্বে টিকে থাকা, আর বাসায় রমজান মানে স্বস্তি, তৃপ্তি ও পরিবারের উষ্ণতা।’

একই বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী মার্জিয়া সাদেক মেহুলী জানান,’ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রমজান আর নিজের বাসার রমজান দুটির অভিজ্ঞতা একদমই ভিন্ন। হলের জীবনে প্রথম রমজান মাস পাওয়া ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। এখানে সিনিয়র-জুনিয়র ও ব্যাচমেটদের সাথে একসাথে ইফতার করার আনন্দটা সত্যিই অন্যরকম। সবাই মিলে বসে ইফতার করা, হাসি আড্ডা এসব মুহূর্তগুলো মনে রাখার মতো!
তবে বাসার রমজানের আমেজ একেবারেই আলাদা। বাসায় মায়ের হাতে রান্না, পরিবারের সবাই মিলে সেহরি ও ইফতার করার যে অনুভূতি তা হল জীবনে পাওয়া যায় না। বাসায় সবকিছু নিজে থেকে গুছিয়ে করতে হয় না, মা নিজেই সব যত্ন করে করেন। হলের জীবনে সেই মায়ের যত্নটা খুব বেশি করে মিস করা হয়। আবার হলে বেশিরভাগ সময় বাইরের খাবার কিনে খেতে হয়, যা বাসার খাবারের মতো তৃপ্তি দেয় না।
সব মিলিয়ে, হলের রমজান স্বাধীনতা ও বন্ধুত্বের স্মৃতি তৈরি করে, আর বাসার রমজান ভালোবাসা ও আপনজনদের উষ্ণতায় ভরপুর থাকে।’

এফটিএনএস বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান উর্মি জানান- ‘বাসায় রমজান সবসময়ই আনন্দের। বিশেষ ব্যাপার হচ্ছে মায়ের হাতের সুস্বাদু রান্না যা হলে পাওয়া সম্ভব না।হলে ইফতারি করতে হয় সাধারণ ভাত,সবজি,মাছ, মাংস দিয়ে। মনমতো ইফতারি করতে হলে বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়। আবার বাসায় পরিবারের সবাই মিলে ইফতারি করা হয় যা আনন্দের। হলে কিছু শিক্ষার্থী ডাইনিং এ ইফতার করে,কেউ নিজে রান্না করে খাই। ফলে তেমন আনন্দ থাকে না। একইসাথে রমজানে পড়াশোনা করা কষ্টকর। বাসায় থাকলে নিজের খাবারের কোনো চিন্তা থাকে না,মা বাবা সবকিছু প্রস্তুত রাখেন, এতে পড়াশোনা করতে সুবিধা হয়।কিন্তু হলে যদি খাবারের মিল না নিতে পারি তাহলে চিন্তা করতে হয়,বাইরে থেকে কিনে খেতে হয় নয়তো রান্না করে নিতে হয়।এজন্য পড়াশোনা করা কষ্টকর হয়। বাসায় সবকিছুর সুবিধা তো আছেই। হলে তেমন সুবিধা না থাকলেও খরচ কম হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এভাবেই মানিয়ে নেয়।’

পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান ফুয়াদ জানান- ‘পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে স্বপ্ন পূরণের আশায় বাসা ছাড়লাম, শুরুতে সবকিছুই অনেক মুক্তসাধীন লাগলেও রমজান মাস আসলে বুঝা যায় কতটা বড় স্যাক্রিফাইস করেছি। পরিবার থেকে দূরে থেকে এই সময়ে আসলে কিছুই ভালো লাগে না। মায়ের হাতের ইফতার, পরিবারের সবার সাথে মিলে সেহেরি, এলাকার বন্ধুরা মিলে তারাবির পর আড্ডা সবকিছুই মনে করিয়ে দেয় বাসা থেকে এতো দূরে এসে ভার্সিটির হলে থাকার বাস্তবতা।
হ্যাঁ, এখন মনে হতে পারে তাহলে হলে থাকলে শুধু খারাপ লাগাই কাজ করে? এতো কিছুর পরও হলে থাকার কিছু ভালো লাগা আমার আছে। প্রায় প্রতিদিনই ইফতার পার্টি প্রতিটা হলকে করে রাখে উৎসব মুখর। সিনিয়র জুনিয়রদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় প্রতিদিনই বলতে গেলে ইফতারের দাওয়াত থাকবেই। কখনো বন্ধুরা কখনো সিনিয়র জুনিয়র মিলে একসাথে রুমে বসে মুরিমাখা খাওয়া আর রাতে হলের সামনে ক্রিকেট খেলাতো আছেই। সবকিছুই এই রমজান মাসে পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্টটা কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে দেয়।’

বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের (বিএমবি) ২০২৩-২০২৪ সেশনের শিক্ষার্থী আরজিনা আক্তার নিপা জানান-‘
এই বছর হলে কাটানো আমার প্রথম রমজান, যেখানে কিছু তিক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সারাদিন রোজার পর পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন হলেও পরীক্ষা চলাকালীন নিজে রান্না করা সম্ভব হয়নি, তাই হলের ডাইনিংয়ের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু ইফতার ও সেহরিতে প্রায় প্রতিদিন একই ধরনের খাবার, স্বাদের ঘাটতি ও মানের সমস্যা- সব মিলিয়ে খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। অনেক সময় সেহরি না করেই রোজা রাখতে হয়েছে, ফলে দুর্বলতা, গ্যাস্ট্রিক ও মাথাব্যথার মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে। তাই রমজানে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে হল প্রশাসনের উচিত খাবারের মান ও বৈচিত্র্য।’

একই বিভাগে তার সহপাঠী মো: সাকিল হাসান জানান- ‘বাসায় রমজান মানেই এক ধরনের শান্তি আর ভালোবাসা। পরিবারের সাথে সেহরি খাওয়া, মায়ের হাতে তৈরি ইফতার, এগুলোর আলাদা একটা আবেগ আছে। সময়মতো খাবার পাওয়া, আরামদায়ক পরিবেশ, আর পরিবারের সাথে ইবাদতের সুযোগ- সব মিলিয়ে একটা পূর্ণতা অনুভব হয়। বাসায় বিশেষ করে খাবারের মান নিয়ে টেনশন করা লাগে না, এটা একটা পজিটিভ দিক বাসার। তারাবির নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত-সব কিছুই নিয়মিতভাবে করা সহজ হয়।
অন্যদিকে, হলে রমজান মানে একটু সংগ্রাম আর স্বাধীনতার মিশ্রণ। নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়-সেহরির জন্য উঠা, ইফতার ম্যানেজ করা, ক্লাস-পরীক্ষার চাপের সাথে রোজা রাখা- সবই চ্যালেঞ্জিং। এইবার রমজান মাসে সেমিস্টার পরীক্ষা থাকার কারণে ইবাদতে মনোযোগ দিতে কষ্ট হয়েছে।তার উপর বাজারে সকল পণ্যের দাম উর্দ্ধগতি হওয়ার কারণে অনেক ভেবে চিন্তে বাজার করা লাগে। অনেক সময় খাবারের মান বা সময় ঠিক থাকে না। মাঝে মাঝে এইসব খাবার খেয়ে রোজা থাকা কিছুটা কষ্টকর হয়ে যায়। তবে বন্ধুদের সাথে ইফতার করার আলাদা একটা আনন্দ আছে, যা বাসায় পাওয়া যায় না। এই অভিজ্ঞতা মানুষকে দায়িত্বশীল আর আত্মনির্ভরশীল করে তোলে।’

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী ইবনাত তাকিয়ান জানান- ‘রমজান সবার কাছেই বিশেষ, তবে হল আর বাসায় এর অভিজ্ঞতা বেশ ভিন্ন।
হলে রমজান মানে নিজের ওপর নির্ভর করা।
সেহরিতে নিজে উঠতে হয়, অনেক সময় খাবার সীমিত থাকে।
ইফতার হয় বন্ধুদের সাথে, যেখানে অল্প জিনিসও ভাগাভাগি করে খেতে হয়।
তার ওপর পড়াশোনা আর ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় ইবাদতের জন্য সময় কম পাওয়া যায়।এখানে কষ্ট আছে, কিন্তু সেই কষ্টই ধৈর্য আর মানিয়ে নেওয়া শেখায়।
অন্যদিকে বাসায় রমজান অনেক বেশি স্বস্তির।
পরিবারের ডাকে ঘুম ভাঙে, ইফতারে থাকে নানা রকম পছন্দের খাবার।
সময়টাও একটু গুছানো থাকে, তাই ইবাদতের জন্য আলাদা সময় বের করা সহজ হয়।
পরিবারের সাথে একসাথে নামাজ পড়া মনকে আরও শান্ত করে।
হলে রমজান একটু কঠিন-সময় কম, কষ্ট বেশি, কিন্তু শেখার সুযোগও বেশি।
আর বাসায় রমজান সহজ ও শান্তিপূর্ণ, যেখানে যত্ন আর ভালোবাসা বেশি পাওয়া যায়।’

এনিভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী রিয়া খাতুন জানান-‘ রমজান মানেই সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস। তবে হলে থাকা ও বাসায় থাকা শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হয়। বাসায় পরিবারের সঙ্গে সেহরি–ইফতার, মায়ের রান্না ও আরাম মিলিয়ে থাকে, ইবাদতের পরিবেশও সহজ ও স্বাভাবিক। আর হলে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয় -সময়মতো সেহরি, ইফতার ও পড়াশোনা সবই নিজের উপর নির্ভরশীল। বন্ধুদের সঙ্গে একসাথে ইফতার করার আনন্দ থাকলেও কিছু চ্যালেঞ্জও থাকে। যেখানেই থাকি না কেন, রমজানের মূল শিক্ষা এক-ধৈর্য, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আর এই বরকতকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা।’

একই বিভাগে তার সহপাঠী মো: নাজমুস সাকিব ছিয়াম জানান-
‘হলে আমাদের পরিবারের কেউ থাকে না, শুধু বন্ধু-বান্ধবরা থাকে। ফলে অনেক সময় নিজের মনমতো খাবার খাওয়া সম্ভব হয় না, ডাইনিংয়ের খাবার সবসময় সন্তুষ্টিকর থাকে না। পাশাপাশি চলে ব্যস্ততা আর পড়াশোনা, তাই সবসময় বাসায় ফেরার ইচ্ছে থাকে। অন্যদিকে, বাসায় থাকলে পরিবারের সঙ্গে ইফতার ও সেহরি, মায়ের হাতে তৈরি খাবার, আর পরিবারের সান্নিধ্য—এসব মিলিয়ে সময় কাটে অনেক ভালোভাবে। পরিবার থাকলে মানসিকভাবে শান্তি, আর খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য অনেক বেশি। তাই বাসায় থাকার সময়কে অনেক বেশি আরামদায়ক ও স্মরণীয় মনে হয়।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ