তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, পাঁচ বছরের শিশু সন্তান, ঋণ নিয়ে কেনা একটি ভ্যান—এই ছিল ইব্রাহিমের ছোট সংসারের স্বপ্ন। ভ্যান চালিয়ে দৈনিক আয়ে কোনোমতে চলত সংসার। কিন্তু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড মুহূর্তেই সেই সংসারকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিল। এখন একদিকে স্বামীর লাশের শোক, অন্যদিকে ঋণের চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারের।
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কেরালকাতা ইউনিয়নের সাতপোতা বেড়বাড়ি গ্রামে পোল্ট্রি খামারের দুর্গন্ধ নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশী আরিফের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ইব্রাহিম (২৮)। গুরুতর আহত হন তার বড় ভাই রুহুল আমিন, যিনি বর্তমানে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন।

নিহত ইব্রাহিমের স্ত্রী সুরাইয়া খাতুন জানান, ঋণের টাকা নিয়ে ভ্যান কেনা হয়েছিল, যার কিস্তি এখনও পরিশোধ হয়নি। স্বামীর আয়েই চলত সংসার। এখন স্বামী নেই, সামনে অনাগত সন্তান, ছোট্ট পাঁচ বছরের ছেলে—কীভাবে চলবে তাদের জীবন?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার স্বামী কোনো অন্যায় করেনি। শুধু দুর্গন্ধের কষ্টের কথা বলেছিল। এখন আমি সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাব? ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব? আমি স্বামী হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই, যাতে ঋণ শোধ করতে পারি আর সন্তানদের মানুষ করতে পারি।”
নিহতের মা রাবেয়া খাতুন বলেন, “আরিফ সম্পদশালী ও প্রভাবশালী। তার খামারের দুর্গন্ধে আমরা ঘরে থাকতে পারতাম না। আমাদের গরু-ছাগল তার জমিতে গেলে মেরে ফেলত। সবসময় ভয়ে থাকতাম। রোজা থেকে আমার দুই ছেলে শুধু পর্দা দেওয়ার কথা বলেছিল—এই অপরাধে এক ছেলেকে মেরে ফেলল, আরেক ছেলে হাসপাতালে। আমরা সঠিক বিচার চাই।”
প্রতিবেশী সাবিকুন নাহার বলেন, “এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আরিফের অনেক সম্পদ ও প্রভাব আছে। যদি সে জামিনে বেরিয়ে আসে, তাহলে আমরা নিরাপদ থাকব না। দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে ভবিষ্যতে অন্যায়কারীরা আরও সাহস পাবে। আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”

কলারোয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গভীর জখমের কারণেই ইব্রাহিমের মৃত্যু হয়েছে। আহত রুহুল আমিনকে সংকটাপন্ন অবস্থায় মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি পুলিশ কেস হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
কলারোয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিন হোসেন বলেন, অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু শুধু শোকই বয়ে আনে না—নিয়ে আসে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও। ঋণের কিস্তি, হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়, অনাগত সন্তান—সব মিলিয়ে ইব্রাহিমের পরিবার আজ গভীর সংকটে।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কি দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে? নাকি প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে হার মানবে একটি অসহায় পরিবারের কান্না। এলাকাবাসী ও স্বজনদের একটাই দাবি—ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক, এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হোক।