July 25, 2026, 10:40 pm
শিরনাম :
পবিপ্রবিতে উদয় ভবনের নিলাম অনুষ্ঠিত আগের সরকারের দুর্নীতির তদন্ত করে পরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু যশোরের বাঘারপাড়ায় এনসিপির পথসভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় এস্কাফ সিরাপ জব্দ তালায় টিআরএম বিলের বকেয়া আদায় ও জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে মানববন্ধন প্রান্তিক ভূমিহীন ও মৎস্যজীবীদের কেন্দ্রীয় ভূমি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত পবিপ্রবিতে চাকসু প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় জুলাই অভূত্থান স্মরণে ছাত্রশিবিরের আয়োজনে স্বর্ণপদক প্রদান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রাজশাহী ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন ভূমিমন্ত্রী মেদনী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মাঠে রফিকুল ইসলাম খান

কোলে ভর করে কেন্দ্রে: দাদুর ভোটে জেগে উঠল উপকূলের সকাল

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

খুলনার উপকূলঘেঁষা কয়রা উপজেলা সদরে অবস্থিত মদিনাবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রে সকালটা শুরু হয়েছিল কুয়াশা ভেদ করা নরম আলোয়। কিন্তু দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃশ্যটি ছিল অন্যরকম-দুই তরুণ কাঁধে তুলে কোলে করে নিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ দাদুকে নাতি নাহিন। ৯০ বছর বয়সী মাষ্টার সমির উদ্দীন। ভারে পা কাঁপে, তবু ভোট দিতে এসেছেন নিজে। তবু এবারের নির্বাচনে ভোট দানে বেশ আগ্রহী তিনি। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তাঁর মুখে মৃদু হাসি, কণ্ঠে স্বস্তি-কারন জানতে চাইলে বলেন, “ভোট না দিলে মনটা খালি থাকে।, “বহু বছর পর ভোট দিলাম… মনে হল,আমি এবারই প্রথম ভোটার।

এই দৃশ্য দেখতে থমকে দাঁড়ান অনেকেই। কেউ মোবাইলে ছবি তোলেন, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন। স্থানীয় এক নারী ভোটার বললেন, “এই দৃশ্যটাই তো সাহস দেয়-অধিকার মানে শুধু তরুণদের না, সবার।”

অংশগ্রহণের দিন, মানুষের দিন:
সকাল গড়াতেই কেন্দ্রে ভিড় বাড়ে। নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ-সব বয়সের মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে। পরিবার নিয়ে ভোট দিতে আসার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। অনেকেই বলছেন, “এবার মানুষ শুধু ভোট দিতেই আসেনি, নিজের উপস্থিতি জানাতে এসেছে।”
কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ এক বৃদ্ধা বললেন,”আমাগো কণ্ঠস্বরটাই তো ভোট-কাগজে চিহ্ন, মনে আশা।” এক তরুণ প্রথমবার ভোট দিয়ে বেরিয়ে বললেন,”লাইনে দাঁড়ানোটা কষ্ট না-অধিকারটা পাওয়া বড় কথা।”

মাঝবয়সী এক জেলে ভোট শেষে মন্তব্য করেন, “বাঁধ মজবুত হলে জীবন মজবুত হবে-ভোট তাই দিছি।”
প্রত্যাশার তালিকা দীর্ঘ, কথাগুলো সরল উপকূলের মানুষের আলাপে ঘুরেফিরে আসে তিনটি বিষয়-টেকসই বেড়িবাঁধ, বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন। সুন্দরবনসংলগ্ন এই অঞ্চলে নদীভাঙন আর লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই নিত্যদিনের বাস্তবতা। তাই ভোট যেন শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, জীবিকার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।
স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক বললেন, “ভোটের কালি শুকায়, কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা শুকায় না।”

কোলে ভর করে গণতন্ত্রের পথে
বৃদ্ধ দাদুকে কোলে তুলে আনার দৃশ্যটি দিনভর আলোচনায় ছিল। তার ছেলে মনজুর মোর্শেদ জানালেন, “হাঁটতে পারেন না ঠিকমতো, তবু বললেন-নিজে গিয়ে ভোট দেবেন। আমরা শুধু পাশে ছিলাম।”
বুথ থেকে বেরিয়ে দাদুর শেষ কথা- “আজ মনে শান্তি লাগতেছে… এইটুকুই চাওয়া ছিল।”

কেন্দ্রের আঙিনা পেরিয়ে যখন তাঁকে আবার কোলে তুলে বাড়ির পথে রওনা হলো নাতি ও ছেলে, উপকূলের বাতাসে ভেসে রইল এক সহজ সত্য-গণতন্ত্রের প্রাণ কেবল ফলাফলে নয়, অংশগ্রহণে। কখনও লাঠিতে ভর দিয়ে, কখনও প্রিয়জনের কোলে ভর করে-মানুষই তার শক্তি।

জোয়ারের পানি আর নাগরিক আমানত: দুপুরের পর যখন নদীতে জোয়ারের পানি বাড়তে শুরু করছে, তখনো কেন্দ্রের সামনে লম্বা লাইন। মাইনষের মুখে মুখে একটাই কথা-“বেড়িবাঁধ চাই।” দাদুর মতো অনেক বুড়া-বুড়ি লাঠিতে ভর দিয়া কেন্দ্রে আইছেন। তারা মনে করেন, এই একটা দিনই তারা ‘রাজা’ ভোট দিয়া বাইর হওয়ার সময় দাদুর আঙুলে কালো কালি দেইখা নাতি নাহিন বলেন , “দাদু, এখন তো তুমি জোয়ান হইয়া গেছ!” দাদু হো হো কইরা হাসেন। কইলেন, “জোয়ান তো হইছিই। এই কালি তো কেবল রং না রে বাপ, এইডা হইলো আমাগো জবান।” “আমারে কোলে কইরা লইয়া আইছে নাতি, এইডাই তো গণতন্ত্রের আসল ছবি। বুড়ারা পথ দেখায়, আর জোয়ানেরা কাঁদে কইরা সেই পথে চলায়।”এসব কথা বলেন বৃদ্ধ ভোটার মাষ্টার সমির উদ্দীন (৯০)।

“মরার আগে হক্কের ভোট দিমু”
কেন্দ্রে পৌঁছাইতেই পোলিং অফিসাররা আগাইয়া আইলেন। একজন কইলেন, “দাদু, আপনে ঘরে বইসা থাকলেই তো পারতেন।” দাদু ফকফকা হাসিমুখে জবাব দিলেন, “ও বাজান, ঘরে বইসা থাকলে কি আর পেট ভরব? আমাগো চরের মাইনষের দাবি কে শুনব? নদী ভাঙলে তো আমাগো ঘর যায়, তহন কি আর এই ভোেট মনে থাহে কারো? তাই আইলাম, হক্কের ভোটটা দিয়া নিজেরে জ্যান্ত প্রমাণ করতে।”

উপকূলের গ্রামগুলোতে আইজ এক্কেরে উৎসবের আমেজ। বউ-ঝিরা সাত সকালেই রান্নাবাড়ি শ্যাষ কইরা নাইতে ধুইতে আইসা লাইনে খাড়াইছে। অনেকের কোলে কচি পোলাপাইন। মহারাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে আসা মরিয়ম বিবি আক্ষেপ কইরা কয়, “ভোট আইলে তো বড় বড় কতা হুনায়। কিন্তু আজ দাদুর এই যে কতা, হেইডাই বড়। দাদু না আইলে আমাগো ভোট দেওয়ার শখ জাগত না।

গোবরা ঘাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবনে ভোট গ্রহণ চলছে- একটিতে পুরুষ ও অন্যটিতে নারী ভোটারদের জন্য। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, দুই পাশেই ভোটারদের দীর্ঘ সারি। ভেতরে পোলিং এজেন্টরা ভোটার নম্বর যাচাই করে দুটি করে ব্যালট পেপার দিচ্ছেন-একটি গণভোটের এবং অন্যটি প্রার্থীদের প্রতীকসংবলিত। দুটি ব্যালটে ভোট দিতে গিয়ে ভোটারদের কিছুটা বেশি সময় লাগছে।

নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্রটিতে যান গোবরা গ্রামের মোমেনা খাতুন। তিনিও ভেবেছিলেন, সকাল সকাল গেলে ভিড় কম হবে। কিন্তু এসে অবাক হন। তিনি বলেন, ‘ভাবছিলাম ফাঁকা পামু। কিন্তু দেখি আমাদের আগেই অনেক মানুষ আইছে।’

সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনটি খুলনার সবচেয়ে বড় সংসদীয় আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ৩৩১ জন। আসনটিতে ১৫৫টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ চলছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন প্রার্থী-বিএনপির এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পি (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আসাদুল্লাহ আল গালিব (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মণ্ডল (কাস্তে)।

সকাল সাড়ে আটটার দিকে মদিনানাবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়েও ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ভোটকেন্দ্রে ঢোকার আগেই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের সমর্থকেরা ভোটারদের জন্য পান-সুপারি এনে রেখেছেন। অনেক ভোটার ভোটের আগে সেখান থেকে ভোটার নম্বরের স্লিপ সংগ্রহ করে কেন্দ্রে প্রবেশ করছেন।

মদিনানাবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ইস্তিয়াক আহমেদ বলেন, সকাল থেকেই ভোটারদের চাপ আছে। মনে হচ্ছে, অনেক ভোটার একসঙ্গে ভোট দিতে এসেছেন। ভোটের পরিবেশ ভালো। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যার কথা জানা যায়নি। তাঁর কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৬৬৯ জন। প্রথম ১ ঘণ্টায় ভোট দিয়েছেন প্রায় ৯০ জন।

কয়রা উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীদের এজেন্টরা প্রায় প্রতিটি বুথে উপস্থিত। অন্য প্রার্থীদের এজেন্ট তেমন চোখে পড়েনি। একই সঙ্গে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীদের পক্ষে ভ্যানগাড়িতে করে ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসতেও দেখা গেছে।

সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে পুলিশ ও আনসারের পাশাপাশি বিজিবি, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে হচ্ছে। ভোটারদের নিশ্চিন্তে কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ