বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর ২০২৫) উৎসবমুখর পরিবেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের বাঘাইছড়ি উপজেলা ও পৌর শাখার দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ১০টায় কাচালং সরকারি ডিগ্রি কলেজ অডিটোরিয়ামে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক মোঃ আবু তাহের। প্রধান আলোচক ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব মোঃ আলমগীর কবির।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আনিসুজ্জামান ডালিম, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সালমা আহমেদ মৌ, স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা।
সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয়, জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি অধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে নাগরিক পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছে। ভবিষ্যতেও সংগঠনটি পার্বত্য এলাকার জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কাজ করে যাবে।
বক্তারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তিনিই সর্বপ্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সম্প্রদায়ের একক জাতিগত ও সাংবিধানিক পরিচয় প্রদান করেছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই এ দেশে ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের সূচনা করেন।
তারা বলেন, যদি সে সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমিহীন বাঙালিদের পুনর্বাসন না করতেন, তাহলে বিদেশি শক্তির সহায়তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী একটি গোষ্ঠী চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারত। তিনি যদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত বাঙালিদের পার্বত্য এলাকায় পুনর্বাসন না করতেন, তবে আজ এই অঞ্চল জুমল্যান্ডে পরিণত হতো।
বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, ভূমি কমিশন আইন বাতিল করতে হবে। কারণ এই ভূমি কমিশনে যারা আছে তারা কেউই পার্বত্য এলাকার বাঙ্গালীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তাদের দাবি—১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি একটি ‘কালো চুক্তি’, যার ফলে পাহাড়ে এখনও অস্ত্রের ঝনঝনানি চলছে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ৩৬ হাজার খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার একটিতেও বিচার হয়নি। অবিলম্বে সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
বক্তারা বলেন, পাহাড়ের বাঙালিরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভূমির অধিকারে বঞ্চিত। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক, তাই সমান অধিকার আমাদের প্রাপ্য। ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ৭ জন নিহত হন, যার বিচার আজও হয়নি এবং নিহত পরিবারের পুনর্বাসনও সম্পন্ন হয়নি।
১৯৯৭ সালের তথাকথিত শান্তিচুক্তিকে ‘কালো চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে বক্তারা দাবি করেন, অবিলম্বে এই চুক্তি বাতিল করতে হবে। তারা বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে পাহাড়ের কয়েক লক্ষ বাঙালিকে উপেক্ষা করে এই কালো চুক্তি সম্পাদন করেছে। এর ফলে বাঙালিরা চাকরি, শিক্ষা ও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, এই কালো চুক্তির পর পাহাড় থেকে যেসব সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেগুলো অবিলম্বে পুনঃস্থাপন করতে হবে। কারণ, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
তারা জোর দাবি জানান, পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সেসব সংগঠন নিষিদ্ধ করতে হবে। বক্তারা বলেন, “আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। দেশের যেকোনো প্রান্তে অবাধ চলাচল ও সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করার অধিকার আমাদের আছে—রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে।”
সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ইঙ্গিত করে বক্তারা বলেন, ভারতের মদদে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করতে সক্রিয় রয়েছে। তারা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভারতের যোগসাজশে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে আবারও সংগ্রামে নামতে প্রস্তুত নাগরিক পরিষদ।
সম্মেলনের শেষে বাঘাইছড়ি উপজেলা নাগরিক পরিষদের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। নবগঠিত কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মোক্তার হোসেন সোহেল, সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবছার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক রাফসান হোসেন মাসুদ এবং অর্থ সম্পাদক মোঃ আয়ুব আলী মনোনীত হন।
অন্যদিকে, বাঘাইছড়ি পৌর নাগরিক পরিষদের সভাপতি হিসেবে মোঃ মহিউদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মোঃ নুরুজ্জামানকে মনোনীত করা হয়।