অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রমজানের পূর্বেই দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য। নির্বাচনের পর তিনি আবার তার আগের কাজ—উন্নয়ন কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সামাজিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ফিরে যাবেন।
মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ভিডিও কলে আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
ড. ইউনূস আইএমএফ প্রধানকে জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে। তিনি বলেন, “আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতিতে অটল।”
আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ড. ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে বিপর্যয়ের মুখে ছিল, সেখান থেকে স্বল্প সময়ে ঘুরে দাঁড়ানো অভূতপূর্ব। তিনি মন্তব্য করেন, “অধ্যাপক ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এটি তার দূরদর্শী নেতৃত্বেরই প্রমাণ।”
আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়। ড. ইউনূস জানান, তার সরকার ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন এক অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, যা ছিল বিধ্বস্ত। কিছু ব্যক্তি আক্ষরিক অর্থেই ব্যাংক থেকে ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। এর প্রভাব এখনও কাটেনি।”
অর্থনীতির সেই সংকটকালীন পরিস্থিতি স্মরণ করে আইএমএফ প্রধান বলেন, “আপনার অর্জন আমাকে মুগ্ধ করেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আপনি এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। যখন অবনতির ঝুঁকি ছিল সর্বোচ্চ, তখন আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন। আপনি সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তি।”
ড. ইউনূসও স্মৃতিচারণ করে বলেন, নিউইয়র্কে গত বছরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সময় আইএমএফ প্রধানের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেই বৈঠক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
আলাপচারিতায় আইএমএফ প্রধান বাংলাদেশের ইতিহাসের এই সংকটময় সময়ে সাহসী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন এক অমূল্য মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হলে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।”
এ সময় আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ এবং অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার। তারা ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের বিষয়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নেওয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলো, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বস্ত করতে চাইছে যে, তারা কোনোভাবেই নির্বাচন বিলম্ব করবে না। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটিও অব্যাহত থাকবে।