সাতক্ষীরার গণমুখী মাঠে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় ক্ষমতায় গেলে লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা, ইনসাফের রাষ্ট্র গড়তে দাড়িপাল্লায় ভোট চান জামায়াত আমির।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের অর্থ যারা আত্মসাৎ করেছে, তাদের কাছ থেকে কঠোরভাবে সেই সম্পদ উদ্ধার করা হবে। চাঁদাবাজি, জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী সব সময় ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে এবং দেশের শান্তির পক্ষে অবস্থান নেবে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরা শহরের গণমুখী মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ যদি গণতন্ত্রের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে দাড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেন, তবে বাংলাদেশে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি অপরাধ ও অন্যায় করা হয়েছে সাতক্ষীরার মানুষের সঙ্গে। দেশের আর কোনো জেলায় এমন জুলুম-নির্যাতনের চিত্র দেখা যায়নি। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বুলডোজার দিয়ে নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে অনেককে আয়না ঘরে নেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এসব মানুষের অপরাধ কী ছিল।
২০১৫ সালের সফরের স্মৃতিচারণ করে জামায়াত আমির বলেন, সে সময় তিনি সাতক্ষীরায় এসে ৪৫ জন শহীদের পরিবারের খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন। যেসব মা–বাবা সন্তান হারিয়েছেন, যেসব নারী বিধবা হয়েছেন এবং যেসব শিশু বাবার অপেক্ষায় দিন কাটিয়েছে—তাদের কষ্ট তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হয়ে আসছে এবং এই জেলার সঙ্গে সৎ মায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সাতক্ষীরাকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান কেড়ে নেন—এই বিশ্বাস থেকেই তারা রাজনীতি করে আসছেন।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনৈতিক দল। দলের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে, অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা হয়েছে। তবুও জামায়াতে ইসলামী প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, মুক্তির পর সবাইকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না—এমন নির্দেশ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সাতক্ষীরাসহ সারা দেশে জামায়াতের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি কিংবা অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়ায়নি।
মদিনা সনদের আদলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো এবং দায়িত্ব অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা হবে।
ভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভোট মানে দুটি পথ—হ্যাঁ এবং না। হ্যাঁ মানে স্বাধীনতা, আর না মানে পরাধীনতা। তিনি সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে দাড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
জনসভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরোয়ার। তিনি বলেন, দেশ আজ দুর্নীতি, মাদক ও চাঁদাবাজিতে ছেয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দাড়িপাল্লা প্রতীকের বিজয়ের মাধ্যমে সেই পরিবর্তনের সূচনা হবে।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে জামায়াতের নেতাকর্মীদের খুন, গুম, নির্যাতন ও বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও জামায়াতে ইসলামী প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, নারীদের প্রতি কোনো ধরনের নির্যাতন সহ্য করা হবে না। ছাত্রশিবির সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে নৈতিকতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে দুই শতাধিক ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কোনো ডাকসু কমিটি তাদের পূর্ণ মেয়াদেও করতে পারেনি।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম। এছাড়া ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত এই জনসভায় মেডিকেল টিম, অ্যাম্বুলেন্স, সুপেয় পানি ও সুশৃঙ্খল যাতায়াত ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়।