সুন্দরবনের গা ঘেঁষে দক্ষিণ বেদকাশির এই গ্রামটায় বছরে একবার বন আর মানুষের দূরত্বটা যেন একটু কমে আসে।এই গ্রামে বন মানে শুধু জীবিকা নয়, বন মানে ভয়। সেই ভয়কে সঙ্গী করেই প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথমে বসে বনবিবির মেলা। এখানে এটি কোনো সাধারণ মেলা নয়-এটি জীবনের মেলা, ভয় আর বিশ্বাসের মেলবন্ধন।
ভোর থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। কাঁচা মাটির থান পরিষ্কার করা হয়, বনবিবির প্রতীক সাজানো হয় কলাপাতা আর লাল সিঁদুরে।মাটির উঁচু ভিটায় বনবিবির আসন। মাটির বেদিতে বনবিবির নারীমূর্তি। পাশে ভাই শাহ জঙ্গলি, গাজী আউলিয়া, শিশু দুঃখে এবং ধনাই-মনাই। একটু দূরে দক্ষিণ রায়ের প্রতীকী বাঘ। ধূপের গন্ধে আর পুথি পাঠের ছন্দে মুখর চারপাশ। এক কোণে বাঁশের চাটাইয়ের উপরে বসে বয়স্ক ফকির পুথি খুলে পড়ছেন-
“বনবিবি মা, অরণ্যের রানী
তোর দয়াতেই বাঁচে এই জানি
আমরা গরিব মানুষ চোর নই চোর
জাল দিয়া মাছ ধরি, মধু নিয়া আসি
বাঘে নে খাস, জলে নে ভাসাইস,
দিনশেষে ঘরডায় ফিরাইস।”
এই ছন্দে মন্ত্র নেই, আছে ভয় আর দরকষাকষি। নৌকা বাঁধতে বাঁধতে জেলে সুজিৎ বললেন, “এই বন মানুষরে ছাড়ে না। তাই আমরা ছন্দে ছন্দে কথা কই। মা-রে কই-আমাগো কামডা করবার দে, জানডা নে নিস।” পুজার জায়গাটা ছোট্ট-মাটির থান, পাশে কাঁচা কাঠে খোদাই করা বনবিবির চিহ্ন। সামনে কলা, গুড় আর একমুঠো চাল। কিন্তু মানুষের ভিড় বড়।
বৃহস্পতিবার খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন চরামুখা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। হিন্দু সমাজের মানুষের কাছে বনবিবি অরণ্যের দেবী, যাঁর কৃপা ছাড়া বনে পা দেওয়া যায় না-এই বিশ্বাসেই মেলার দিন সকাল থেকেই নদীপথে নৌকা ভিড়তে থাকে। কেউ আসেন পাশের চর থেকে, কেউ সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা গ্রাম থেকে। মাথার ওপর গামছা, হাতে ছাতা, চোখে একরাশ ভরসা-বনবিবির থানকে ঘিরে জমে ওঠে মানুষের ঢল। বাঘ, কুমিরসহ সব হিংস্র প্রাণী তাঁর অনুগত। তাই প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়রার সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে হয় বনবিবির পূজা ও মেলা।এ মেলা চলবে সপ্তাহব্যাপী।
শনিবারে দুপুরে কয়রার চরামুখা গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে উৎসবের রং। মেলার ভেতরে আছে হাট-বাঁশের জিনিস, মাটির হাঁড়ি, কাঠের খেলনা, মিষ্টির দোকান। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বেশি ভিড় বনবিবির থানের সামনে। কেউ মানত করেন, কেউ সন্তানের নামে দোয়া চান, কেউ আবার ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা ঝুলিয়ে রাখেন। কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ঘেঁষে বনবিবির মন্দির, সামনে খোলা মাঠজুড়ে মেলার আয়োজন। মন্দিরে নারী-পুরুষের ভিড়। কেউ পুঁথিপাঠ শুনছেন, কেউ প্রসাদ নিচ্ছেন, কেউ নীরবে প্রার্থনায় মগ্ন। প্রার্থনা শেষে মানুষ ঢুকছেন মেলা প্রাঙ্গণে। মন্দিরের সামনের মাঠ আর বেড়িবাঁধের পাশে দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাজিয়েছেন পসরা-খাবার, খেলনা, মৃৎশিল্পসহ নানা পণ্যে জমজমাট বেচাকেনা।
বনবিবি মন্দিরের সভাপতি ভোলানাথ মাঝি বলেন, চরামুখা গ্রামে ১২৮৩ বঙ্গাব্দ থেকে প্রতিবছর পয়লা মাঘে বনবিবির পূজা ও মেলা হয়ে আসছে। বনবিবি সুন্দরবন উপকূলের বনজীবীদের মনে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক। বনে গিয়ে যেন নিরাপদে ফেরা যায়, ভালো আয় হয়- এই কামনাতেই আদিকাল থেকে এই পূজা হয়।
মন্দির থেকে বেরিয়ে কথা হয় স্থানীয় বনজীবী সুভাষচন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, জঙ্গলে ঢুকলেই বুকডা ধকধক করে-বাঘে ধরব, না কুমিরে টানব, সেই ঠিক নাই। তখন বনবিবির নাম মুখে আনলে মনে জোর পাই। আমরা বিশ্বাস করি, বাঘ-কুমির সবই মা বনবিবির হুকুম মানে।

আমাগের বাপ-দাদার আমল থেইকাই এই বিশ্বাস চলে আসটিছে। কেউ যদি লোভে পড়িয়া বেশি কিছু নিতে চায়, জঙ্গলের নিয়ম না মানে, তখনই বিপদ নামে। আর সৎ মনে, নিয়ম মানিয়া কাজ করলে মা বনবিবি রক্ষা করেন। তাই বনবিবি মানে শুধু পূজার দেবী না-তিনি আমাগের ভরসা, সাহস আর বাঁচার অবলম্বন। জঙ্গল আর মানুষের মাঝখানের হিসাবটা তিনিই রাখেন।
স্থানীয় জেলে সুব্রত বাইন বললেন, “এই মেলাডা না হইলে মনে শান্তি পাই না। বনে যাওনের আগে মায়েরে দেখাইয়া যাই। কই-মা, মাছ দিস, কিন্তু জানডা নে নিস।”
চরামুখা বনবিবি মেলার অন্যতম আয়োজক স্বরূপ মাঝি বলেন, একসময় এই এলাকায় বাঘের অত্যাচার ছিল। তখন তাদের বংশের পূর্বপুরুষ মধু মাঝি স্বপ্নে বনবিবির নির্দেশ পান পূজা দেওয়ার। সেই থেকেই মন্দির স্থাপন ও মেলার সূচনা। তিনি বলেন, ‘বংশপরম্পরায় আমরা এই আয়োজন করছি। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে যুগ যুগ ধরে এই উৎসব চলছে। মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে এই দিনের জন্য।
স্থানীয় জেলে রনজিৎ বললেন, “এই মেলাডা না হইলে মনে শান্তি পাই না। বনে যাওনের আগে মায়েরে দেখাইয়া যাই। কই-মা, মাছ দিস, কিন্তু জানডা নে নিস।”
মউয়াল মনিসা বিবি বললেন, “মধু তুলতে গেলে বুক কাঁপে। এই মেলাডায় আইসা মানত করি। কই-মা, বাঘের চোখ ঘুম পাড়াইয়া রাখিস।”
গ্রামের জেলে দীপংকার মন্ডল বললেন, “আমরা বনে যাই পেটের দায়ে। বাঘ-কুমিরের লগে যুদ্ধ কইরা কেমনে বাঁচমু? তাই কই-মা বনবিবি, তুই থাকলে আর কিসের ভয়?”
স্থানীয় এক শিক্ষক বললেন, “এটা শুধু ধর্মীয় মেলা নয়। এটা উপকূলের মানুষের টিকে থাকার দর্শন। রাষ্ট্র যেখানে দূরে, বনবিবিই সেখানে শেষ আশ্রয়।”
সন্ধ্যা নামলে থানের সামনে প্রদীপ জ্বলে ওঠে। শেষ ছন্দে সবাই একসঙ্গে বলে ওঠেন-
“মা বনবিবি, দয়া করিস, বনের পথে যাইয়া যেন হারাইয়া না যাই।
স্থানীয় লোকজন বলেন, “বাপ-দাদার সময় থেইকা এই মেলা। ভয় থাকবই, কিন্তু ভয় নিয়া বাঁচাই তো আমাদের কপাল। এই ছন্দটাই শক্তি।
মউয়াল অরুুন বললেন, “মধু তুলতে গেলে বুক থরথর করে। এই মেলাডায় আইসা কই-মা, মধু দিস, কিন্তু আমারে বাঘের মুখে দিস না।
মেলার রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা ক্যামেরা দেখে স্থানীয় এক তরুণ বললেন,
“আমরা খবরের কাগজে আসি বাঘে মারলে। কিন্তু বাঁচার সময় কেউ দেখে না। এই পুজাটাই আমাদের বাঁচার খবর।”
মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়ানী গ্রামের শিবপদ মণ্ডল বলেন, ‘আমাগের গ্রামে ১০০ বছরের বেশি সময় ধইরে এই পূজা হয়ে আসটিছে। আগে সুন্দরবনের ভেতর গিয়ে বনবিবির থান বানায়ে পূজা হুতো। কিন্তু এখন গ্রামেই আয়োজন করা হচ্ছে। শত শত মানুষ নিয়ে বনে ঢোকা এখন বড্ড ঝুঁকির কাজ।’
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন অঞ্চলে বনবিবিসহ আরও কাহিনি প্রচলিত ছিল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার আগমনের মধ্য দিয়েই সন্দরবনে
অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার আগমনের মধ্য দিয়েই সুন্দরবনে বনবিবি-সংক্রান্ত কাহিনির বিকাশ ঘটে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বনজীবীদের কাছে বনবিবি হয়ে ওঠেন সুন্দরবনের রানি ও অভিভাবক।