সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোক সভায় বক্তারা আবেগঘন ভাষায় বলেছেন, ‘আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক গভীর বেদনাবিধুর মুহূর্তে। এই শোক কেবল একজন মানুষের বিদায়ের শোক নয়—এটি একটি যুগের অবসান, একটি সংগ্রামী অধ্যায়ের সমাপ্তি, একটি আপসহীন কণ্ঠের নীরব হয়ে যাওয়া।’
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশের বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে খুলনা মহানগর বিএনপির উদ্যোগে নগরীর শহীদ হাদিস পার্কে এ নাগরিক শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শোক সভায় ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বক্তারা আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বাতিঘর। আজ সেই বাতিঘরের আলো নিভে গেছে, কিন্তু তাঁর দেখানো পথ কোনো দিন হারিয়ে যাবে না। ইতিহাস তাঁকে স্মরণ রাখবে আপসহীন নেতৃত্ব, অদম্য সাহস, ত্যাগ ও জনগণের অধিকারের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হিসেবে।
তারা বলেন, একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার যে অনন্য ইতিহাস, বেগম খালেদা জিয়া তা নিজের জীবন দিয়ে রচনা করে গেছেন। তিনি ক্ষমতার মোহে রাজনীতিতে আসেননি; ইতিহাসের নির্মম ডাকেই তাঁকে নেতৃত্বের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হারানোর শোক তাঁকে ভেঙে দেয়নি—বরং সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিপীড়িত মানুষের আশ্রয়স্থল ও গণতন্ত্রকামী মানুষের ভরসার নাম।
সভায় খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এডভোকেট শফিকুল আলম মনা সভাপতিত্ব করেন।
শোক সভায় বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল বলেন, স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু, কারাগারের নির্যাতন, অবরোধ, মামলা-হামলা—কিছুই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মাথা নত করাতে পারেনি। কারণ তিনি জানতেন, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু জনগণের ভোটাধিকার ও মানুষের অধিকার চিরন্তন।
তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি। ক্ষমতায় থাকুন কিংবা বিরোধীদলে—সবসময় তিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়কের মতো দৃঢ় ও মর্যাদাবান। দীর্ঘ অসুস্থতা, বন্দিত্ব আর অবিচারের কঠিন অধ্যায়েও তিনি নত হননি—এই দৃঢ়তাই তাঁকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।
সভায় সাবেক সংসদ সদস্য, খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি ছিল মানুষের ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের রাজনীতি। এই আদর্শ বুকে ধারণ করাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
নাগরিক শোক সভায় শোক প্রস্তাব পাঠ করেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন। মহানগর ওলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা আবু নাঈমের পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া শোক সভায় আরও বক্তব্য রাখেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মনিরুজ্জামান মনি, খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, ড্যাব খুলনার সভাপতি ডা. রফিকুল হক বাবলু, খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সভাপতি রাশিদুল ইসলামসহ মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সভায় অন্যান্য বক্তারা বলেন, আজ দেশনেত্রী আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর ত্যাগ, সাহস ও সংগ্রাম আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত জাগ্রত রাখবে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন খালেদা জিয়া থাকবেন—মানুষের অধিকার রক্ষার এক অবিনশ্বর প্রতীক হয়ে। এই নাগরিক শোক সভা থেকে আমরা অঙ্গীকার করছি—গণতন্ত্র, ন্যায় ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার দেখানো পথে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাব।
শোক সভা শেষে মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।