September 27, 2026, 1:15 pm
শিরনাম :
বাগেরহাটে বিএনপি নেতার সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে এমপি জিলানীর আলোচনা সভা কোটালীপাড়ায় ফের বহিষ্কার হলেন যুবদল নেতা সুজন কালীগঞ্জ থানা কমিউনিটি পুলিশের বালক কাবাডি দল সেমি ফাইনালে ময়মনসিংহে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য র‌্যালি মাভাবিপ্রবিতে ডুমুরভিত্তিক অ্যান্টিডায়াবেটিক ফাংশনাল ফুড ও ট্যাবলেট উদ্ভাবন বাগেরহাটে শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার কয়রায় শিক্ষার পথে সেতু নেই, আছে শুধু ভেলা বাগেরহাটের মোল্লাহাটে ৭ বছরের শিশুকে গলা কেটে হত্যা, আটক ৩,অভিযুক্তের বাড়িঘরে আগুন ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে-এটিএম কামরুল ইসলাম

কয়রায় শিক্ষার পথে সেতু নেই, আছে শুধু ভেলা

শাহজাহান সিরাজ, স্টাফ রির্পোটার

এক হাতে ভিজে যাওয়ার ভয়ে শক্ত করে ধরা বইয়ের ব্যাগ, অন্য হাতে ভিজে যাওয়া ড্রামের ওপর রাখা কাঠের পাটাতনের তক্তা। রশি টেনে টেনে বাঁশের ভেলাটাকে নদীর ওপারে নেওয়ার চেষ্টা করছে একদল খুদে প্রাথমিক শিক্ষার্থী। জোয়ারের ঘোলা জল যখন উপচে ওঠে, তখন কাঠের পাটাতনেও ঢেউ আছড়ে পড়ে। ভাঙা বাঁধে থমকে যাওয়া ১৭০ মিটারের শাকবাড়িয়া বন্ধ নদী যেন উপকূলের শিশুদের জন্য এক রোজকার আতঙ্কের নাম।

কেউ যাচ্ছেন মাদ্রাসায়, কেউ বিদ্যালয়ে। কেউ আবার নদীতে মাছ ধরতে, কেউ প্রয়োজনীয় কাজে, কেউবা ছুটছেন ঐতিহ্যবাহী সুতির হাটে। কিন্তু সবার পথের মাঝেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রায় ১৭০ মিটার দীর্ঘ এক ভাঙা বাঁধ। সেখানে নেই কোনো সেতু, নেই নিরাপদ সড়ক। আছে শুধু ড্রামের তৈরি একটি ভেলা। রশি ধরে টেনে সেই ভেলায় চড়ে শাকবাড়িয়া বদ্ধ নদীর জলপথ পার হতে হয়।

খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এই বাঁধটি ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১৭ বছর। সময়ের সঙ্গে ক্ষত সারেনি, বরং ভাঙা অংশটি এখন ছোট নদীর মতো হয়ে গেছে। একদিকে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামিল মাদ্রাসা ও মহিলা দাখিল মাদ্রাসা; অন্যদিকে রয়েছে ফরেস্ট স্টেশন ও ঐতিহ্যবাহী সুতির হাট। ফলে শুধু শিক্ষার্থী নয়, প্রতিদিন এই পথ ব্যবহার করেন কয়েক গ্রামের মানুষ, জেলে, ব্যবসায়ী ও বনজীবীরাও।

গাঙে পানি বাড়লে শিশুগোলোর স্কুলে যাওয়া নিয়া থরথর করে কাঁপে অভিভাবকদের বুক। পবনা গ্রামের এক অভিভাবক হোসনেয়ারা খাতুন স্বগোতোক্তির সুরে আঞ্চলিক কণ্ঠে বললেন, “ছাওয়া-পাওয়ালির স্কুলে পাইঠাইয়া পেটের মধ্যি সোঁ সোঁ করে। এই তো সেদিন ভেলা উল্ট্যা মোর মেয়েডা গাঙে পইড়ে গেল। পাশের লোক ছিল বইলে কোনোমতে চুলে ধইরে তুলল, নাহলে তো গাঙের টানে ভাসে যাইত! আমরা কোনো বড় রাস্তা চাহি না, শুধু ছাওয়ালগো স্কুলে যাওয়ার পথডা সোজা কইরে দিক সরকার।”

বইয়ের ব্যাগের সঙ্গে ভয়ও বয়ে নেয় শিশুরা
নদী পার হতে হতে আতঙ্কের কথা শোনায় প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমীদ হোসেন। সে বলে, “রোজ এই ড্রামের ভেলায় চড়ে গাঙ পার হইতে হয়। ঢেউ একটু বেশি হইলে ভেলা দুলতে থাকে, তখন পেটের ভেতর ভয় সেঁধায়। কখন যেন ভেলাডা উল্ট্যা যায়! আমরা তো পড়ালেখা করতে চাই, আমাদের জন্য একটা নিরাপদ রাস্তা বানানো কি খুব কঠিন?”
​একই ভয় তাড়িয়ে বেড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট ছোট শিশুদেরও। সাানজিদ আক্তার নামের এক শিশু শিক্ষার্থী বলে, “একবার গাঙে পইড়ে মোর সব বই-খাতা ভিজে লাল হয়া গেছিল। স্যারেরা নতুন বই দেওয়ার পর এখন ব্যাগডা মাথার ওপর ধইরে পার হই, খুব ভয় করে।”

মাদ্রাসা, বন স্টেশন, হাট—সব পথের মাঝেই ভাঙন
শুধু পড়াশোনা নয়, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবী, জেলে ও স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীদেরও এই ভোগান্তির শেষ নেই। প্রতিদিন সুতির হাটে মাছ নিয়ে যান পবনা এলাকার জেলে বিজন মণ্ডল। বিরক্তি আর আক্ষেপের সুর তাঁর কথায়, “গাঙে সাইজ মাইরে মাছ ধইরে হাটে নিয়া যাওয়ার সময় এই একটা জায়গায় আইসে আঁটকে যাই। ভেলায় মাছের খাচা, জালের গাটরি তুললে ভিজে একসার হয়। কোনো দিন ভেলা কাত হয়ে মাছ জলে পইড়ে লোকসান হয়। ১৭ বছর ধইরে এই কষ্টের বিচার কেউ দিল না।”

​সুতির হাটের চা-দোকানি আবদুস সাত্তার বলেন, “হাটের দিনে দূর-দূরান্তের মানুষ ভেলায় আইসে ভিড় করে। রশি ছিঁড়ে গেলে চলাচল পুরো বন্ধ। বাঁধডা বাঁধলে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যি একটু গতি পাইত।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ঐতিহ্যবাহী সুতির হাটে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসেন। হাটের সঙ্গে কৃষিপণ্য, মাছ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কেনাবেচা জড়িত। কিন্তু যোগাযোগের এই দুরবস্থার কারণে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়কেই বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়।

হাটে ব্যবসায়ী মোকছেদ আলী বলেন, আজকে প্রতাপ স্মরনী মঠবাড়ি এই খালে বাঁধ না হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী সুতির হাট টি মরতে বসেছে।ভেলায় রিক্স নিয়ে কোন বড় ব্যবসায়ী হাটে যেতে চায় না ঠিক তেমনি ক্রেতারাও এই হাট পরিবর্তন করেছে। তাই এই হাট কে বাঁচাতে এবং ক্রেতা বিক্রেতাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেলার পরিবর্তে সেতু নির্মাণ হবে আবারও সুতির হাটের প্রাণ ফিরে পাবে।

অভিভাবকদের আতঙ্ক, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা
ভোগান্তির মাত্রা যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিতে থাবা বসিয়েছে, তা নিশ্চিত করলেন প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রণজিৎ কুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আইলায় বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় পার হতে হয়। “দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় পার হয়ে স্কুলে আসছে। এ কারণে অনেক অভিভাবক দূরে হলেও অন্য স্কুলে সন্তানদের পাঠাচ্ছেন। বর্ষায় উপস্থিতির হার একবারে কমে যায়। আমরা দ্রুত এখানে একটি স্থায়ী বাঁধ বা বিকল্প সেতুর জোর দাবী জানাচ্ছি।
মঠবাড়ি গ্রামের এক ছাত্রের অভিভাবক প্রিতিশ কুমার মন্ডল বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কাছেই। অথচ শুধু একটি নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। আমরা চাই দ্রুত একটি স্থায়ী সমাধান।’

ফরেষ্ট স্টেশনের পাশে আরেক অভিভাবক ইয়াছিনের ভাষায়, ‘বাচ্চারা লেখাপড়া করে ভবিষ্যৎ গড়বে। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার পথেই যদি তাদের ঝুঁকি নিতে হয়, তাহলে অভিভাবকের ভয় থাকবেই।’

‘বাঁধ হলে কয়েক গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ কমবে’
স্থানীয় বাসিন্দা আঃ সামাদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্কদের তখন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।

মহারাজপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ মোল্লা বলেন, ১৭০ মিটারের বেশি ভাঙা অংশ ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য বরাদ্দ দিয়ে সংস্কার করা সম্ভব নয়। জায়গাটি গভীর ও বড়। একটি ভাসমান সেতু কিংবা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা গেলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে।

স্থানীয়দের দাবি, এখানে একটি স্থায়ী বাঁধের সঙ্গে নিরাপদ সড়ক নির্মাণ করা হলে শুধু বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগই কমবে না; ফরেস্ট স্টেশন, সুতির হাট ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগও সহজ হবে।

১৭ বছর ধরে শুধু আশ্বাস
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন বাঁধটি পরিদর্শন করা হয়েছে। বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ নির্মাণ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তবে স্থানীয় মানুষের প্রশ্ন,

আইলার সেই ভাঙন যদি ১৭ বছর পরও শিশুদের স্কুলযাত্রার পথে থাকে, তাহলে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে একটি নিরাপদ পথের জন্য?
তাদের প্রত্যাশা, ড্রামের ভেলা নয়—একদিন এই জলপথের ওপর তৈরি হবে একটি নিরাপদ সেতু; বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শিশুরা ভয় নয়, স্বপ্ন নিয়ে বিদ্যালয়ের পথে হাঁটবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেজ