জ্ঞানচর্চার নীরব প্রাঙ্গণ হঠাৎই যেন রঙে, সুরে আর উচ্ছ্বাসে জেগে ওঠে পহেলা বৈশাখের স্পর্শে। বছরের প্রথম দিনটি এসে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে রূপ দেয় এক অনন্য মিলনমেলায়- যেখানে পাঠের চাপ, ক্লাসের ব্যস্ততা সবকিছু ছাপিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায় বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ও তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্য। লাল-সাদার আবহ, ঢাকের তালে তালে এগিয়ে চলা আনন্দ, আর মুখভরা হাসিতে ভরে ওঠা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে এক জীবন্ত ক্যানভাস- যেখানে নববর্ষ মানেই নতুন করে নিজেকে, নিজের শিকড়কে খুঁজে পাওয়ার এক গভীর আহ্বান।
এ বিষয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বলেন- জ্ঞান অর্জন বলতে আজ আমরা বুঝি শুধু গতানুগতিক ধারার পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনা। কিন্তু ভুলে যায় সেখানে মনেরও সমন্বয় দরকার। মনের আনন্দ ও উৎফুল্লতা দরকার যা একমাত্র সম্ভব আনন্দ উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে। বর্ষবরণের মাধ্যমে আমরা ভুলে যাই পুরনো দিনের সকল রাগ, অভিমান, হিংসা, অনুতাপ। বয়ে আনি এক বুক নতুন স্বপ্ন আর আশা।


তেমনি আজ এই জ্ঞান অর্জনের পবিত্র অঙ্গনে আয়োজিত হচ্ছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাই,”মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা।
অগ্নি স্নানে সূচি হোক ধরা।”
এই আমাদের প্রত্যাশা।
শুভ নববর্ষ।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হলের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান উর্মি বলেন- বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক সুষম সমন্বয়ের প্রতীক।বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদান ও গবেষণার ক্ষেত্র নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেরও অন্যতম কেন্দ্র। নববর্ষের আগমনে ক্যাম্পাস যখন উৎসবের রঙে রাঙিয়ে ওঠে, তখন তা আমাদের একাডেমিক জীবনের একঘেয়েমি দূর করে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।
বর্ষবরণ উপলক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে যে সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সম্মানের বন্ধন গড়ে ওঠে, তা শিক্ষা-প্রক্রিয়াকে আরও মানবিক ও অর্থবহ করে তোলে। একই সঙ্গে এ আয়োজন শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগী করে এবং তাদের মধ্যে নান্দনিকতা ও সামাজিক সচেতনতার বিকাশ ঘটায়।এর ফলে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও সজীব ও আনন্দময়, যা আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আবার মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈমুল ইসলাম সাগর জানান-
জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বছরের আগমন ঘিরে বইছে উৎসবের আমেজ। বর্ষবরণ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা যায় আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের ঢেউ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন আয়োজনে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। এ আয়োজন শুধু আনন্দের নয়, বরং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও এক অনন্য প্রকাশ। নতুন বছরের বার্তা নিয়ে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হয়।
বর্ষবরণের এই আয়োজন তাই কেবল উৎসবের ক্ষণিক উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক স্থায়ী অনুরণন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাণবন্ত প্রাঙ্গণে প্রতিটি হাসি, প্রতিটি গান, প্রতিটি রঙ যেন বয়ে আনে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের ছাপ। তারুণ্যের হৃদয়ে বপন করে যায় নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসার বীজ। এভাবেই জ্ঞানচর্চার আঙিনায় উৎসবের এই আবাহন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেবে বাঙালিয়ানার আলো- নিরবচ্ছিন্ন, অনিঃশেষ।