ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটেনি তখনো। গ্রামের রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম, দোকানপাটও বেশির ভাগ বন্ধ। সেই নীরবতার ভেতর দিয়েই বের হয়ে পড়েন, কারও হাতে ব্যাগ, কারও কাঁধে কাজের সরঞ্জাম। মুখে কথা কম, চোখে ক্লান্তি বেশি। তাঁরা-দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ফেরিওয়ালা। কারও চোখে ঘুম, কারও চোখে দুশ্চিন্তা। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই বের হতে হয়। কারণ, খাইটে খাতি না হইলে সংসার চলে না।
একজন শ্রমজীবী মানুষ বলছিলেন, “আমাগের খাইটে খাতি লাগে। ঘরে বইসা থাকলে চুলায় হাঁড়ি চড়ে না। তাই কষ্ট কইরাই বাইর হইছি।” কথাগুলো বলার সময় তাঁর গলায় কোনো নাটকীয়তা নেই, কথার ভেতর অভিযোগও নেই, আছে শুধুই বাস্তবতার স্বীকারোক্তি।
এই বাস্তবতা প্রতিদিনের। অসুস্থ শরীর, অনিশ্চিত পরিস্থিতি বা ঝুঁকি-কিছুই তাঁদের আটকে রাখতে পারে না। কারণ, এক দিনের কাজ বন্ধ মানে এক দিনের খাবার অনিশ্চিত। সংসারের মানুষজন অপেক্ষা করে থাকে সন্ধ্যার দিকে, আয় নিয়ে ফেরা একজন মানুষের দিকে।
অন্য একজন শ্রমজীবি মানুষ বলেন, শীত আইছে মানেই সবার কাছে আরাম না। কারও কারও জন্য শীত মানে কষ্ট আরেকটু বাড়ায় ।”শীত গরম বুঝি না ভাই। পেটের দায়ে কষ্ট কইরা এই শীতেও কাম করতে লাগি। ভোরের বাতাস গায়ে লাগে ছ্যাঁকা দিয়া। গায়ের জামাটা পাতলা, তবু বাইর হইতেই হয়।

হিমেল হাওয়ার দাপটে কাঁপছে কয়রা। আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে জেলায় সর্বনিম্ন। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৯ শতাংশ। কয়রা উপজেলায় অবস্থিত প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সোমবার একই সময়ে জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আর্দ্রতা ৯৯ শতাংশ। বাতাসের আর্দ্রতা পরিবর্তন না ঘটলেও এক দিনের ব্যবধানে জেলায় তাপমাত্রা নেমেছে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা আর উত্তরের হিমেল হাওয়ার তীব্রতা বেড়েছে, এ কারণে তুলনামূলক বেশি ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে।
গতকাল মধ্যরাত থেকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা কমে আসায় যানবাহনগুলো আজ সকালে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করে। শৈত্যপ্রবাহের কাছাকাছি আবহাওয়ার কারণে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সকাল সকাল কুয়াশা ভেদ করে ভ্যান নিয়ে আকবর আলী মোড়ল কয়রা সদরে কাঁচামালের আড়তের মাল নিতে শ্রীরামপুর গ্রামে আঃ হালিম নামক কৃষকের বাড়ীতে ওলকপি ও বেগুন আসেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইজ খুপ জাড় লাগজে। মনডা বলচে, না খ্যাতার ভিতরতি উটি, বাইরি বের হই। গরিব মানুষ, আমাগের খাইটে খাতি হয়, তাই কষ্ট কইরে বের হইচি।’
শীতের তীব্রতা গতবারের তুলনায় এবার বেশি দাবি করে গ্রাজুয়েটস মাধ্যমিক বিদ্যালযের নৈশপ্রহরী আঃ রশিদ গতকাল রাতে বলেন, ‘অ্যারাম জাড় অনেক দিন লাগিনি। জাড় এভাবে বাড়তি থাকলি সামনের দিনগুনু কীভাবে রাত পার কইরবো- সেইডেই বড় চিন্তা।’
এদিকে কুয়াশার কারণে যানবাহনগুলোকে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়।কয়রা থেকে খুলনাগামী বাস চালক বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘২০ বছর ধইরে গাড়ি চালায়। এবারডা কুয়াশা এটু বেশি। ঘন কুয়াশার কারণে রাতির বেলা অনেক ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতি হচ্চে। ঠিক সুমায় পৌঁচানো যাচ্চে না। দিন যত বাড়চে, শীত আর কুয়াশার জন্যি কষ্ট বাড়চে।’
বেলা ১০টার দিকে রাস্তার পাশে বস্তার ওপর বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আঃ রাজ্জাক গাজী। তিনি বলেন, ‘অ্যাতো শীতি মানুষ কীভাবে বাঁচে? পাতলা কাপুড় গায় দি রাতি ঘুম আসে না। রোদও ঠিকমতো ওটে না যে রোদ পুয়াবো। জাড়ে খুপ কষ্ট পাচ্চি। শুনচি সরকার নাকি কোম্বল দেচ্চে, আমাগের পইযন্ত আসপে কি না জানিনে।
শীতের মৌসুম শুরুর পর থেকে বাড়ি বাড়ি জ্বর-কাশি-ডায়রিয়াসহ শীতজনিত রোগের প্রকোপ বেড়ে গেছে। ৭০ বছর বয়সী মইফুল বেগম বলেন, ‘কয়দিন ধরে জ্বর। তারওপর শীতি বাঁচা মুশকিল হয়ে যাচ্চে। এটা গরম কাপুড়ও নেই যে গায় দি শীত তাড়াব।’
শ্রীরামুর গ্রামের কৃষি শ্রমিক মোমরেজুল ইসলাম ( মটতেজ) এর সঙ্গে কথা হয়। মোমরেজুল বলেন, ‘দিন য্যাতো যাচ্চে শীত ততই বাড়চে। হাতমাত অবাশ হয়ে যাচ্চে। কুয়াশার মদ্দি এত কষ্ট করে এতদূরতি আসার পর যদি কাজ না হয়, ক্যারামডা লাগে বলেন।’
শ্রমিক শফিকুল ইসলাম ( রাঙা) বলেন, “আমাগো কষ্ট শরীরের না, মাথার ভেতর। চিন্তা থাহে-আজ যদি আয় না হয়, কাল কী হইবো?” কথাটা বলার সময় তিনি রাস্তার দিকে তাকাইয়া থাকেন, যেন উত্তরটা সেখানেই লুকানো।
কারণ, পেটের দায় বড় শক্ত। এই দায় মানুষরে কষ্ট সহ্য করতে শেখায়, ঝুঁকি নিতে শেখায়, আর নীরবে লড়াই করতে শেখায়। এই লড়াইয়ের কোনো পোস্টার নাই, কোনো স্লোগান নাই-আছে শুধ একখানা সত্য।
ভ্যান চালক হারুন বলেন, “হাত-পা শক্ত হইয়া যায়। তাও চালাইতে হয়। আজ চালাইলাম না তো আজ খাইমু কী?” প্রশ্নটার কোনো উত্তর নাই, আছে শুধু বাস্তবতা।
এই মানুষগুলার জীবন খুব সাধারণ, তাই হয়তো চোখে পড়ে না। কিন্তু গ্রামের প্রতিটা সকাল শুরু হয় তাঁদের দিয়াই। তাঁরা না থাকলে বাজার জমে না, কাজ শুরু হয় না, গ্রাম জাগে না। দিনের শেষে কেউ দুই-চারশ টাকা নিয়া ঘরে ফেরেন, কেউ বা খালি হাতে। তবু পরদিন আবার শীত, আবার ভোরের আবার বের হওয়া। কারণ, পেটের দায় মানুষরে থামতে দেয় না। শীত কবে যাবে, কষ্ট কবে কমবে-এই প্রশ্নগুলার উত্তর তাঁরা খোঁজেন না। তাঁরা শুধু জানেন, আজ কাম করতেই হবে।
পেটের দায়ে কষ্ট করে এই শীতেও কাম করতে লাগি-এইটাই আমাগের জীবন, আমাগের লড়াই।
কয়রা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ২৫ ডিসেম্বর থেকে তাপমাত্রা ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকে। এ দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মঙ্গলবারের আগে গত দেড় মাস ধরে তাপমাত্রা ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিজুল ইসলাম জানান, সূর্য না ওঠায় এবং উত্তরের ঠান্ডা বাতাস ও কুয়াশার কারণে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে।সামনে আগামী ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ঘন কুয়াশা ঢাকা থাকতে পারে।