দেখতে যেমন সুন্দর, খেতে তার চেয়ে বেশি সুস্বাদু। খুব সহজেই গ্রামের নারীরা তৈরি করে থাকেন। প্রায় প্রতিটি সবজি বা মাছ রান্নায় দিলে বেড়ে যায় স্বাদ। বলছি কুমড়ো বড়ির কথা।
শীতের সকালটা গ্রামে আসলেই হেই আলাদা লাগে । রাইতের কুয়াশা ঠিকমতো কাটে নাই, এর মাঝেই উঠোনে রোদ আইসা পড়ে। বাঁশের চাটাই পাতা হয়, পাশে কুমড়ো, ডাল আর মসলার হাঁড়ি। এক এক ঘর থেইকা নারিরা আইসা জড়ো হয়। শুরু হয় কুমড়ো বড়ি দেওয়ার কাম। এই কামটাই আজো গ্রামে গ্রামে বাঁচাইয়া রাখছে এক সময়ের অতি পরিচিত স্বাদ।
আগে তো শীত আইলেই হেই কাম। ঘরে ঘরে বড়ি দিতো। এখন দিন বদলাইছে। বাজারে সব পাওয়া যায়, মানুষও ব্যস্ত। তাও গ্রামের মাইয়াগো হার মানে নাই। তারা কয়, “আমাগো মায়ের হাতের স্বাদ কি আর বাজারে পাওয়া যায়?” একজন গৃহিণী কইলেন, “আমাগো মা-নানি যেভাবে শিখাইছে, আমরা সেইভাবেই এখনো কুমড়ো বড়ি দেই।
ভোর বেলাতেই কাম শুরু হয়। কেউ কুমড়ো কুটে, কেউ ডাল বাটে শিলপাটায়। হাতের গতি দেখলে বুঝা যায়, কতদিনের অভ্যাস। এক মাই বলতেছিল, “এই বড়ি না দিলে শীতই আসে না। আমাগো ঘরে এইডা থাকলেই মন ভরে।” বাজারের বড়ি যেমন স্বাদ দেয় না, নিজের হাতে বানানো বড়ি আলাদা স্বাদ দেয়।” মহারাজপুর গ্রামের মনজিলা বেগম এমন কথা কইতে কইতেই ফাঁকে ফাঁকে তিনি বড়িগুলা রোদে সাজাচ্ছেন যত্ন সহকারে। এই সাধারণ দৃশ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গ্রামবাংলার এক সময়ের পরিচিত স্বাদ, যা হারিয়ে যেতে বসেছিল, সেই স্বাদ আজো বেঁচে আছে নারীদের হাত ধরেই।
গ্রামের একাধিক বৃদ্ধ মায়েরা বলেন,কুমড়ো বড়ি দিয়া রান্না করলে তরকারির স্বাদ বদলাইয়া যায়। মাছের ঝোল হোক আর শাক-সবজি, বড়ি পড়লেই আলাদা মজা। শহরে থাকা ছাওয়ালগোর লাইগা তাই আলাদা করে বড়ি বানাইয়া রাখা হয়। শীত শেষ হইলে সেই বড়ির হাঁড়ি শহরে যায়, আর লগে যায় গ্রামের গন্ধ আর মায়ের মায়া।
এখন সমস্যা হইতেছে নতুন প্রজন্ম নিয়া। অনেক মাইয়াই আর এই কাম শিখতে চায় না। তবু কিছু মা এখনো মাইয়াগো পাশে বসাইয়া শেখায়। কয়, “আমরা না থাকলে এই কাম শিখাইবো কে?” কেউ কেউ আবার মোবাইলে ছবি তোলে, কথা লিখে রাখে-যেন এই স্বাদ একদম হারাইয়া না যায়।
মহারাজপুর গ্রামের কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগর মৌসুমি খাতুন বলেন, বড়ি তৈরির আগের দিন বিকালে ডাল ঝেড়ে, ধুয়ে ভিজিয়ে রাখেন তারা। সন্ধ্যায় চাল কুমড়া ছিলে ভেতরের নরম অংশ ফেলে মিহিকুচি করে রাখেন। এরপর কুমড়া খুব ভালোভাবে ধুয়ে নেন, যেন এর টক ভাব না থাকে। ধোয়া হলে পরিষ্কার পাতলা কাপড়ে বেঁধে সারারাত ঝুলিয়ে রাখেন। এতে কুমড়ার সব পানি বেরিয়ে ঝরঝরে হয়ে যায়। পরের দিন ভোরে ডালের পানি ছেঁকে, ভালো। বড়ি তৈরির আগের দিন বিকালে ডাল ঝেড়ে, ধুয়ে ভিজিয়ে রাখেন তারা। সন্ধ্যায় চাল কুমড়া ছিলে ভেতরের নরম অংশ ফেলে মিহিকুচি করে রাখেন। এরপর কুমড়া খুব ভালোভাবে ধুয়ে নেন, যেন এর টক ভাব না থাকে। ধোয়া হলে পরিষ্কার পাতলা কাপড়ে বেঁধে সারারাত ঝুলিয়ে রাখেন। এতে কুমড়ার সব পানি বেরিয়ে ঝরঝরে হয়ে যায়। পরের দিন ভোরে ডালের পানি ছেঁকে, এরপর সেই ডালগুলো পাটায় পিষে পেস্ট তৈরি করা হয়। এরপর চালকুমড়ার কুচি, পরিমাণ মতো পাঁচফোড়ন গুঁড়া ও সামান্য কালোজিরা দিয়ে উপকরণগুলো একসঙ্গে মিশ্রণ করে অনেকক্ষণ ধরে মাখাতে হয়।
তারপর একটি বাটিতে পানি নিয়ে তাতে বড়ির আকারে একটু ফেলে পরীক্ষা করে নেন। যদি দেখেন বড়ি ভেসে উঠছে এবং পানিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে না তাহলে বুঝে নেন আর ফেটতে হবে না। আর ডুবে গেলে কিংবা ছড়িয়ে গেলে আরও ভালো করে মাখান। সব শেষে চড়া রোদে চাটি বা কাপড় বিছিয়ে বড়ির আকার দিয়ে একটু ফাঁকা ফাঁকা করে বসিয়ে শুকাতে দেন বড়িগুলো। তিন থেকে চার দিন এভাবে রোদে শুকানোর পর শেষ দিন বড়ি উঠিয়ে কাপড়ে ঝুলিয়ে শুকান। ভালোভাবে বড়ি শুকানো হলে পরিষ্কার এয়ারটাইট বয়ামে ভরে রাখেন সারা বছর রান্নায় ব্যবহার করার জন্য।
শীতের রোদে উঠোনে শুকাইতে থাকা কুমড়ো বড়িগুলা শুধু খালি খাবার না। এইগুলা গ্রামের নারিদের পরিশ্রম, স্মৃতি ও ভালোবাসার প্রতীক আর গর্ব এবং গ্রাম বাংলার এক টুকরো ইতিহাস। কুমড়ো বড়ি বানাইয়া তারাই আজো গ্রামীণ ঐতিহ্য আগলাইয়া রাখতেছে।এই স্বাদ, এই আয়োজন টিকিয়ে রাখতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন গ্রামের গৃহিণীরা। তাঁদের হাত ধরেই হয়তো আগামী প্রজন্মও একদিন বলবে-শীত মানেই কুমড়োর বড়ি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহিনুর রহমান বলেন, গ্রামের পিছিয়ে পড়া অনেক মেয়েরা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে শ্রম দিয়ে অনেক বছর ধরে এ কুমড়ো বড়ি তৈরি কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এক কেজি কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে প্রায় ১৫৫ টাকা মত খরচ হচ্ছে। আর বাজারে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। এতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি আয় করা সম্ভব হবে।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকতর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, “শীত মৌসুমে এই উপজেলার নারীরা কুমড়ো বড়ি তৈরি করে বাড়তি আয় করে থাকে। গ্রামীণ নারীরা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পৃষ্টপোষকতা পেলে তারা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, এখন কয়রা উপজেলার গ্রামের বধূরা খুব আগ্রহ নিয়ে কুমড়ো বড়ি তৈরি করছেন। তারা ঘরে বসেই এই মৌসুমী খাবার তৈরি করে সংসারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। অনেক নারী স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তাদের দক্ষতা আরো বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরো জানান, কুমড়ো বড়ি এখন শুধু একটি পারিবারিক খাবার নয়, এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণের উদাহরণ হয়ে উঠেছে।