সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া শাকবাড়িয়া নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে চারটি সিসি পিলার আর সিঁড়ির একটা ভাঙাচোরা ধাপ। জোয়ার আসতেই থৈথৈ নোনাপানির নিচে তলিয়ে যায় স্বপ্নের সেই অবয়ব। খুলনার কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের কেওড়াকাটা এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার এই সরকারি উদ্যোগ দেড় বছর ধরে এভাবেই নদীর পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে।১ কোটি ৬ লাখ টাকার বেশি প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ অনেক আগেই ফুরিয়ে গেলেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের অপার রূপ ও উপকূলের জীবনগাথা পর্যটকদের সামনে ফুটিয়ে তুলতে কেওড়াকাটার প্রায় ২০ একর জমিতে একটি আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রের পরিকল্পনা করা হয়। এর মূল আকর্ষণ হিসেবে নদীর তীরেই তৈরি হওয়ার কথা চারতলা উঁচু একটি ওয়াচ টাওয়ার। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের মে মাসেই শেষ হয়ে গেছে। অথচ দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সৈয়দ জিয়াউল হক কাজের অগ্রগতি ঝুলিয়ে রেখেছে প্রাথমিক পর্যয়েই।
"ট্যাকার অভাবে কাম বন্দ, মোদের স্বপ্নও পানির তলে"
প্রকল্পের কাজ থমকে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। তারা জানান নিজেদের আক্ষেপের কথা—
মো. শফিকুল ইসলাম (স্থানীয় বাসিন্দা): “সুন্দরবনের গাও ঘ্যাঁষা এই শাকবাড়িয়া নদীর পাড়ে যদি পর্যটনডা ঠিকঠাক হইত, তয় কয়রাডা চাঙ্গা হয়া উঠত। কত দূর-দূরান্তির মাইনষ আসত, ছোটখাটো দোকানপাট দিয়ে মোদের ঘরের পোলাপানগুলোরও একটা গতি হইত। কিন্তু দ্যাহেন, নদীর পানিতে পিলারের গোড়া ডুবে রইছে, আর ঠিকাদার কয় ট্যাকা পাওয়া যাচ্ছে না। দেড় বচ্ছর পার হয়া গেল, সরকারি ট্যাকার এই রাম হাল! আমরা চাই জট মিটায়া কামডা যেন তড়িঘড়ি শেষ করা হয়।”
আশিকুজ্জামান (প্রতিষ্ঠাতা, আইসিডি): বলেন, “আমরা সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বারবার বলছি, স্থানীয় অর্থনৈতিক চাকা ঘোরাতে এই কেওড়াকাটা প্রকল্প বড় ভূমিকা রাখবে। ঠিকাদার ৪৯ লাখ টাকার মতো কাজ করে বিলের অভাবে কাজ বন্ধ রেখেছেন বলছেন। জেলা প্রশাসন ও এলজিইডি-র উচিত সমন্বয় করে দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা করা। তবে শুধু কাজ চালু করলেই হবে না, লোনা পানির ধাক্কা সামলাতে ওয়াচ টাওয়ারের গুণগত মান নিশ্চিত করাটাও জরুরি।”
বন বিভাগ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মতামত
এই পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়েও সামনে এসেছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি:
কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ লুৎফর রহমান বলেন, “আমাদের এলাকায় এই ধরনের একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে কেবল অর্থনৈতিকভাবে কয়রা সমৃদ্ধ হবে না, বরং সুন্দরবন দেখতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও এখানে হবে। কিন্তু কাজের এই দীর্ঘ স্থবিরতা পুরো উদ্যোগটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমরা চাই দ্রুত জটিলতা কেটে স্থানীয় সরকার এখানে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনুক।”
স্থানীয় বন বিভাগ সূত্র: সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এলাকায় এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তারা মনে করেন, বনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক চলাচলের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্ব দেওয়া দরকার। পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো তৈরিতে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখাও সমানভাবে জরুরি।
অর্থ ছাড়ের গ্যাঁড়াকলে কোটি টাকার প্রকল্প
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ১৯১ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পটি ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ১৫৯ টাকায় লটারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে মেসার্স সৈয়দ জিয়াউল হক।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জিয়াউল হক জানান, ওয়াচ টাওয়ার ও পাইলিং সংক্রান্ত কাজে ইতোমধ্যে তাদের প্রায় ৪৯ লাখ টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়ায় তারা নতুন করে আর কাজ এগোতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক ছাড় মিললেই ফের পুরোদমে কাজ শুরু করবেন বলে তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে কয়রার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাফিন শোয়েবও অর্থ বরাদ্দের জটিলতার কথা স্বীকার করে জানান, অর্থ ছাড়ের ফাইল চূড়ান্ত হলেই ঠিকাদারকে আবার কাজে ফেরানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল বাকি বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করা হয়েছে জানিয়ে বলেন, আশা করছি অর্থায়নসংক্রান্ত যে আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন করে কেওড়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রকে একটি পরিপূর্ণ অবকাঠামোয় রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।