জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর নিত্যসঙ্গী। দুই পায়ে তেমন শক্তি নেই, চলাফেরার জন্য ভরসা একজোড়া বগলদাবা লাঠি। তবু জীবনযুদ্ধে থেমে যাননি সোহাগ হোসেন। অন্যের অনুকম্পায় নয়, নিজের শ্রম, মেধা ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে তাঁর ছোট্ট উদ্যোগ—নিজের তৈরি সুস্বাদু কেক বিক্রির দোকান।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর হাজীপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহাগ। তিনি মোহাম্মদ আলী হালদারের ছেলে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর চলার পথকে কঠিন করে তুললেও জীবনের কাছে হার মানতে নারাজ এই তরুণ। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে যেতে চান নিজের লক্ষ্যের দিকে।
বর্তমানে নূরনগর বাজারের সর্বজনীন দুর্গামণ্ডপসংলগ্ন সড়কের পাশে একটি অস্থায়ী দোকান গড়ে তুলেছেন সোহাগ। সেখানে বিক্রি করছেন নিজের বাড়িতে তৈরি নানা ধরনের সুস্বাদু কেক। ছোট পরিসরে শুরু করা এই উদ্যোগই তাঁর কাছে কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ। ক্রেতাদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোহাগের এই পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর পরিবার। বিশেষ করে বড় বোন শারমিন সুলতানা এবং বাবা-মা তাঁকে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। তাঁদের সহায়তায় বাড়িতেই তৈরি হচ্ছে কেক, যা নিয়ে বাজারে বসছেন সোহাগ।
পরিবারের সহযোগিতার কথা তুলে ধরে সোহাগ বলেন, “বাড়িতে নিজেরাই মানসম্মত কেক তৈরি করি। এ কাজে আমার বড় বোন শারমিন সুলতানা এবং বাবা-মা সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করছেন। তাঁদের নিরলস সমর্থন না থাকলে এত দূর আসতে পারতাম না।”
তবে ছোট্ট এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন রয়েছে তাঁর। নিজের কর্মসংস্থানকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন দক্ষতা অর্জন করে জীবনে আরও এগিয়ে যেতে চান তিনি। এ জন্য সরকার কিংবা কোনো সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন সোহাগ। তাঁর আশা, এককালীন আর্থিক সহায়তা অথবা কম্পিউটার বিষয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে নিজের কর্মজীবনের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে পারবেন। গড়ে তুলতে পারবেন উন্নত ও স্বনির্ভর জীবন।
সোহাগের গল্প কেবল একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণের জীবনসংগ্রামের গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও পরিবারের ভালোবাসায় ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়েরও গল্প। যেখানে অনেক প্রতিকূলতা মানুষকে থামিয়ে দেয়, সেখানে সোহাগের ছোট্ট দোকানটি হয়ে উঠেছে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সাহসের প্রতীক।
স্থানীয়দের কাছে তাঁর এই উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে। তাঁদের মতে, সোহাগের মতো আত্মপ্রত্যয়ী তরুণদের পাশে দাঁড়ানো গেলে তাঁদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। প্রয়োজন শুধু সহমর্মিতা নয়, বরং কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার মতো বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা সোহাগের জীবনের বাস্তবতা, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাই তাঁর পরিচয়ের শেষ কথা নয়। নিজের শ্রমে জীবিকা অর্জন করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান তিনি। তাঁর ছোট্ট কেকের দোকান তাই শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন বুনে চলা এক তরুণের সাহসী পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন সেই স্বপ্নকে আরও দূর এগিয়ে নিতে সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।