"যে নারী রাঁধে, সে চুলও বাঁধে"- বহুল প্রচলিত এই লোককথাটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার কেরালকাতা ইউনিয়নের সিঙ্গা গ্রামের গৃহিণী শীলা খাতুন।
বিয়ের পর যিনি সাধারণ রান্নাবান্নার অভিজ্ঞতাটুকুও ঠিকমতো রাখতেন না, পাড়া-পড়শীর বিদ্রূপ আর উপহাস সহ্য করতে হতো যাঁর, সেই শীলা খাতুন আজ এক সফল নারী উদ্যোক্তা ও কৃষাণি।
সংসারের চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন এক দৃষ্টান্তমূলক সমন্বিত কৃষি খামার ও পারিবারিক পুষ্টি বাগান।
যেভাবে শুরুর গল্প:
বিয়ের পর সাধারণ গৃহস্থালি কাজে অনভিজ্ঞতার কারণে বেশ কিছুটা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল শীলা খাতুনকে। কিন্তু হতাশ না হয়ে তিনি নিজেকে স্বাবলম্বী করার পথ খোঁজেন। সন্তান জন্মের পর উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় এবং স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে তিনি প্রথমে একটি পারিবারিক পুষ্টি বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

ছাদ ও বসতবাড়িতে কৃষির জোয়ার:
মাত্র ১.৫ শতক জমিতে শুরু করা এই পুষ্টি বাগান এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল কৃষি খামারে। শীলা খাতুনের বাড়ির ছাদে এবং আঙিনায় এখন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফল ও সবজির সমারোহ। তাঁর বাগানে রয়েছে বিলাতি খেজুর, করসল, লটকন, মিসরের আতা, ক্যাটামন আম, ড্রাগন ফ্রুটসহ নানা বিষমুক্ত ও জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা ফল-সবজি।
কেবল ফল-সবজি চাষেই থেমে থাকেননি তিনি; খামারের সাথে সমন্বিতভাবে পালন করছেন দেশি মুরগি, কবুতর এবং কোয়েল পাখি। সম্পূর্ণ জৈব সার ব্যবহার করে প্রাকৃতিক উপায়ে তিনি এসব ফল ও সবজি উৎপাদন করছেন।
পুষ্টির চাহিদা মিটিয়ে আর্থিক সমৃদ্ধি:
নিজের পরিবারের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব ফল, সবজি, ডিম ও পাখি বাজারে বিক্রি করে শীলা খাতুন এখন নিয়মিত বাড়তি আয় করছেন। নিজের হাতখরচ ও সংসারের পারিবারিক সচ্ছলতা অর্জনে বাড়তি তিনি এখন স্বাধীন।

অনুপ্রেরণা অন্য নারীদের:
শীলা খাতুনের এই অভূতপূর্ব সফলতা দেখে এলাকার অন্যান্য গৃহিণীরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। প্রতিবেশীরা প্রায়ই তাঁর কাছে আসছেন কৃষি বিষয়ক পরমর্শ নিতে এবং নিজ নিজ বসতবাড়িতে কিংবা ছাদে সবজি চাষ শুরু করছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এনামুল ইসলাম- শীলা খাতুনের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে জানান, "শীলা খাতুন একজন চমৎকার নারী উদ্যোক্তা। তিনি তাঁর ছাদ ও বসতবাড়ির অনাবাদী জায়গায় সমন্বিত উপায়ে ফল, লতানো সবজি ও পোল্ট্রি পালন করে পারিবারিক পুষ্টি বাগানকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। অন্যান্য নারী উদ্যোক্তাদের জন্য তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে সব ধরনের কারিগরি ও পরামর্শমূলক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।"
সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও উপহাসকে জয় করে শীলা খাতুন প্রমাণ করেছেন -ইচ্ছা ও পরিশ্রমে যেকোনো নারীই হতে পারেন আত্মনির্ভরশীল ও সফল উদ্যোক্তা।