লবণ পানির গ্রাসে বিপর্যস্ত উপকূলে মিষ্টি পানির এক ফোঁটা যেন জীবনের অপর নাম। চারদিকে থৈ থৈ নোনা জল, অথচ পানের যোগ্য পানির চরম আকাল—সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার সর্দারপাড়ায় এটাই ছিল চিরচেনা বাস্তবতা। তবে সেই সংকট কাটাতে এবার কোনো সরকারি অনুদান বা এনজিওর সহায়তার মুখাপেক্ষী হতে হয়নি। অদম্য ইচ্ছা আর ঐক্যের জোরে এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন স্থানীয় মাঝিরা। নদী কাঁপিয়ে ট্রফি আর পুরস্কার জেতার অর্থ জমিয়ে নিজেদের গ্রামে তারা খনন করেছেন মিষ্টি পানির পুকুর, গড়ে তুলেছেন ঈদগাহ ও গণকবরস্থান।
কয়রা নদীর তীরঘেঁষা মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের সর্দারপাড়ার বাসিন্দাদের মূল জীবিকা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। কেউ মাছ ধরেন, কাঁকড়া শিকার করেন, কেউ বা মৌয়াল হিসেবে বনে যান। প্রায় প্রতিটি পরিবারে ডিঙিনৌকা থাকলেও একসময় তাদের নিজস্ব কোনো বাইচের নৌকা ছিল না। তবে সর্দারপাড়ার মাঝিদের বৈঠা চালানোর দক্ষতা ছিল সর্বজনবিদিত। 'বিদ্যুৎ' ও 'মেঘদূত' নামের অন্যের নৌকায় বাইচ খেলে প্রতিবার তারা প্রথম হলেও অর্জিত ট্রফি, অর্থ আর সম্মান যেত মালিকের পকেটে।
সেই আক্ষেপ থেকেই বদলের সূচনা। সেই স্মৃতি তুলে ধরে মাঝিদের অভিজ্ঞ সদস্য ঈমান আলী সর্দার বলেন, "আমাগের এই বাইচের নৌকাডা গ্রামের সম্মান। আমরা ৫০-৫৫ জন মাঝি একসঙ্গে বইঠা চালাই। এই নৌকার মালিক কেউ একা না, পুরো সর্দারপাড়া। অন্যের নৌকা চালায়ে প্রতিবারই পুরস্কার জিততাম, কিন্তু সম্মান আর টাকা যাইত নৌকার মালিকের ঘরে। তখন আমাগের মনে হলো, আর কত দিন অন্যের নৌকায় বাইচ করব? নিজেগের একটা নৌকা বানাতি হবে।"
নিজেরদের নৌকা বানানোর এই স্বপ্নের পথটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। একবার খুলনার রূপসা নদীতে বাইচের আগে বড় নৌকার বদলে ছোট একটি নৌকা চেয়ে নেন তারা। শর্ত ছিল—জিতলে পুরস্কারের পুরো টাকা মাঝিদের হবে। ঈমান আলী সর্দার বলেন, "আমরা মনে মনে ঠিক করিছিলাম, পুরস্কারের টাকা নিয়েই ফেরব। ওই টাকা দিয়েই নিজেগের নৌকা বানাব।" ছোট নৌকা নিয়েই চমক দেখিয়ে প্রথম হন তারা, জেতেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। গ্রামবাসীদের ছোট ছোট চাঁদা ও সেই অর্থ মিলিয়ে ১০ বছর আগে তৈরি হয় 'সুন্দরবন টাইগার্স'।

৭২ হাত দীর্ঘ এই নৌকা এখন দেশে নৌকাবাইচ জগতের এক পরিচিত ও সমীহের নাম। সর্দারপাড়ার আবুল সর্দার বলেন, "এখন দেশের বিভিন্ন জায়গার বাইচের দল আমাগের নৌকার নাম শুনলেই ভয় পায়। ভাবে, 'সুন্দরবন টাইগার্স' থাকলি প্রথম পুরস্কার ওরাই নিয়া যাবে।" রূপসা নদীতে বিভাগীয় কমিশনারের আয়োজনে প্রতিযোগিতায় ৭৫ হাজার টাকা জেতার পাশাপাশি কুষ্টিয়া, ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে প্রতিযোগিতা খেলে তারা পেয়েছেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ ও নগদ অর্থসহ অসংখ্য পুরস্কার।
তবে অর্জিত অর্থের ভাগ নিয়ে মাঝিরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করেননি। উপকূলীয় এই অঞ্চলে নলকূপের পানি নোনা হওয়ায় পানের অযোগ্য। তাই বাইচের অর্জিত আয় ও গ্রামবাসীর সহায়তায় সংগৃহীত ১৫-১৬ লাখ টাকায় কেনা হয় আট বিঘা জমি। সেখানে খনন করা হয়েছে বিশাল এক মিষ্টি পানির পুকুর, পাশে নির্মিত হয়েছে ঈদগাহ ও ভূমিহীনদের জন্য গণকবরস্থান।
এলাকার সামাজিক বদল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা সুমন সর্দার বলেন, "এলাকায় অনেক গরিব মানুষ আছে, মৃত্যুর পর কবর দেওয়ারও জায়গা থাকে না। এখন অন্তত ভূমিহীন মানুষগের সেই চিন্তা করতি হয় না।" আরেক বাসিন্দা আলমগীর সর্দার বলেন, "এখানে সরকারি কোনো জমি ছিল না। তাই আট বিঘা জমি কিনে পুকুর, ঈদগাহ আর কবরস্থান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫-১৬ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে, যা এসেছে নৌকাবাইচের আয় ও গ্রামবাসীর সহায়তা থেকে।"
বাইচ পরিচালনা কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সর্দার জানান, তাদের সফলতার মূল রহস্য বিভেদহীন একতা। স্থানীয় মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী বলেন, সর্দারপাড়ার 'সুন্দরবন টাইগার্স' এখন আর কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের একতা, সাম্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বৈঠার টানে উঠে আসা অর্থে নিজেদের ভাগ্যের এই রূপান্তর উপকূলজুড়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।