কংশের করাল গ্রাসে ধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নদী থেকে ভবনের দূরত্ব ১০ ফুটেরও কম; ১৩০ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা
যে বিদ্যালয়ের আঙিনা একসময় শিশুদের কোলাহলে মুখর ছিল, সেই বিদ্যালয় আজ দাঁড়িয়ে আছে কংশ নদের ভয়াল ভাঙনের মুখে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার ৯৩ নম্বর ধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার প্রহর গুনছে। ভবন থেকে নদীর দূরত্ব নেমে এসেছে ১০ ফুটেরও কমে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন আরও তীব্র হলে যেকোনো মুহূর্তে নদী গ্রাস করতে পারে বিদ্যালয়টি। এতে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে ১৩০ শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর।
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি কংশ নদের তীর থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে নির্মিত হয়েছিল। প্রায় ১৫ বছর আগে বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে নদীভাঙন শুরু হয়। প্রথমদিকে বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামত তহবিল থেকে বাঁশের খুঁটি ও মাটিভর্তি প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা ছিল সাময়িক উদ্যোগ। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড একাধিকবার নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের তালিকায় স্থানটি অন্তর্ভুক্ত করলেও আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোহনগঞ্জ পৌর শহর রক্ষায় নদীর অপর পাড়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর ভাঙনের চাপ ধনপুর অংশে বেড়ে যায়। এরপর ২০২০ সালে কংশ নদ খননের পর নদীর স্রোত আরও তীব্র হয়ে বিদ্যালয়ের পাশের তীর দ্রুত ভাঙতে শুরু করে। বর্তমানে বিদ্যালয় ভবন কার্যত নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে তাসনীম হায়াতের মা উম্মে হাফসা বলেন, "প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে মেয়েকে স্কুলে পাঠাই। নদী এত কাছে চলে এসেছে যে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ছোট শিশুদের নিরাপত্তার জন্য অনেক অভিভাবক স্কুল চলাকালীন সময় বিদ্যালয়েই অপেক্ষা করেন।"
বিদ্যালয়ের পাশের দোকানদার হাবিবুর রহমান বলেন, "স্থায়ী বাঁধ করতে সময় লাগলেও অন্তত জরুরি ভিত্তিতে মাটিভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানো দরকার। তা না হলে পানি কমলেই বিদ্যালয় ভবন নদীতে চলে যেতে পারে।"

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান জানান, ২১ এপ্রিল ২০২৬ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। আবেদনের পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিনিয়া রহমান, সিংধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসিম উদ্দিন তালুকদার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু হয়নি।
বারহাট্টা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা জিয়াউল হক বলেন, "এ মুহূর্তে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ সম্ভব নয়। তবে বিদ্যালয়টিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।"
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই পরিস্থিতি আজ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের জীবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দ্রুত স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় কংশ নদের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাবে প্রায় তিন দশকের পুরোনো এই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীর শিক্ষা।