কবিপ্রভু যে নদকে ভুপতি ভেবেছিলেন, তা আজ মৃত্যুপথযাত্রী
"সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে!
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;"
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কপোতাক্ষকে নিয়ে এই অমলিন চরণ রচনা করেছিলেন সুদূর ফ্রান্সে বসে। কিন্তু কবি যদি আজ রূপসী রূপসা-কপোতাক্ষের তীরে ফিরে আসতেন, তবে হয়তো নিদারুণ হতাশায় মূর্ছা যেতেন। শতকের ব্যবধানে পলি জমে, দখলদারদের গ্রাসে আর অপরিকল্পিত সরকারি প্রকল্পের গ্যাঁড়াকলে পড়ে মহাকাব্যের সেই প্রমত্ত কপোতাক্ষ আজ কেবলই এক নিঃশ্বাসহীন মরা খাল। ৮১৭ কোটি টাকার খনন প্রকল্পেও নদীটির প্রাণ ফেরেনি; উল্টো পলি জমে আর দখলদারদের রাজত্বে হারিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জীবনরেখা।
টাকার শ্রাদ্ধ: ৮১৭ কোটি টাকার খনন, তাও তলদেশ ভরাটঃ
কপোতাক্ষের বুক চিরে একসময় বয়ে যেত খরস্রোতা রূপ। ঝিনাইদহ থেকে যশোর, সাতক্ষীরা হয়ে খুলনার কয়রা হয়ে সুন্দরবনের আড়পাঙ্গাসিয়া নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়া প্রায় ৩৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদ আজ যেন এক করুণ ইতিহাস।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নথিপত্র অনুযায়ী:
প্রথম পর্যায় (২০১১-২০১৭): কপোতাক্ষের জলাবদ্ধতা দূর করতে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
দ্বিতীয় পর্যায় (২০২০-চলতি বছর): আরও ৫৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নদী খনন, তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দুই দফায় সরকারি কোষাগারের মোট ৮১৭ কোটি টাকা খরচ হলেও স্থানীয় নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘশ্বাস কমেনি, বরং বেড়েছে। পাইকগাছা থেকে কয়রার আমাদী পর্যন্ত সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খননের পরপরই ভাটার সময় পানি এক থেকে দেড় ফুটে নেমে আসে। নদের প্রস্থ কোথাও কোথাও ৭৫০ মিটার থেকে সংকুচিত হয়ে ঠেকেছে মাত্র ১৫০ মিটারে।
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"খনন শুরু হওয়ার পর আমরা বুকভরা আশা বেঁধেছিলাম। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই আবার পলি জমে নদী ভরাট হয়ে গেল। বারবার প্রকল্প হচ্ছে, শত শত কোটি টাকা পানিতে যাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না।"
ফুটবল মাঠ আর বালুচর:
নদের বুকে হারিয়ে যাওয়া মাছ যে কপোতাক্ষের সুস্বাদু মাছ আর গভীর জলের তরঙ্গ একসময় খুলনা-যশোরের অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকাকে টিকিয়ে রাখত, তার কাঠমারচর, খুটিঘাটা, গোবরা, মদিনাবাদ ও দশহালিয়া এলাকায় এখন শুষ্ক মৌসুমে ধুলো ওড়ে।
ভাটার সময় নদের বিশাল তলদেশ শুকিয়ে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। নদের যেখানে মাছ সাঁতার কাটার কথা ছিল, সেখানে এখন স্থানীয় কিশোরদের ফুটবলের আসর বসে। ভাটার টানে নদের স্বাভাবিক প্রবহের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় বড় নৌযান চলাচল বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
সংকটের ঐতিহাসিক শেকড়: কৃত্রিম বাঁধে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ঃ
কপোতাক্ষের আজ যে পচনা দশা, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল ষাটের দশকে। তত্কালীন 'কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট'-এর আওতায় পোল্ডার বা স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য স্থায়ীভাবে বিঘ্নিত হয়। স্থানীয়রা একসময় 'জোয়ার-ভাটা পলি ব্যবস্থাপনা' বা স্থানীয় জ্ঞান নির্ভর উপায়ে লোনা পানি আটকে আবাদ করতেন, যাতে বিলের ভেতর পলি জমা হতো এবং নদী তার নাব্য রক্ষা করতো। কিন্তু কৃত্রিম বাঁধ পলিকে বিলে ঢুকতে দেয়নি; ফলে পলির ভারী আস্তরণ নদীর বুকে জমা হতে হতে আজ তলদেশ উঁচু করে ফেলেছে।
পলি বনাম ড্রেজিং: ব্যর্থতার আসল কারণ 'টিআরএম' না থাকাঃ
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, শুধু ক্যাপিটাল ড্রেজিং বা মেশিন দিয়ে পলি তুলে কপোতাক্ষকে বাঁচানো সম্ভব নয়। যশোরের পাউবো উপ-সহকারী প্রকৌশলীর দেওয়া তথ্যমতে, পাইকগাছা থেকে কয়রা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশে খনন কাজ শেষ করার পরপরই প্রায় ৭৫ লাখ ঘনমিটার পলি এসে নদীর প্রায় ৭০ থেকে ৭৮ শতাংশ অংশ নতুন করে ভরাট করে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের সাফ কথা—‘টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট’ (টিআরএম) বা জোয়ারাধার ব্যবস্থাপনা চালু না করা পর্যন্ত খননের শত শত কোটি টাকা পানিতে ফেলার মতোই সমান। টিআরএম প্রযুক্তিতে জোয়ারের পলিযুক্ত পানিকে সাময়িকভাবে কোনো বিলে আবদ্ধ রাখা হয়, যেখানে পলি থিতিয়ে গিয়ে মুক্ত পরিষ্কার পানি আবার নদীতে ফিরে আসে। কপোতাক্ষে টিআরএম প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় নদী তার স্বাভাবিক তোড় হারাচ্ছে এবং পলি দ্রুত জমে একে মৃত খালে পরিণত করছে।
জীবনের তীরে চরম আঘাতঃ
কৃষিতে লোনা জলের হানা: জোয়ারের তোড়ে পলি জমে নদ উঁচু হওয়ায় সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ারেই বাঁধ উপচে লোনা পানি ঢুকছে ফসলি জমিতে। ফলে দিন দিন গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
বিপন্ন জলজ সম্পদ ও জেলে জীবন: পলি আর দখলের কারণে কপোতাক্ষে এখন আর আগের মতো মাছের বৈচিত্র্য নেই। পেশা হারিয়ে নিঃস্ব হাজারো জেলে পরিবার।
দখলদারিত্বের মহোৎসব: চর জেগে ওঠার সাথে সাথেই দু'পাশে থাবা বসাচ্ছে ভূখাদকদের দল। তৈরি হচ্ছে অবৈধ ইটভাটা, চিংড়িঘের এবং স্থায়ী বসতঘর।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্য ও কপোতাক্ষকে বাঁচাতে কেবল টাকা ঢেলে খনন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা, স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা, স্থায়ীভাবে নদী ইজারা বাতিল এবং দ্রুত ‘টিআরএম’ বাস্তবায়নের মতো কঠোর পদক্ষেপ জরুরি—নচেৎ মাইকেলের কপোতাক্ষ চিরতরে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।