প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৮, ২০২৬, ৫:০৩ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ২৭, ২০২৬, ৮:১৭ পি.এম

সংবিধানের সংস্কার না করে যারাই ক্ষমতায় আসবে তারা আরেকটি হাসিনার মতো ফ্যাসিবাদ হয়ে জন্ম নেবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সোমবার, ২৭ জুলাই বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলরুমে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের ‘জুলাই বিপ্লব : স্বাস্থ্য খাতের অবদান ও ভবিষ্যৎ করণীয়’- শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সাংবিধানিক কাঠামো চাই যেখানে আমূল পরিবর্তন হবে, দর্শন পরিবর্তন হবে, বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তন হবে- এটার নামই হচ্ছে সংস্কার। সেখানে বিএনপি বলছে আমরা সংস্কার না সংশোধন করব। এক্ষেত্রে বিরোধীদল স্পষ্ট বলেছে আমরা ধারণাগতভাবে সংশোধন নয়, সংস্কার চাই। জুলাই সনদে যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত জুলাইযোদ্ধারা শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদের সময় এবং জুলাই আন্দোলন চলাকালে তারা জুলুমের শিকার হয়নি বরং,জুলাই আন্দোলনের বেনিফিসিয়ারি হিসেবে এখন যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তারাও জুলাইযোদ্ধাদের বঞ্চিত করছে, তাদের বদলি করে দিচ্ছে, প্রমোশন দিচ্ছে না।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এটি কী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনা ছিল? ১১ দল, সুশীল সমাজ সবাই আজ বলছে ক্ষমতাসীন দল আবার সেই ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটছে। এটি জুলাই বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল না, বলেন তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই বিপ্লবের একমাত্র লক্ষ্য ছিলনা শুধু একটি শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন বা সরকার পরিবর্তন করা, বরং বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল জুলাই শহীদ, আহত ও ক্ষতবিক্ষত কোটি কোটি মানুষ। তারা এমন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল যেখানে দুর্নীতি, বৈষম্য, দলীয়করণ, ভিন্নমতের উপর দমনপীড়ন থাকবে না, প্রধানমন্ত্রী অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সর্বত্র দলীয়করণ করবেন না। তারা স্বপ্ন দেখেছিল ফ্যাসিবাদী সংগ্রাম ও বিপ্লবের পর এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা হবে, যা সমস্ত দলীয়করণের ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে আমরা দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ উপহার পাবো। প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গণভোটে হ্যাঁ -এর পক্ষে রায় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়ে সংসদে এখন তারা বলছেন এসব সংবিধানবিরোধী। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এসবের প্রতিবাদ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন সেক্রেটারি জেনারেল। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার সব আইন, আইনের মর্যাদা। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আইনি ভিত্তি হচ্ছে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বরের প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার। এটি একটি আইন। এতে বলা হয়েছে, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হবে। এটি অস্বীকার করা হলে বর্তমান সরকার, সংসদ ও মন্ত্রিত্ব নাই। সালাহউদ্দিনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, কোনো প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার বা আইনের ব্যাখ্যা কোনো ব্যক্তি দিতে পারেন না, ব্যাখ্যা দিতে পারে একমাত্র আদালত, বলেন গোলাম পরওয়ার। তিনি আরও বলেন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই, রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে। বিএনপি ১২-১৪টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ১০-১২টি না মানলে সংস্কার কোনো কাজে আসবে না।
সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ঐকমত্য কমিশন বলেছে, সার্চ কমিটির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দিতে হবে। অথচ এক্ষেত্রে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। পিএসসির চেয়ারম্যান, প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানসহ অন্যান্য সাংবিধানিক পদে যদি আগের মতই প্রধানমন্ত্রী অসীম ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতির সাথে কথা বলে নিয়োগ দেন- তাহলে জুলাই বিপ্লবের এতো রক্তের কী প্রয়োজন ছিল? এটির পরিবর্তনের জন্যই তো আমরা রক্ত দিয়ে বিপ্লব করে বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম। বিএনপি সংসদ সদস্যের শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কারের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। ১১ দলের এমপিরা দুটো শপথ নিয়েছে। বিএনপি সংসদে জটিলতা তৈরি করছে। বিএনপি সংস্কারকে এড়িয়ে সংসদে তুচ্ছ করে কথা বলে। আসলে জুলাই শহীদদের রক্তকে অস্বীকার করে তারা বিশ্বাসভঙ্গ করছে। ফলে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেই প্রশ্ন রাখেন গোলাম পরওয়ার।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, বিএনপি ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই সনদকে এড়িয়ে, মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনকে বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করলে রাষ্ট্র কাঠামোর ফ্যাসিবাদী চরিত্র দূর হবে না। এই সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তারাই হাসিনার মতো ফ্যাসিবাদের জন্ম নেবে। একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন দেখেছিল জুলাইযোদ্ধারা- তা পেতে হলে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করার জন্য সংসদে আলোচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিপ্লবের পর এখনো কেন সংসদে বলতে হয় জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করুন। জুলাই বিপ্লবের সংসদে কেন জুলাই বিপ্লবীদের ওই বক্তব্য দিতে হচ্ছে। গণভোটকে অস্বীকার করা এবং জুলাই সনদকে অপ্রয়োজনীয় উল্লেখ করে সরকার দলীয় এমপিদের বক্তব্য দেয়ারও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। জুলাই বিপ্লবে চিকিৎসকদের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, চিকিৎসকরা রক্তাক্ত জুলাইয়ে মারাত্মকভাবে আহত জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়েছেন। এনডিএফ’র ছায়াতলে থেকে মানবিক চিকিৎসক হিসেবে জুলাইযোদ্ধাদের যারা সেবা দিয়েছেন, তারা রাষ্ট্রের কাছে স্বীকৃতি না পেলেও মহান রবের কাছে বিনিময় পাবেন। জুলাই আমাদের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, অন্যায়, জুলুমের বিরুদ্ধে জেগে উঠার মৃত্যুভয়হীন অপ্রতিরোধ্য চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করে। চোখ হারানো, মৃত্যুরকোল থেকে ফিরে আসা, ভাইহারা মানুষের আকুতি আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, জুলাই বিপ্লবে গুলিবিদ্ধ হয়ে, রক্তাক্ত হয়ে জুলাই যোদ্ধারা যখন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে আবারও রাজপথে নেমে আসতো পুলিশ ভয়ে আর আতঙ্কে হাঁপিয়ে উঠতো। তিনি বলেন, আমরা আহতদের আন্দোলনে পিছনে থাকার অনুরোধ করলেও তারা সামনের সারিতে এসে নেতৃত্ব দিতো। চব্বিশের জুলাইয়ের ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ডকুমেন্টটারি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করে আগামী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে।
ডা. মো. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ এমপি, জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নিলেও আমরা অনেক আহত যোদ্ধার শারীরিক ও পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে বিদেশে না পাঠিয়ে সুস্থতার জন্য দেশেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমাদের চিকিৎসকদের সেই প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রের অন্তত ১০০ কোটি টাকা সেইভ হয়েছে। আমরা যাদের চিকিৎসা দিয়েছে বিদেশি চিকিৎসক প্যানেল ঐ চিকিৎসাকে বেস্ট এবং যথাযথ বলেছে।
চব্বিশের জুলাইয়ের ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, সেই সময় খুনি হাসিনার নির্দেশ ছিল ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’। কিন্তু ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সদস্য ও দেশপ্রেমিক চিকিৎসকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসিনার সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে আহত, রক্তাক্ত, গুলিবিদ্ধ ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। চিকিৎসা দেওয়ার অপরাধে অনেক ডাক্তারকে আওয়ামী লীগের জুলুমের শিকার হতে হয়েছে। আহত অনেকের সাথে আমরা হাসপাতালে যেতে পারিনি কিন্তু চিকিৎসকেরা তাদের সেবা দিয়েছিল। আমরা সমন্বয়কদের জন্য সেফ হোমে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। সেফ হোমে থাকার ক্ষেত্রেও এনডিএফের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলেরা আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন। সেই সময়ে আমরা আব্দুল হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদ, মাহিন সরকার, মুসাদ্দেক আলী তাদের নেতৃত্ব আমরা একটা প্রেস কনফারেন্স ব্যবস্থা করেছিলাম যে, হাসিনার গণহত্যা ও শিশুহত্যার চিত্র আমরা জাতির সামনে তুলে ধরবো। সেই সময় প্রথম সারির সমন্বয়ক নাহিদ, আসিফসহ অন্যরা গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ছিলেন। তাদের সেখান থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, এনডিএফের মাধ্যমে আমরা যেই তালিকা পেয়েছি সেই তালিকার আলোকে আমরা শহীদদের তালিকা তৈরি করে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছি। জুলাই আন্দোলনে এনডিএফের ভূমিকার জন্য তিনি এনডিএফের সকল সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সাদিক কায়েম।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সহ-সভাপতি ডা. আতিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম এমপি, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি ডা. এমজি ফারুক হোসেন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন্দ, অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ডা. মাহফুজুর রহমান, মো. জসীম প্রমুখ।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ডা. মারুফ শারিয়ারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মোহাম্মদ সুজন শরীফ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিনসহ জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাইযোদ্ধা এবং এনডিএফের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।