জাপান সরকারের মর্যাদাপূর্ণ মেক্সট (মনবুকাগাকুশো) স্কলারশিপ- ২৬ অর্জন করে জাপানের ইয়ামাগাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এমপাওয়ার গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম ফর গ্রিন ট্রান্সফরমেশন-এ মাস্টার্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (বিএমবি) বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের দুই শিক্ষার্থী মোছাঃ হুনুফা আক্তার ও পর্ণা পাল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই তারা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। দীর্ঘদিনের একসঙ্গে পড়াশোনা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহের ধারাবাহিকতায় এবার দুজনই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অর্জন করেছেন।
মেক্সট জাপান সরকারের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৃত্তি। এ বৃত্তির আওতায় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয় বহন করে জাপান সরকার। পাশাপাশি মাসিক উপবৃত্তি, বিমান ভাড়া এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক সরকারি বৃত্তি হিসেবে স্বীকৃত।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই দুই বান্ধবীর লক্ষ্য ছিল নিজেদের একাডেমিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। নিয়মিত গ্রুপ স্টাডি, নোট তৈরি, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রস্তুত করেছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার সময়েও একে অপরের পাশে থেকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন। সেই দীর্ঘ প্রস্তুতির ফলস্বরূপ আজ তারা একসঙ্গে জাপানে উচ্চশিক্ষার নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন।
বৃত্তিপ্রাপ্ত মোছাঃ হুনুফা আক্তারের জন্ম দিনাজপুর সদর নিউ টাউন-৬ এলাকায়। তিনি ২০১৬ সালে দিনাজপুর পুলিশ লাইনস হাই স্কুল থেকে গোল্ডেন এ প্লাসসহ এসএসসি উত্তীর্ণ হন এবং সরকারি বৃত্তি লাভ করেন। ২০১৮ সালে দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করার পর ২০২০ সালে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতক পর্যায়ে ৩.৯০ সিজিপিএ অর্জন করে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি একই বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
তার বাবা হামিদ আলী কুয়েতে কর্মরত এবং মা আঙ্গুরী বেগম একজন গৃহিণী। দুই বোনের মধ্যে হুনুফা ছোট।
হুনুফা আক্তার বলেন, “সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার বাবা-মা, বিশেষ করে আমার বাবা প্রায় ২০ বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে আমাদের শিক্ষার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।আমার বাবা সব সময় একটি কথা বলতেন যেটি আমার অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বড় অংশ সেটি হলো `সময়কে সময় দাও`। আমার মা সবসময় সাহস, অনুপ্রেরণা ও মানসিক শক্তি যুগিয়েছেন।” তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজন ও মামা সজীবুল আলম এর প্রতি কৃতজ্ঞ। এছাড়াও তিনি তার শ্বশুর-শাশুড়ি এবং স্বামী মো. রাকিবুল হাসান রাকীবের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁর স্বামীর অবিচল উৎসাহ সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় তাকে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে আজকের এ সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি আরো বলেন, “আমার বিভাগের সকল শিক্ষকবৃন্দের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে আমার একাডেমিক সুপারভাইজার ড. সায়মা সাবরিনা ম্যামের প্রতি কৃতজ্ঞ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর মূল্যবান দিকনির্দেশনা, গঠনমূলক পরামর্শ এবং নিরলস সহযোগিতা আমাকে এই অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইয়ামাগাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ম্যামের দীর্ঘদিনের গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতা আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আরও আনন্দের বিষয় হলো, আমার সুপারভাইজারও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। তাই তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করা আমার জন্য অত্যন্ত গর্ব, সম্মান ও অনুপ্রেরণার।”
এ ছাড়া তিনি বিভাগের সিনিয়র নিতু আপু, জুনিয়র আলিফা, সিফাত ও সিয়াম এবং ব্যাচমেট রিফাহ, অহনা, জেমি, হাফিজ, মিজান ও পর্ণার প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অপর বৃত্তিপ্রাপ্ত পর্ণা পালের বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইলের পালপাড়ায়। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয় পতুলীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেখানে তাঁর দিদা শিক্ষকতা করতেন। পরে তিনি সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি এবং কুমুদিনী সরকারি কলেজ থেকে ২০১৯ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতক পর্যায়ে ৩.৮০ সিজিপিএ অর্জন করে বিভাগে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। বর্তমানে তিনি একই বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
পর্ণা পাল বলেন, “শুরুতে আমার ইচ্ছা ছিল কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বিভাগের শিক্ষকদের সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে বায়োকেমিস্ট্রির প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়। তখন বুঝতে পারি, এই বিষয়টিই আমার জন্য সঠিক পথ।”
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই আমি, সেতু রায় ও মৌসি নিয়মিত গ্রুপ স্টাডি করতাম। একসঙ্গে নোট তৈরি করা, পড়াশোনা গুছিয়ে নেওয়া এবং বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা আমাদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। শেষ সেমিস্টারে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা হতো। সেই কঠিন সময়ে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সেতু রায়, মৌসি এবং বন্ধু নাদিম। তারা শুধু পড়াশোনাতেই নয়, মানসিকভাবেও আমাকে সাহস দিয়েছে।”
গবেষণা বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার গবেষণার হাতে খড়ি হয় আমার সুপারভাইজার ড. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম স্যারের মাধ্যমে। গবেষণার প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা আমাকে গবেষণার জগতে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে। গবেষণার প্রতিটি ধাপে আমার প্রজেক্টমেট কাওসার আহমেদ আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া ড. সায়মা সাবরিনা ম্যামের আন্তরিক সহযোগিতা, দিকনির্দেশনা ও সুপারিশের মাধ্যমে আমি মেক্সট স্কলারশিপের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাই। আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তাঁর মূল্যবান পরামর্শ ও আমার প্রতি আস্থা আমাকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আজকের এই অর্জনের পেছনে আমার বাবা-মা, শিক্ষক, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, সহযোগিতা ও বিশ্বাস রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোটা সময় হুনুফা ছিল আমার যাতায়াতের সঙ্গী। প্রতিদিনের পথচলায় আমরা পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ ও জীবনের নানা বিষয় নিয়ে অসংখ্য আলোচনা করেছি। অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, আজ আমরা দুজনই মেক্সট স্কলারশিপ অর্জন করে জাপানে উচ্চশিক্ষার নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।”
জুনিয়র শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে হুনুফা আক্তার ও পর্ণা পাল বলেন, অনার্সের প্রথম বর্ষ থেকেই নিয়মিত একাডেমিক পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শুধু ভালো ফলাফল নয়, সেমিনার, কর্মশালা, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ ও ক্লাব কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। সময়ের সঠিক ব্যবহার, গবেষণার প্রতি আগ্রহ এবং প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপ অর্জনের পথকে সহজ করে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে হুনুফা আক্তার বলেন, 'গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে চান। আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।'
প্রসঙ্গ, ১৯৫৪ সাল থেকে শুরু করে বিশ্বের ১৬০টির মতো দেশ থেকে আসা ছাত্রদের জন্য এ বৃত্তি দেয় জাপান সরকার। জাপান সরকার প্রদত্ত বৃত্তিগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে খ্যাতনামা আর সবচেয়ে সম্মানিত। এ বৃত্তির জন্য ভিসা পেলে ভিসায় লেখা থাকে ‘গভট. স্কলার’। জাপানের গবেষণার মাধ্যমে বৃত্তি প্রাপ্তির দেশ এবং জাপানের মধ্যে বন্ধুত্বের সেতু হয়ে ওঠা মানবসম্পদকে উৎসাহিত করা এবং উভয় দেশ ও বৃহত্তর বিশ্বের উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্যেই দেওয়া হয় এ বৃত্তি।