বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এখন নিজেই তীব্র সংকটে জর্জরিত।
ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ-ত্রিগুণ রোগীর চাপ, বছরের পর বছর অতি জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি বিকল থাকা এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ ও সাধারণ ওয়ার্ড—সবখানেই এখন রোগীদের সীমাহীন ভোগান্তি নিত্যদিনের চিত্র।
উপচে পড়া ভিড় ও তীব্র শয্যা সংকট:
হাসপাতাল সূত্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে বহির্বিভাগে প্রায় ৩ হাজার ৮৩৬ জন এবং জরুরি বিভাগে ১ হাজার ১৪১ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। প্রতিদিন গড়ে ৮২৯ জন নতুন রোগী ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে শয্যা না পেয়ে শত শত রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে, বারান্দায় কিংবা যাতায়াতের রাস্তায় নোংরা পরিবেশের মধ্যেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেছে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে। সাম্প্রতিক সময়ে নিউমোনিয়া ও হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ায় শিশু ওয়ার্ডে অনুমোদিত শয্যার বিপরীতে তিন থেকে চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছে। একটি শয্যাতেই ৩-৪ জন শিশুকে গাদাগাদি করে রাখতে হচ্ছে, যার ফলে এক শিশুর শরীর থেকে অন্য শিশুর শরীরে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একটি মাত্র অক্সিজেন লাইনের ওপর একাধিক শিশুকে নির্ভর করতে হচ্ছে

বছরের পর বছর বিকল অতি জরুরি যন্ত্রপাতি:
চমেক হাসপাতালের অন্যতম বড় চিকিৎসাসেবা সংকট তৈরি হয়েছে এর রোগ নির্ণয় বিভাগে। হাসপাতালের একমাত্র এমআরআই (MRI) মেশিনটি গত প্রায় চার বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এটি সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দফায় দফায় চিঠি দিলেও বরাদ্দ সংকটে তা মেরামত বা নতুন মেশিন কেনা সম্ভব হয়নি।
একইভাবে হৃদরোগ ও ক্যান্সার নির্ণয়ের মতো অত্যন্ত সংক্রামক ও জটিল রোগের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রও দীর্ঘদিন ধরে বিকল। এর ফলে গরিব ও মধ্যবিত্ত রোগীরা সরকারি মূল্যে পরীক্ষা করার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে এসব পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা অনেক দরিদ্র পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।
দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য:
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরল-সোজা রোগীদের ফাঁদে ফেলতে চত্বরজুড়ে সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী দালাল চক্র। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মেশিন নষ্ট থাকার সুযোগ নিয়ে এবং দ্রুত ভালো সিট বা উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে এই দালালরা রোগীদের ফুসলিয়ে বাইরের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় র্যাবের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে একাধিক দালালকে গ্রেপ্তার করা হলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের রূপ ধারণ করে
বিশেষজ্ঞদের মত ও সমাধানের পথ:
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ৫ বছরে চমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ প্রায় দ্বিগুণ বাড়লেও সেই তুলনায় স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। ফলে সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী বা কক্সবাজারের মতো উপজেলা পর্যায়ের রোগীরাও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সরাসরি চমেকমুখী হচ্ছেন।
এই চরম ভোগান্তি থেকে উত্তরণের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিকিৎসাসেবার মান ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সেখানে মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি বিভাগের পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও নতুন বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো উন্নত করে চমেক হাসপাতালের ওপর একক চাপ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।