প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৫, ২০২৬, ১১:৫৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ২, ২০২৬, ৪:৪৯ পি.এম

গণভোটের রায় অস্বীকার করে দেশকে সংকটে ঠেলে দিচ্ছে সরকার; জনগণের ম্যান্ডেট অমান্য করলে সরকারকে এর দায় বহন করতে হবে — মিয়া গোলাম পরওয়ার
শনিবার (২ মে) সকাল ১০টায় খুলনা প্রেসক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে “গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ” শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার গণভোটের রায় অস্বীকার করে দেশকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদের আড়ালে গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করা হচ্ছে, যা জনগণের ম্যান্ডেটের সরাসরি বিরোধী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিমের সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাস্টার শফিকুল আলম এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন।
“গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহ আলম।
মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন এবং উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব শ. ম. আবু তালিব, খুলনার সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর শামসুজ্জামান, অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহমান, এনসিপির খুলনা মহানগরীর প্রধান সমন্বয়ক আহম্মদ হামীম রাহাত, খুলনা মহানগর খেলাফত মজলিসের সভাপতি এফ. এস. হারুন অর রশীদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ. এম. সাজ্জাদ হোসেন চঞ্চল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর সভাপতি রাকিব হাসানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সেমিনারের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন ড. মো. তহিরুল আহসান তোহা এবং কবিতা আবৃত্তি করেন দেশজ খুলনার সেক্রেটারি গাজী শাহ মাখদুম। এছাড়া টাইফুন শিল্পীগোষ্ঠী খুলনার শিল্পীরা গণভোটের দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সরকার সচেতনভাবেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। মন্ত্রীরা সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও গণভোটে জনগণের সরাসরি রায় নিয়ে নীরব রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “একবারও কোনো মন্ত্রী বলেননি যে গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। কারণ, তা করলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ভেঙে পড়বে।”
গণভোটের আগে দীর্ঘ চার মাস সময় থাকা সত্ত্বেও সরকার বা সংশ্লিষ্ট কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ, ২৫ নভেম্বর গণভোটের অধ্যাদেশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ভোট—এই পুরো সময়জুড়ে কোথাও অসাংবিধানিকতার প্রশ্ন ওঠেনি। অথচ ক্ষমতায় আসার পর সবকিছু অবৈধ বলা হচ্ছে, যা স্পষ্ট দ্বিচারিতা।”
সংবিধান সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসবের মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলপ্রধান থাকতে পারবেন না, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি না মানা, আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাখ্যান, বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন কমিশনের বিরোধিতা এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান।
তিনি বলেন, “এই ১০টি বিষয় বাদ দিলে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে পড়ে। সরকার মূলত এসব জায়গায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়।”
গণভোটে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ডেলিগেটেড ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা মানে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা।”
সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন; সংসদ কখনোই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়।”
সরকারের বর্তমান অবস্থানকে তিনি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায় অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্র নয়; বরং ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আবারও সংঘাত, অস্থিরতা ও রক্তপাতের আশঙ্কা রয়েছে।”
সবশেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংসদে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে সংশ্লিষ্টরা। “পাঁচ কোটি মানুষের রায় যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে আমরা আবার জনগণের কাছে ফিরে যাব। তখন আন্দোলনই একমাত্র পথ হবে।”
তিনি সংকট এড়াতে সরকারকে সংসদে ফিরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান এবং বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান না করলে এর দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।